একটি ঘর। বৃদ্ধ বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। টেবিলজুড়ে বই, খাতা, ইংরেজি শেখার নোট, কম্পিউটার কোর্সের কাগজপত্র। দেয়ালে ঝুলছে স্বপ্নআঁকা নানা ছবি। শোকেসে কৃতিত্বের নানা ধরনের ক্রেস্ট-মেডেল। সেই ঘর আজও আছে, আছে ছেলের ব্যবহৃত জিনিসপত্রও। শুধু নেই ছেলেটি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সকালে ঘর থেকে বের হওয়ার আগে মা রাগ করে বলেছিলেন, ‘আজ যদি আন্দোলনে যাও, তাহলে আর ঘরে ঢুকতে দেওয়া হবে না।’ ছেলেটি শান্ত গলায় জবাব দিয়েছিল, ‘আজ আমি ফিরব না।’ কথাটি যে এভাবে সত্যি হয়ে যাবে, তা কল্পনাও করতে পারেননি বাবা সৈয়দ গাজিউর রহমান।
বিকেল গড়িয়ে রাত। হাসপাতাল থেকে হাসপাতাল। তারপর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গ। লাশের স্তূপের নিচে খুঁজে পান নিজের একমাত্র সন্তান, ১৫ বছর বয়সী সৈয়দ মুনতাসির রহমানকে। বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক উপপরিচালক, সত্তরোর্ধ্ব গাজিউর রহমান আজও সেই রাতের স্মৃতি ভুলতে পারেন না। কথা বলতে বলতে কখনও থেমে যান, কখনও দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। মনে হয়, তিনি এখনো বিশ্বাস করতে পারেন না, একমাত্র সন্তান আর কখনো ফিরবে না।
কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলনের প্রথম দিন থেকেই রাজপথে যাওয়া শুরু করে মুনতাসির। শুরুতে বাবা-মা ভেবেছিলেন, এটি অন্য সব ছাত্র আন্দোলনের মতোই কয়েক দিনের বিষয়। কিন্তু জুলাই যত এগিয়েছে, ছেলের ভেতর তত বড় পরিবর্তন দেখেছেন তারা।
গাজিউর রহমান বলেন, ‘ওকে দেখতাম খুব চিন্তিত। ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের মৃত্যুর খবর ওকে খুব নাড়া দিত। নিষেধ করলেও বলত, সবাই যদি ঘরে বসে থাকে, তাহলে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে কে?’
তিনি বলেন, ছেলের এই দৃঢ়তা একদিনে তৈরি হয়নি। প্রতিদিনের ঘটনা, গুলিতে মানুষের মৃত্যু, আহতদের ছবি তাকে ভেতর থেকে বদলে দিয়েছিল। বাবা হিসেবে ভয় পেয়েছেন, তবু ছেলের বিশ্বাসের কাছে শেষ পর্যন্ত হার মেনেছেন।
মুনতাসির শুধু আন্দোলনের একজন অংশগ্রহণকারী ছিল না। ২০২৪ দাখিল পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছিল। স্বপ্ন ছিল আলিম শেষ করে বুয়েটে ভর্তি হওয়ার। বাবা গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার কথা বললেও রাজি হয়নি। বরং ইংরেজি ও কম্পিউটার কোর্সে ভর্তি হয়েছিল। শিশু-কিশোরদের বিভিন্ন ম্যাগাজিনেও নিয়মিত লিখত।
গাজিউর রহমান বলেন, ‘ওর পুরো জীবনটাই তো সামনে ছিল। কত পরিকল্পনা, কত স্বপ্ন ছিল। সব এক মুহূর্তে শেষ হয়ে গেল।’
৫ আগস্টের সকালটা ছিল অন্য দিনের চেয়ে আলাদা। চারদিকে উত্তেজনা, সংঘর্ষ আর গুলির খবর। ছেলে যাতে বাইরে যেতে না পারে, সে জন্য বাবা-মা তাকে ঘরের ভেতর আটকে রাখেন।
তিনি বলেন, ‘আমরা সত্যি ভয় পেয়েছিলাম। ওর মা বারবার বলছিল, আজ কোথাও যাবে না। আমি একটু ওয়াশরুমে গিয়েছিলাম। সেই সুযোগে ও বের হয়ে যায়।’
বের হওয়ার আগে মুনতাসির বাবাকে বলেছিল, ‘দেশ স্বাধীন না হলে আমি আর ফিরব না।’ আর মাকে বলেছিল, ‘আজ আমি ফিরব না।’ গাজিউর রহমান বলেন, ‘সেই কথাটাই আজও কানে বাজে। ও সত্যিই আর ফেরেনি।’
