জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডের রায় ঘোষণা হয়েছে চার মাস আগে। তবে এখনো কার্যকর হয়নি সেই রায়। তাই মৃত্যুর আগে ছেলের হত্যাকারীদের শাস্তি কার্যকর দেখে যেতে চান বাবা মকবুল হোসেন ও মা মনোয়ারা বেগম। তাদের দাবি, আর বিলম্ব নয়-দ্রুত কার্যকর করা হোক আদালতের রায়।
২০২৪ সালের ১৬ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় রংপুরে পুলিশের গুলিতে নিহত হন আবু সাঈদ। পুলিশের সামনে দুই হাত প্রসারিত করে বুক পেতে দাঁড়িয়ে থাকার ভিডিও ও স্থিরচিত্র দেশ-বিদেশে ব্যাপক আলোড়ন তোলে। অনেকের মতে, ওই ঘটনাই আন্দোলনকে আরও বেগবান করে এবং একপর্যায়ে তা গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়।
আবু সাঈদ হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দুইজনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ২৮ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। চলতি বছরের ৯ এপ্রিল বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ রায় ঘোষণা করেন।
আবু সাঈদের বাবা মকবুল হোসেন বলেন, ‘আমার ছেলে দেশের জন্য, দেশের মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য জীবন দিলো, অথচ তার হত্যাকারীদের রায় কার্যকরে দেরি হচ্ছে।’
ট্রাইব্যুনাল করেও ছেলের হত্যাকারীদের রায় দ্রুত কার্যকর না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।
ছেলের কথা স্মরণ করে কাঁদতে কাঁদতে মকবুল আহমেদ বলেন, ‘ছেলেটা বুক পাতি দিলো, আর পুলিশ গুলি করে মারলো। একবারো পুলিশ চিন্তা করলো না, বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা ছেলে। সে মারা গেলে তার বাবা-মা কত কষ্ট পাবে। যাই হোক ছেলেকে তো আর ফিরে পাবো না। ওর হত্যার ঘটনায় আদালত যে রায় দিয়েছে, সেই রায় যদি বেঁচে থাকতে দেখতে পাইতাম, তাহলে একটু হলেও মনটা শান্তি পাইতো।’
আবু সাঈদের মা মনোয়ারা বেগম বলেন, ‘হামার আবু সাঈদের কবর জিয়ারত কইরবার জন্য ম্যালা (অনেক) মানুষ আইসে। সবায় কয় (বলে), হামরা ছেলের হত্যার বিচার দ্রুত পামো, এ্যালাও (এখনো) তো পাচ্ছি না। খালি ডেট দেয় আর ডেট দেয়। এমন করি ডেট দিতে দিতে তো হামরা কখন ফির মারা যাই।’
ছেলের স্মৃতিচারণ করে মনোয়ারা বেগম বলেন, ‘প্রত্যেক দিন বাবাটার কবরের কাছে যাই, বাবাটার মুখটা খালি ভাসি ওঠে, কবরের ঘাষ তুলি, পরিষ্কার করি। বাবাটা বাঁচি থাকতে, বিশ্ববিদ্যালয় গেইলে যে কয়দিন আইসে না, সেই কয়দিন সকাল-সন্ধ্যা ফোন দিতো। এখন আর বাবাটার ফোন পাই না।’
কান্নাজড়িত কণ্ঠে আবু সাঈদের মা বলেন, ‘বাবাটা হামার কষ্টের সংসারে হাল ধইরবার চাইছিল। সেই বাবাটা হামার চায়া বড় চিন্তা থাকি দেশের জন্য জান দিছে। বাবাটার কথা খালি মনে আইসে। হামার বাবাটাক যারা মারি ফেলাইছে, সবার ফাঁসি চাই হামরা।’
২০২৪ সালের ১৬ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় রংপুরে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংঘর্ষ শুরু হয়। শিক্ষার্থীদের ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ারশেল, রাবার বুলেট ও গুলি ছোড়ে পুলিশ। এ সময় পুলিশের সামনে বুক পেতে দাঁড়িয়ে থাকা আবু সাঈদ গুলিবিদ্ধ হন। পরে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পরদিন নিজ গ্রাম পীরগঞ্জ উপজেলার বাবনপুরে তাকে দাফন করা হয়।
২০০১ সালে রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার বাবনপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আবু সাঈদ। ছয় ভাই ও তিন বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট। জাফরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি, খালাশপীর দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে গোল্ডেন জিপিএ-৫ এবং রংপুর সরকারি কলেজ থেকে জিপিএ-৫ নিয়ে এইচএসসি পাস করেন। ২০২০ সালে তিনি বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হন এবং ১২তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন।
প্রতিনিধি/এমআর

















