২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস লিখতে গেলে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর নাম আলাদাভাবে উচ্চারিত হবে। পুরো আন্দোলনজুড়ে ওই এলাকা ছিল রণক্ষেত্র। টিয়ারশেল, শর্টগান, স্নাইপারের গুলি, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, রক্তাক্ত সড়ক, আহত-নিহত মানুষের আর্তনাদ আর সাধারণ মানুষের অকুতোভয় প্রতিরোধে যাত্রাবাড়ী হয়ে উঠেছিল আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্র। সেই রণক্ষেত্রের একজন প্রত্যক্ষ যোদ্ধা সাদেকুল ইসলাম। আন্দোলনের শুরু থেকে ৫ আগস্ট গণভবনে পৌঁছানো পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের সাক্ষী তিনি। পুলিশের গুলির সামনে দাঁড়িয়েছেন, শর্টগান জ্যাম হয়ে অলৌকিকভাবে প্রাণে বেঁচেছেন, নিজের চোখের সামনে সহযোদ্ধাদের মৃত্যুর দৃশ্য দেখেছেন, আহতদের উদ্ধার করেছেন। আন্দোলনের মধ্যেই তার বাড়িতে অভিযান চালিয়ে পরিবারকে ভয়ভীতি দেখানো হয়। মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে এক পুলিশ কর্মকর্তা তাকে পেলে 'কলিজা ছিঁড়ে ফেলার' হুমকিও দেন।
জুলাই আন্দোলনের সেই রুদ্ধশ্বাস দিনগুলোর স্মৃতি, ভয়, সাহস, ক্ষোভ এবং বিজয়ের গল্প ঢাকা মেইলকে দেওয়া এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে তুলে ধরেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মহিউদ্দিন রাব্বানি।
ঢাকা মেইল: জুলাই আন্দোলনে যুক্ত হওয়ার পেছনের গল্পটা কী?
সাদেকুল ইসলাম: আমার কাছে এটা কখনো শুধু কোটা সংস্কারের আন্দোলন ছিল না। আমি এটাকে গণমানুষের মুক্তির আন্দোলন হিসেবে দেখেছি। যখন দেখলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীদের ওপর হামলা হয়েছে, তখন মনে হয়েছে ঘরে বসে থাকার কোনো সুযোগ নেই।
১৫ জুলাইয়ের সেই ঘটনার পর আমি সিদ্ধান্ত নিই, আন্দোলনে সরাসরি অংশ নেব। ১৬ জুলাই মতিঝিলে কর্মসূচি শেষ করে যাত্রাবাড়ীতে চলে আসি। কাজলা এলাকায় দনিয়া কলেজ, একে স্কুল, বর্ণমালা, শামসুল হক খান স্কুলসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যুক্ত হই। সেখান থেকেই আমাদের প্রতিরোধ শুরু।
ঢাকা মেইল: ১৭ জুলাই যাত্রাবাড়ীতে কী ঘটেছিল?
সাদেকুল ইসলাম: আসরের নামাজ পড়ে কাজলা মসজিদের সামনে দাঁড়িয়ে জুতা পরছি। ঠিক তখনই পুলিশের প্রথম টিয়ারশেল এসে পড়ে। মুহূর্তেই পুরো এলাকা ধোঁয়ায় ভরে যায়। সবাই দৌড়াতে শুরু করে।
পুলিশ আমাদের শনির আখড়া পর্যন্ত ধাওয়া করে। কিন্তু মাগরিবের পর আবার সবাই ফিরে আসি। তখনই বুঝেছিলাম, ভয় দেখিয়ে এই আন্দোলন থামানো যাবে না।
ঢাকা মেইল: ১৮ জুলাইয়ের সেই অলৌকিক ঘটনাটা কী ছিল?
সাদেকুল ইসলাম: সেদিন যাত্রাবাড়ী থানার সামনে সবচেয়ে ভয়াবহ সংঘর্ষ হচ্ছিল। পুলিশ, বিজিবি, ছাত্রলীগ সবাই একসঙ্গে ছিল। আমি দৌড়ে একটা গলির দিকে যাচ্ছিলাম। তখন ফ্লাইওভারের ওপর থাকা পুলিশের একটি রায়ট কার থেকে একজন সদস্য আমার দিকে শর্টগান তাক করে ট্রিগার টানে। আমি নিশ্চিত ছিলাম, গুলিটা এবার আমার পিঠে লাগবে। পরে আমার এক বন্ধু এসে বলল, `আল্লাহ আপনাকে বাঁচিয়ে দিয়েছেন। শর্টগানটা জ্যাম হয়ে গিয়েছিল। ট্রিগার চাপলেও গুলি বের হয়নি।‘ আমি বিশ্বাস করি, সেদিন আল্লাহ আমাকে নতুন জীবন দিয়েছিলেন।

ঢাকা মেইল: স্থানীয় মানুষ কীভাবে আন্দোলনে সহযোগিতা করেছিলেন?
সাদেকুল ইসলাম: যাত্রাবাড়ীর সাধারণ মানুষ না থাকলে এতদিন প্রতিরোধ টিকিয়ে রাখা সম্ভব হতো না। মাছ বাজারের আড়তদাররা নিজেদের দোকানের গদি, চেয়ার, টেবিল, টিন খুলে আমাদের দিয়ে দিয়েছেন। আমরা সেগুলো দিয়ে ব্যারিকেড বানিয়েছি। গুলির সময় এগুলোর আড়ালে আশ্রয় নিয়েছি। এলাকার মায়েরা আমাদের জন্য খাবার রান্না করে দিয়েছেন। কেউ পানি এনেছেন, কেউ ওষুধ। সবাই মনে করতেন, এই লড়াই তাদের নিজেদেরও।
ঢাকা মেইল: ১৯ জুলাই কেন সবচেয়ে ভয়াবহ দিন ছিল?
সাদেকুল ইসলাম: ওই দিন প্রথম স্নাইপারের গুলি দেখি। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে আমার চোখের সামনেই কয়েকজন ছাত্র মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। গুলিগুলো সরাসরি মাথা আর বুকে লাগছিল। বিকেলে রায়েরবাগ থেকে মিছিল নিয়ে এগোচ্ছিলাম। 'স্বপ্ন' সুপার শপের সামনে এসে আর সামনে যেতে পারছিলাম না। রাস্তার একটি ট্রাককে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করি। আমরা একে অপরকে সাহস দিয়ে বলতাম, `গুলি শেষ... গুলি শেষ...’ তারপর সামনে এগোতাম। কিছুক্ষণ পর আবার গুলি শুরু হয়ে যেত। আমার পাশেই এক বন্ধুর পায়ে গুলি লাগে। এত জোরে গুলি লাগে যে, পায়ের হাড় ভেঙে ঝুলে যায়। আমি নিজেই তাকে কোলে করে রিকশায় তুলে হাসপাতালে পাঠাই। সেই দিনই মনে হয়েছিল, হয়তো আজ শহীদ হয়ে যাব।
ঢাকা মেইল: সেদিন মৃত ভেবে ফেলে রাখা একজন আহত আন্দোলনকারীকে উদ্ধারের ঘটনাটি বলবেন কি?
সাদেকুল ইসলাম: রাত আটটার পর ড্রোন এড়াতে আমরা আড়ালে ছিলাম। দূরে একটা মানুষকে নড়তে দেখি। কাছে গিয়ে বুঝি, পুলিশ তাকে মৃত ভেবে ফেলে রেখে গেছে। কিন্তু তিনি তখনও জীবিত ছিলেন। আমরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাকে উদ্ধার করি। আজও জানি না তিনি কে ছিলেন কিংবা পরে বেঁচে ছিলেন কি না।
ঢাকা মেইল: আপনার বাড়িতে পুলিশের অভিযানের ঘটনা কী ছিল?
