বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

একজন নিউরোসার্জনের জবানবন্দিতে রক্তাক্ত জুলাই

বোরহান উদ্দিন
প্রকাশিত: ০৫ আগস্ট ২০২৬, ১২:১৫ পিএম

শেয়ার করুন:

একজন নিউরোসার্জনের জবানবন্দিতে রক্তাক্ত জুলাই
জুলাই আন্দোলন ও অধ্যাপক ডা. মাহফুজুর রহমান। ছবি” সংগৃহীত

২০২৪ সালের জুলাই মাস। রাজপথ তখন উত্তপ্ত, বাতাসে বারুদের গন্ধ, আর চারদিকে শুধু আর্তনাদ ও বুলেটের শব্দ। সেই ভয়াল দিনগুলোতে ঢাকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারগুলো পরিণত হয়েছিল এক একটি যুদ্ধক্ষেত্রে। দিন-রাত এক করে চিকিৎসকেরা সেখানে লড়েছেন প্রতিটি মানুষের প্রাণ বাঁচাতে।

যমে-মানুষে টানাটানির সেই স্মৃতি স্মরণ করতে গিয়ে সম্প্রতি চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি হাসপাতালের নিউরোসার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মাহফুজুর রহমান। তার সেই স্মৃতির কথাগুলোতে উঠে এসেছে একদিকে যেমন এক বিভীষিকাময় অধ্যায়, অন্যদিকে তেমনি এক অদম্য প্রজন্মের বীরত্বগাথা।

বাবার হাতে সন্তানের রক্তভেজা অংশ

ডা. মাহফুজুর রহমানের মনে সবচেয়ে বড় ক্ষত হয়ে আছে একটি মর্মান্তিক ঘটনা। এক বাবা তার কিশোর সন্তানের নিথর দেহ নিয়ে হাসপাতালের গেটে ছুটে এসেছিলেন। বুকফাটা আর্তনাদ করে তিনি বলছিলেন, ‘একটু বাঁচান স্যার, আমার ছেলের মগজ পড়ে গেছে।’

উপস্থিত সবাইকে স্তব্ধ করে দেওয়া সেই দৃশ্য এখনো তাড়া করে ফেরে ডা. মাহফুজকে। তিনি জানান, এমন অন্তত চারজন কিশোরকে হাসপাতালে আনা হয়েছিল, যাদের বুলেটের আঘাতে মাথার খুলি উড়ে গিয়েছিল এবং স্বজনেরা তাদের মগজ হাতে করে নিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু ততক্ষণে নিভে গিয়েছিল সেই তাজা প্রাণগুলো।

আইসিইউতে রাতুলের ৪৫ দিনের লড়াই

১৩ বছরের কিশোর রাতুল ছিল তার বাবার একমাত্র সন্তান। বুলেটের আঘাতে অন্ধ হয়ে যাওয়া এই ছেলেটি দীর্ঘ ৪৫ দিন ধরে হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করেছে।

চিকিৎসকেরা সাধ্যের সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করেছিলেন তাকে সুস্থ করে তুলতে। যে দিন তাকে হাসপাতাল থেকে ছুটি দেওয়ার কথা, ঠিক তার আগের দিন ভোরে সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে রাতুল চলে যায় না-ফেরার দেশে। ডা. মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘রাতুলের মাথা বুলেটে উড়ে গিয়েছিল, ওর শুধু মগজ পড়ছিল। ৪৫ দিনের সেই দীর্ঘ লড়াই শেষ পর্যন্ত এক বাবার শূন্য বুকেই শেষ হয়।’

অস্বাভাবিক বুলেট ও এক বিস্ময়কর সাহস

হাসপাতালে আসা আহতদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে এক ভয়াবহ সত্যের মুখোমুখি হন ডা. মাহফুজুর রহমান। তিনি জানান, চিকিৎসাধীন রোগীদের শরীর থেকে তিনি নিজ হাতে অন্তত ৩০ থেকে ৪০টি বুলেট বের করেছেন।

ডাক্তারের ভাষ্য, সেগুলো সাধারণ কোনো গুলি ছিল না; আকারে অস্বাভাবিক বড় এবং অত্যন্ত শক্তিশালী এসব বুলেট সাধারণত যুদ্ধের ময়দানে স্নাইপাররা ব্যবহার করে। এই ঘাতক অস্ত্রের আঘাতে অনেকের বুক, চোখ ও ঘাড় ক্ষতবিক্ষত হয়ে গিয়েছিল।

Julay21
প্রতিটি হাসপাতাল ছিল রোগীতে ঠাসা। ছবি: সংগৃহীত

তবে এত সব বেদনার মাঝেও চিকিৎসকদের অবাক করেছিল আহত কিশোরদের সাহস। মাত্র ১৪ বছরের এক কিশোর, যার শরীরে বুলেট বিঁধে ছিল, সে অপারেশন থিয়েটারে যাওয়ার আগে ডা. মাহফুজকে বলেছিল, ‘স্যার, দ্রুত অপারেশনটা শেষ করেন। আমাকে আবার মাঠে ফিরতে হবে। পুলিশের গুলির সামনে কত গুলি করতে পারে আমি দেখব।’

মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও এমন সাহস দেখে বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন চিকিৎসকরাও।

কৃত্রিম খুলি নিয়ে নতুন জীবনের সূচনা

হাসপাতালের ৯২৮ নম্বর কেবিনে চিকিৎসা নেওয়া আরও এক অকুতোভয় লড়াকুর কথা বলছিলেন এই চিকিৎসক। গুলিতে তাঁর মাথার খুলি উড়ে গিয়েছিল। ডা. মাহফুজুর রহমানের নেতৃত্বে চিকিৎসকেরা অস্ত্রোপচার করে সেখানে একটি কৃত্রিম খুলি বসিয়ে তাকে নতুন জীবন দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।

তিনি অলৌকিকভাবে বেঁচে গেছেন এবং এখন সুস্থ আছেন। তবে তার সেই স্বাভাবিক জীবন আজ চিরকালের জন্য ঢাকা পড়ে গেছে কৃত্রিমতার আড়ালে।

বিইউ/জেবি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger

টাইমলাইন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর