২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান শুধু রাজপথের আন্দোলন, সংঘর্ষ ও প্রাণহানির ইতিহাস নয়; এটি বহু মানুষের গ্রেফতার, রিমান্ড, গুমের আশঙ্কা এবং হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগে ভারাক্রান্ত এক সময়েরও সাক্ষী। সে সময় আন্দোলনে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগে আটক হওয়া অনেকের মতো তৎকালীন নিউমার্কেট থানা ছাত্রশিবিরের সভাপতি মো. তাওহীদও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
তার অভিযোগ, গ্রেফতারের পর পুলিশ হেফাজতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের পাশাপাশি তাকে পানি পর্যন্ত দেওয়া হয়নি। প্রচণ্ড তৃষ্ণার্ত অবস্থায় পানি চাইলে এক পুলিশ সদস্য তাকে প্রাণনাশের হুমকি দেন বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
ঢাকা মেইলের কাছে নিজের সেই দুঃসহ অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিতে গিয়ে তাওহীদ তুলে ধরেছেন গ্রেফতার, জিজ্ঞাসাবাদ, রিমান্ড, পুলিশ হেফাজতে কাটানো সময় এবং পরবর্তী কারাজীবনের নানা ঘটনা। তার ভাষ্যে উঠে এসেছে আন্দোলন চলাকালে আটক ব্যক্তিদের সঙ্গে কী ধরনের আচরণ করা হয়েছিল। সেই সঙ্গে ফুটে উঠেছে তৎকালীন রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের একটি ব্যক্তিগত বিবরণ। তার সেই অভিজ্ঞতার বর্ণনা পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।
কারফিউর দিনে পল্টন মোড়ে জমায়েতের চেষ্টা
তাওহীদ বলেন, ২৯ জুলাই প্রথমে সকাল ৮:৪০ এর দিকে আমাকে আমাদের তৎকালীন ঢাকা কলেজ শাখা ছাত্র আন্দোলন সম্পাদক আফনান ভাই ফোন দিয়ে বললেন, আজকেও কারফিউ ভেঙে পল্টন এরিয়ায় মিছিল হবে, সেখানে যেকোনো অবস্থায় যেতে হবে। আমি তখন নিউমার্কেট থানা ছাত্রশিবিরের সভাপতি। আমি আমার তৎকালীন সেক্রেটারি ফজলুল হক ফরাদসহ প্রায় ১৫-১৬ জনকে নিয়ে পল্টনে চলে যাই সকাল ১০টার দিকে।
তাওহীদ বলেন, ‘সেখানে পৌঁছে দেখি অনেক মানুষ জড়ো হয়েছেন। তবে মৎস্য ভবন, সচিবালয়, পল্টন ময়দান থেকে গুলিস্তান জিরো পয়েন্ট পর্যন্ত পুরো এলাকাজুড়ে পুলিশ, সেনাবাহিনী, র্যাব ও বিজিবির সদস্যরা অবস্থান নিয়েছিলেন। তাদের অবস্থান দেখে মনে হচ্ছিল, কোনোভাবেই সেখানে মিছিল করতে দেওয়া হবে না। যদিও মানুষ ধীরে ধীরে জড়ো হচ্ছিলেন, তবু চারপাশে নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর অবস্থানের কারণে কেউ মিছিল শুরু করতে পারছিলেন না।’
শিবির নেতা বলেন, ‘এমন সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয়ক মুসাদ্দিক হঠাৎ স্লোগান দেওয়া শুরু করলে পুলিশ তাকে এবং তার সঙ্গে থাকা আরও দুই-তিনজনকে আটক করে প্রিজন ভ্যানে তুলে নেয়। এ ঘটনায় উপস্থিত সবাই ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। আমরাও তখন কোনো সিদ্ধান্ত না নিয়ে পরবর্তী নির্দেশনার অপেক্ষায় ছিলাম।’
তাওহীদ আরও বলেন, ‘পরে আমি আফনান ভাইকে ফোন করে পুরো পরিস্থিতি জানাই। তিনি আমাকে নিরাপদে সেখান থেকে চলে আসতে বলেন। এরপর আমরা একটি চলন্ত সাভার পরিবহনের বাসে উঠি। সেদিন সড়কে যান চলাচল তুলনামূলকভাবে কিছুটা স্বাভাবিক ছিল। সায়েন্স ল্যাবরেটরি এলাকায় পৌঁছে দেখি পুলিশ যাত্রীদের মোবাইল ফোন তল্লাশি করছে। বিষয়টি বুঝতে পেরে আমরা বাস থেকে না নেমে ল্যাবএইড হাসপাতালের সামনে গিয়ে নামি। সেখানে কিছুটা নিরাপদ জায়গায় অবস্থান নেওয়ার পর জানতে পারি, সেদিন কারফিউ শিথিল করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। সারাদিনই আমরা চরম উৎকণ্ঠা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে সময় কাটিয়েছি।’
পুলিশের হাতে আটক ও ধানমন্ডি থানায় স্থানান্তর
সন্ধ্যায় হঠাৎ করে মাগরিবের নামাজের আগে আগে আমার কাছে একটা অপরিচিত নাম্বার থেকে কল আসে। কল দিয়ে তার বক্তব্য ছিল ঠিক এতটুকু-‘আপনি তাওহীদ?’ ‘জি।’ ‘আপনার কাজ হচ্ছে আজকে কারফিউ শিথিল হইছে কি না এই নিউজটা আমাকে এর পরবর্তী কল দেওয়ার সাথে সাথে দেওয়া।’
স্বাভাবিকভাবে আন্দোলনের স্বার্থে সবাইকে সবসময়, ওই সময়টাতে তো সবকিছু প্রকাশ করা যায়নি। তবে আমি আমার তৎকালীন সেক্রেটারি ফরাদকে নিয়ে মাগরিব নামাজের সময় বের হয়ে পড়ি। আমরা নিউমার্কেটে ঢুকি। মাগরিব নামাজ শেষে বুঝতে পারি আসলে কারফিউটা শিথিল হয়নি। কারণ তখন সড়কে প্রত্যেকটা মোড়ে মোড়ে অলরেডি পুলিশ চেকপোস্ট বসে গেছে। এরপরও আমাদের বাসায় ফিরতে হবে।
আমরা এলিফ্যান্ট রোড ও বাটার সিগন্যাল হয়ে বাসার দিকে রওনা দিই। কারণ হলো, একমাত্র রোড এইটা যেখানে একটা পুলিশ চেকপোস্ট বসানো। আর প্রত্যেকটা রোডেই একাধিক পুলিশ চেকপোস্ট পার হতে হতো আমাদের। আমরা বাটার সিগন্যাল দিয়ে চলে যাওয়ার সময় পেছন থেকে ডাক দেয়- ‘এই!’ নাম ধরে ডাক দেয়, ‘তুই ঢাকা কলেজের সমন্বয়ক তাওহীদ? এদিকে আয়।’ দৌড় দেওয়ার কোনো অপশন ছিল না। কারণ পুরা রোড ফাঁকা ছিল, গুলি করে দিত।
তারপরে সে আমার ফোন চেক করে। প্রথমে বললাম, আমরা নীলক্ষেত বইয়ের মার্কেটে কাজ করি, আমরা স্টুডেন্ট না। পরে ফোন চেক করে আন্দোলনের সাথে সংশ্লিষ্টতা পায়, কিছু ছবি-টবি পায়। এরপরে ওইখানেই মারধর শুরু করে। ওখানে আমি সেন্সলেস হয়ে গেলে আমাদের চ্যাংদোলা করে পাশে বাটার সিগন্যাল পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়।
টানা নির্যাতন ও রিমান্ডের অমানবিক অধ্যায়
তাওহীদ বলেন, ফাঁড়িতে নেওয়ার পর পুলিশ আবার আমার মোবাইল ফোন তল্লাশি করে। ফোনে থাকা তথ্য যাচাই করে তারা জানতে পারে, আমি নিউমার্কেট থানা ছাত্রশিবিরের সভাপতি। এটি জানার পর নির্যাতনের মাত্রা আরও বেড়ে যায়। আমার দুই হাতে হাতকড়া পরিয়ে জানালার গ্রিলের সঙ্গে এমনভাবে ঝুলিয়ে রাখা হয় যে, পা মাটি থেকে প্রায় এক ইঞ্চি ওপরে ছিল। ওই অবস্থায় তারা আমাকে নির্যাতন করতে থাকে।
একপর্যায়ে প্রচণ্ড পিপাসা পেয়ে পানি চাইলে এক পুলিশ সদস্য বলেন, ‘একটু পর তো মইরা যাবি, পানি খাইয়া আর কী করবি?’ এরপরও আমাকে পানি দেওয়া হয়নি। পাশাপাশি অশ্লীল মন্তব্য, গালাগালি ও শারীরিক নির্যাতন রাত আড়াইটা পর্যন্ত একটানা চলতে থাকে। চারজন পুলিশ সদস্য পালাক্রমে নয়, প্রায় বিরতিহীনভাবে আমাকে মারধর করেন। একসময় নির্যাতনের মধ্যে হাতকড়ার একটি অংশ ছিঁড়ে গেলে আমি সোফার ওপর পড়ে যাই। এরপর আবার হাত পেছনে নিয়ে হাতকড়া পরিয়ে মারধর শুরু করা হয়।
তিনি বলেন, রাত আড়াইটার দিকে আমাদের নিউমার্কেট থানায় নেওয়া হয়। তখন আমাদের শারীরিক অবস্থা এতটাই খারাপ ছিল যে, থানার দ্বিতীয় তলায় উঠে যাওয়ার মতো শক্তিও ছিল না। কিন্তু সেখানেও মারধর করতে করতে আমাদের ওপরে তোলা হয়। পরে সহকারী পুলিশ কমিশনারের (এসি) কক্ষে নেওয়া হলে তৎকালীন ডিএমপির নিউমার্কেট জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার রেফাতুল ইসলাম আমাদের সাত দিনের রিমান্ড চাওয়ার নির্দেশ দেন।