আন্দোলনের দিনগুলোতে মুনতাসির সাধারণত জোহরের আগেই বাসায় ফিরে আসত। তাই দুপুর পেরিয়ে গেলেও খুব একটা দুশ্চিন্তা করেননি বাবা। তিনি তখন কাজলা এলাকায় আহতদের সেবায় ব্যস্ত ছিলেন।
তিনি বলেন, ‘ভাবছিলাম, বিজয় উদযাপন শেষে ছেলে বাসায় ফিরে আসবে। কিন্তু জোহর পেরিয়ে আসর, তারপর সন্ধ্যা হয়ে গেল। তখন আর বসে থাকতে পারিনি।’
এরপর শুরু হয় এক বাবার মরিয়া খোঁজ। যাত্রাবাড়ী, আশপাশের হাসপাতাল, পরিচিতজন, বন্ধু, আত্মীয়, যেখানে সম্ভব সব জায়গায় ছুটে বেড়ান তিনি। প্রতিটি হাসপাতালের করিডোরে মনে হয়েছে, এবার হয়তো ছেলেকে খুঁজে পাবেন। কিন্তু কোথাও তার সন্ধান মেলেনি।
রাত প্রায় সাড়ে ১১টার দিকে তারা পৌঁছান ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেই দৃশ্যের কথা বলতে গিয়ে আজও কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে গাজিউর রহমানের।
তিনি বলেন, ‘চারদিকে শুধু রক্ত। আহত মানুষের আর্তনাদ। স্বজনদের কান্না। কেউ ঠিকমতো কিছু বলতে পারছিল না। পরে মর্গে গিয়ে দেখি, লাশের পর লাশ স্তূপ করে রাখা।’
হাসপাতালের রেজিস্টারে কোনো তথ্য না পেয়ে তিনি সরাসরি মর্গে ঢোকেন। সেখানে একটি মরদেহ দেখে থমকে দাঁড়ান।
‘মুখটা ছিল পতাকায় ঢাকা। শরীরে শুধু পায়জামা। পায়ের নখ আর পায়জামা দেখে বুঝলাম, এটাই আমার ছেলে।’
এই পর্যন্ত বলেই কিছু সময় চুপ থাকেন তিনি। তারপর নিচু স্বরে বলেন, ‘একজন বাবার জীবনে এর চেয়ে কঠিন মুহূর্ত আর হতে পারে না।’
তিনি জানান, তখনও মুনতাসিরের শরীর থেকে রক্ত বের হচ্ছিল। চারপাশের পরিস্থিতি এতটাই বিশৃঙ্খল ছিল যে, নিয়মমাফিক পোস্টমর্টেমও করা সম্ভব হয়নি। পরদিন কুমিল্লার নাঙ্গলকোটে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
ছেলের হত্যার বিচার চেয়ে মামলা করেছে স্থানীয়রা দুনিয়াদার। কিন্তু দুই বছর পার হলেও বিচারিক প্রক্রিয়ায় দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি বলে আক্ষেপ তার। তিনি বলেন, ‘এখনও মামলার কোনো শুনানি শুরু হয়নি। কিছু বড় ঘটনার বিচার এগোলেও আমাদের মতো অনেক পরিবারের মামলা পড়ে আছে। অনেক আসামি জামিনও পেয়ে যাচ্ছে।’
শহীদ পরিবারগুলোর বিভিন্ন সংগঠনের মধ্যে বিভক্তি নিয়েও হতাশ তিনি। তার ভাষায়, ‘আমরা কোনো রাজনীতি করতে আসিনি। আমরা শুধু সন্তান হত্যার বিচার চাই।’
গাজিউর রহমানের মতে, তার ছেলে কোনো চাকরি বা ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য আন্দোলনে যায়নি। তিনি বলেন, ‘ও চেয়েছিল অন্যায়-অবিচারের পরিবর্তন। কিন্তু আজও দেখি মেধার চেয়ে রাজনৈতিক প্রভাব বেশি কাজ করছে। তাহলে এত আত্মত্যাগের মূল্য কোথায়?’
আজও মুনতাসিরের ঘরে খুব বেশি কিছু বদলাননি তিনি। ছেলের বই, খাতা, লেখার কাগজ, ব্যবহৃত জিনিসপত্র আগের জায়গাতেই রাখা আছে। ‘মনে হয়, এখনই হয়তো দরজা খুলে বলবে, আব্বু আমি এসেছি। কিন্তু জানি, সে আর কোনোদিন ফিরবে না।’
কথার শেষে দীর্ঘশ্বাস ফেলে গাজিউর রহমান বলেন, ‘সন্তান হারানোর শোক নিয়ে মানুষ বেঁচে থাকে। কিন্তু বিচার না পাওয়ার কষ্ট আরও বড়। আমি শুধু চাই, আমার ছেলের হত্যাকারীদের বিচার দেখে যেতে। সেটাই হবে একজন বাবা হিসেবে আমার শেষ শান্তি।’
এমআর/জেবি




























































