গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পেরিয়ে গেলেও গাইবান্ধায় থামেনি ছয় শহীদ পরিবারের কান্না। প্রিয়জন হারানোর শোক আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তা—সব মিলিয়ে নির্ঘুম রাত কাটছে এসব পরিবারের সদস্যদের। এছাড়া এ জেলায় আরও ২৪৬ জন জুলাইযোদ্ধা আছেন। তারা বলছেন, সময় এগিয়ে গেলেও তাদের জীবনে ক্ষত আজও তাজা রয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকার পতনের জন্য বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে গিয়ে শহীদ হয়েছেন গাইবান্ধা সদর উপজেলার খোলাহাটী গ্রামের সুজা মিয়ার ছেলে সুজন মিয়া (৩২), সাদুল্লাপুর উপজেলার নুরপুর গ্রামের হাইদুল ইসলামের ছেলে নাজমুল মিয়া (২৪), সাঘাটা উপজেলার শ্যামপুর গ্রামের খলিলুর রহমানের ছেলে সাজ্জাদ হোসেন সজল (১৯), পলাশবাড়ী উপজেলার পশ্চিম গোপীনাথপুর গ্রামের খাজা মিয়ার ছেলে আরিফুল মিয়া (২৮), কিশোরগাড়ী গ্রামের ইবনে সাঈদ মন্ডল ওরফে জালিম মিয়ার ছেলে শাকিনুর রহমান (২৬) ও গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার শাখাহাতী গ্রামের মোনতাজ উদ্দিন ব্যাপারীর ছেলে জুয়েল রানা (২৭)। তারা পেশায় কেউ কেউ গার্মেন্টস শ্রমিক আবার কেউ কোম্পানির প্রতিনিধি ও ছাত্র ছিলেন।
এছাড়া গণঅভ্যুত্থানে আহত হয়েছেন ২৪৬ জন। তাদের মধ্যে গাইবান্ধা সদর উপজেলায় ৬৩ জন, সাদুল্লাপুরে ৩৩ জন, সাঘাটায় ৪৬ জন, গোবিন্দগঞ্জে ৩৭ জন, সুন্দরগঞ্জে ৩৬ জন, পলাশবাড়ীতে ১৯ জন ও ফুলছড়ি উপজেলায় ১২ জন রয়েছেন। তারা সবাই সরকারি গেজেটভুক্ত।
স্বজনরা বলছেন, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সারাদেশ যখন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতা আন্দোলনে উত্তাল, তখন এই আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন আমাদের ছেলেরা। এসময় পুলিশের গুলিতে অনেকে শহীদ ও আহত হয়েছেন।
শহীদদের স্বজনরা জানান, কেউ হারিয়েছেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্যকে। কেউবা সন্তান বা স্বামীকে। এই প্রিয়জনের স্মৃতি প্রতিদিনই তাদের তাড়া করে বেড়ায়। বৃদ্ধ মা-বাবা ছেলের ছবি বুকে নিয়ে কাঁদেন, আর স্ত্রীদের অনেকেই সংসারের হাল ধরতে হিমশিম খাচ্ছেন। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, যারা চলে গেছে তারা আর ফিরবে না, কিন্তু তাদের আত্মত্যাগ যেন বিস্মৃত না হয়।
স্বজনদের একটাই প্রত্যাশা—শহীদদের আত্মত্যাগের যথাযথ মূল্যায়ন, ঘটনার সুষ্ঠু বিচার এবং পরিবারের সদস্যদের মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের ব্যবস্থা করা। তাদের ভাষায়, আমাদের কান্না থামবে না, তবে ন্যায়বিচার ও রাষ্ট্রের আন্তরিক সহযোগিতা কিছুটা হলেও সেই বেদনা লাঘব করতে পারে।

শহীদ নাজমুল মিয়ার মা গোলেভান বেগম বলেন, দুই বছর পেরিয়ে গেলেও ঘরে ঝুলছে ছেলের ছবি। স্মৃতি চিহ্নগুলো আগলে রাখা হয়েছে যত্নে, আর চোখের কোণে জমে আছে না বলা অসংখ্য অশ্রুর গল্প। তার দাবি ছেলের আন্দোলনে দেশের পট পরিবর্তন হলেও আজও মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই তার।
জুলাই যোদ্ধা আশানুর রহমান কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের একদফা দাবিতে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ি। তখন আমার একটি হাত হারাতে হয়েছে। এখন পঙ্গুত্ববরণ করছি।
তার ভাষ্য, গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি যতই সময়ের সঙ্গে পুরনো হোক না কেন, শহীদ পরিবার ও আহত যোদ্ধাদের সংগ্রাম এখনো শেষ হয়নি। তাদের প্রত্যাশা, রাষ্ট্র ও সমাজ তাদের আত্মত্যাগের যথাযথ মূল্যায়ন করবে এবং সম্মানজনক জীবনযাপনের সুযোগ নিশ্চিত করবে।
গাইবান্ধা জুলাই যোদ্ধা সংসদের সভাপতি আমিনুর রহমান ঢাকা মেইলকে বলেন, গণঅভ্যুত্থানে যারা শহীদ ও আহত হয়েছেন তাদের এবং তাদের পরিবারে সার্বক্ষণিক খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। তারা সবাই সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়াক এ প্রত্যাশা করি সবসময়। সেইসঙ্গে জেলার সকল জুলাই যোদ্ধাদের রাষ্ট্রীয়ভাবে পুনর্বাসনের দাবি করছি।
গাইবান্ধা জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান মোল্লা ঢাকা মেইলকে বলেন, গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের জন্য একটি ডাটাবেজ করা হয়েছে। তাদের ও তাদের পরিবারের সার্বিক সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে।
প্রতিনিধি/জেবি




















