সাদেকুল ইসলাম: ২০ জুলাই রাতে ৫০ থেকে ৬০ জন পুলিশ আমাদের বাসা ঘিরে ফেলে। নিচের গেট খুলতে না পেরে শর্টগান দিয়ে তালা ভেঙে ভেতরে ঢোকে। আমাকে আর দুই ভাইকে না পেয়ে পুরো বাসা তছনছ করে। সিসিটিভি ভেঙে ফেলে। আসবাবপত্র ভাঙচুর করে। আমার মা, স্ত্রী আর ভাবিকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করা হয়। যাত্রাবাড়ী থানার তৎকালীন ওসি (তদন্ত) জাকির হোসেন আমার মাকে বলেছিলেন,
‘তোমার তিন ছেলের একজনকে পেলে আগে ওর কলিজা ছিঁড়ে ফেলতাম।’ এরপর পুরো ভবনের অন্য পুরুষদের ধরে নিয়ে যায়। শর্ত দেয়, আমাদের তিন ভাইয়ের একজনকে ধরিয়ে দিলে বাকিদের ছেড়ে দেওয়া হবে।
ঢাকা মেইল: ড্রোন নজরদারি এড়াতে কী করতেন?
সাদেকুল ইসলাম: এটা এখন মনে হলে অবাক লাগে। রাতে আমরা রাস্তায় বসে বাদাম খেতাম। তাস খেলতাম। লুডু খেলতাম। আড্ডা দিতাম। ড্রোন থেকে যেন মনে হয় হাজার হাজার মানুষ সব সময় রাস্তায় অবস্থান করছে। এই কৌশল অনেক কাজে দিয়েছিল।
ঢাকা মেইল: ৪ ও ৫ আগস্টের ঘটনাগুলো কেমন ছিল?
সাদেকুল ইসলাম: ৪ আগস্ট আমরা দুবার যাত্রাবাড়ী থানা ঘেরাও করি। একসময় পুলিশ হাতজোড় করে ক্ষমা চায়। আমরা সরে আসার পর তারা আবার গুলি চালায়। ৫ আগস্ট সকালে প্রচণ্ড বৃষ্টির মধ্যে চিটাগাং রোড-মৌচাক থেকে মাত্র ২০-২৫ জনকে নিয়ে যাত্রা শুরু করি। সঙ্গে কয়েকজন প্রবীণ মানুষও ছিলেন। সাইনবোর্ডে সেনাবাহিনী ও র্যাবের ব্যারিকেড ছিল। কিন্তু মানুষের ঢল দেখে তারা ব্যারিকেড সরিয়ে দেয়।
এরপর ছোট্ট মিছিলটি মুহূর্তেই হাজার হাজার মানুষের জনসমুদ্রে পরিণত হয়। আমি উঁচু জায়গায় উঠে মিছিলের শেষ দেখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু শেষ দেখা যায়নি।

ঢাকা মেইল: গণভবনে পৌঁছে কী করেছিলেন?
সাদেকুল ইসলাম: শেখ হাসিনার চলে যাওয়ার খবর নিশ্চিত হওয়ার পর আমরা গণভবনে পৌঁছাই। সেখানে গিয়ে দুই রাকাত শুকরিয়ার নামাজ আদায় করি। আমার মনে হয়েছিল, এত রক্ত, এত ত্যাগ, এত কষ্টের পর আল্লাহ আমাদের বিজয় দিয়েছেন।
ঢাকা মেইল: আজ দুই বছর পর জুলাই আন্দোলনকে কীভাবে দেখেন?
সাদেকুল ইসলাম: এই আন্দোলন শুধু সরকার পরিবর্তনের জন্য ছিল না।
এটা ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর আন্দোলন। একটি ইনসাফভিত্তিক, দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে আমরা রাস্তায় নেমেছিলাম। অনেক মানুষ শহীদ হয়েছেন, অসংখ্য মানুষ আহত হয়েছেন। তাদের ত্যাগ যেন কখনো বৃথা না যায়, সেটাই আমার প্রত্যাশা।
এমআর/জেবি





