তাওহীদ আরও বলেন, এরপর আমাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। পথে পুলিশের গাড়ি একাধিক চেকপোস্টে আটকে যায়। এমনকি পুলিশের এক ইউনিট অন্য ইউনিটের গাড়িকেও সহজে যেতে দিচ্ছিল না। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ঘুরে আমাদের হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে আমার প্রায় সাত থেকে আটটি এক্স-রে করা হয়। চিকিৎসকরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে প্রেসক্রিপশনে লিখে দেন, আমার অন্তত সাত দিনের সম্পূর্ণ বেড রেস্ট প্রয়োজন।
তার অভিযোগ, চিকিৎসকের সেই পরামর্শ উপেক্ষা করে পরদিনই পুলিশ আমাকে আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করে। বিচারক কোনো বক্তব্য শোনার সুযোগ না দিয়েই চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এমনকি আমাদের পক্ষে কোনো আইনজীবীকেও দাঁড়াতে দেওয়া হয়নি।
তিনি বলেন, আদালতের আদেশের পর আবার থানায় নেওয়া হয়। সেখানে টানা কয়েক দিন অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হই। পরে ৩ আগস্ট আবার আদালতে হাজির করা হলে আদালতের নির্দেশে আমাকে কারাগারে পাঠানো হয়।
কারাগারের ভেতর বিজয় ও নতুন স্বাধীনতার স্বাদ
ছাত্রশিবির নেতা তাওহীদ বলেন, ৫ আগস্ট বেলা প্রায় ১১টা ২০ থেকে ১১টা ৪০ মিনিটের মধ্যে এক বন্দি বিজিবি (তৎকালীন বিডিআর) কর্মকর্তা আমাদের কাছে এসে বললেন, ‘তাওহীদ, জোহরের নামাজের সঙ্গে দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করবে। কারণ স্বৈরাচার পালিয়ে গেছে।’ এটাই ছিল সরকার পতনের খবর সম্পর্কে আমাদের প্রথম জানা।
তিনি বলেন, খবরটি ছড়িয়ে পড়ার পর পুরো কারাগার স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে। বন্দিদের মধ্যে এক অন্যরকম উচ্ছ্বাস কাজ করছিল। সারাদিনই সেই পরিবেশ বজায় ছিল।
তিনি আরও বলেন, পরদিন সকালে কারারক্ষীরা নিয়ম অনুযায়ী ‘গুন্তি’ (বন্দি গণনা) ও গেট লক করতে এলে আমরা গেট বন্ধ করতে দিইনি। বরং সবাই বের হয়ে কারাগারের ভেতরেই বিজয় মিছিল করি। এ সময় রাজবন্দিদের বাইরে অন্যান্য ফৌজদারি মামলার কয়েকজন বন্দি কারাগার ভেঙে পালানোর চেষ্টা করেন।
তাওহীদের ভাষ্য, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনী গুলি চালায়। এতে কয়েকজন হতাহত হন। ওই ঘটনার পর ৬ আগস্ট সারাদিন কারাগারে চরম অস্থিরতা বিরাজ করে। নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে সেদিন রান্না করা সম্ভব হয়নি। ফলে সারাদিন আমাদের কোনো খাবার দেওয়া হয়নি। বিকেল প্রায় ৫টার দিকে ডাল-ভাত দেওয়া হলে সেটি খেয়েই ক্ষুধা নিবারণ করি।
তিনি বলেন, সেদিন রাত ৯টার দিকে খবর পাই, রাতে আমাদের সবাইকে মুক্তি দেওয়া হবে। এরপর একে একে বন্দিদের নাম ডাকা শুরু হয়। আমাদের সিরিয়াল আসতে আসতে রাত প্রায় আড়াইটা বেজে যায়। রাত ২টা ৩৫ থেকে ২টা ৪০ মিনিটের মধ্যে আমরা কারাগার থেকে মুক্তি পাই। অর্থাৎ ৭ আগস্টের প্রথম প্রহরে আমরা মুক্ত হয়ে নতুন বাংলাদেশের সূচনার সাক্ষী হই।
এম/জেবি




















































