বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

‘১৯ জুলাই আন্দোলনের হাল ধরেছিলেন মাদরাসা শিক্ষার্থীরা’

মহিউদ্দিন রাব্বানি
প্রকাশিত: ০৫ আগস্ট ২০২৬, ০৫:২২ এএম

শেয়ার করুন:

‘১৯ জুলাই আন্দোলনের হাল ধরেছিলেন মাদরাসা শিক্ষার্থীরা’
আকিফ আব্দুল্লাহ।

২০২৪ সালের ১৯ জুলাইয়ের দিনটি ছিল গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম রক্তাক্ত অধ্যায়। টানা তৃতীয় দিনের মতো সারা দেশে ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট, রাস্তাজুড়ে গুলির শব্দ, প্রাণহানি আর দমন-পীড়নের মধ্যেও থেমে থাকেনি আন্দোলন। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লেও রাজপথে প্রতিরোধের গতি ধরে রাখেন তৃণমূলের আন্দোলনকারীরা। পিছিয়ে ছিলেন না বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদরাসার শিক্ষার্থীরাও। একই দিনে শিক্ষার্থীরা সরকারের আলোচনার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে ৯ দফা দাবি ঘোষণা করলে আন্দোলন নতুন মোড় নেয়। সেদিন যাত্রাবাড়ী থেকে চিটাগাং রোড পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকা পরিণত হয়েছিল প্রতিরোধের দুর্গে। সেই দিনগুলোর অভিজ্ঞতা, আন্দোলনে মাদরাসা শিক্ষার্থীদের ভূমিকা, সাধারণ মানুষের আত্মত্যাগ এবং শহীদ পরিবারগুলোর বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে ঢাকা মেইলের সঙ্গে কথা বলেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সক্রিয় আলেম সমাজের প্রতিনিধি আকিফ আব্দুল্লাহ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মহিউদ্দিন রাব্বানি।

প্রশ্ন: বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে আপনার সম্পৃক্ততা কীভাবে তৈরি হয়েছিল?

আকিফ আব্দুল্লাহ: আন্দোলন শুরু হয়েছিল ১ জুলাই। তখন এটি মূলত কোটা সংস্কার আন্দোলন ছিল। মাদরাসার শিক্ষার্থী হওয়ায় দাবিটির সঙ্গে আমাদের সরাসরি কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থ জড়িত ছিল না। তবে শুরু থেকেই আমরা মনে করতাম, শিক্ষার্থীদের দাবি যৌক্তিক এবং ন্যায়সঙ্গত। তাই প্রকাশ্যে মাঠে না থাকলেও আন্দোলনের প্রতি আমাদের নৈতিক সমর্থন ছিল।

rabbani-2তাছাড়া শুরুতে আরেকটি বিষয় আমাদের ভাবিয়ে তুলেছিল। তখনকার সরকারের একটি প্রবণতা ছিল, মাদরাসার শিক্ষার্থী বা আলেমরা কোনো আন্দোলনে যুক্ত হলেই সেটিকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা। তাই আমরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছিলাম। কিন্তু ১৬ জুলাই আবু সাঈদের শাহাদতের ঘটনা পুরো পরিস্থিতি বদলে দেয়। এরপর চট্টগ্রামে ফারুক, ওয়াসিম ও শান্তর মৃত্যুর খবর আসে। তখন আমাদের কাছে বিষয়টি আর কোটার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। আমরা মনে করেছি, এটি ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা ও মানুষের অধিকার রক্ষার আন্দোলন। সেই দায়িত্ববোধ থেকেই আমরা রাজপথে নেমে আসি।

প্রশ্ন: ১৯ জুলাইয়ের আন্দোলনে মাদরাসার শিক্ষার্থীদের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল?

আকিফ আব্দুল্লাহ: ১৯ জুলাই ছিল শুক্রবার। মাদরাসা বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ এলাকায় অবস্থান করছিলেন। জুমার নামাজ শেষে হাজার হাজার শিক্ষার্থী মসজিদ থেকে বের হয়ে আন্দোলনে যোগ দেন। সেদিন অনেক জায়গায় আন্দোলন স্থবির হয়ে পড়ছিল। কিন্তু মাদরাসার শিক্ষার্থীরা তাকবির ধ্বনি দিয়ে মানুষকে আবার রাস্তায় নামান এবং আন্দোলনে নতুন প্রাণ সঞ্চার করেন। এর আগেই ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে যায়। ফলে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ ছিল না, নতুন কর্মসূচিও আসছিল না। সরকার হয়তো ভেবেছিল, এতে আন্দোলন থেমে যাবে। কিন্তু বাস্তবে হয়েছে উল্টোটা।

আমাদের কাছে থাকা তথ্য অনুযায়ী, ১৯ জুলাই শহীদ হওয়া মাদরাসার অধিকাংশ শিক্ষার্থী জুমার নামাজের পর আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন। তাই আমি মনে করি, ওই দিনের আত্মত্যাগ ও অংশগ্রহণ আন্দোলনের ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে।

প্রশ্ন: ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট আন্দোলনের গতিপথ কতটা বদলে দিয়েছিল?

আকিফ আব্দুল্লাহ: ইন্টারনেট বন্ধ হওয়ার পর প্রায় ছয়-সাত দিন আন্দোলনের কোনো কেন্দ্রীয় নির্দেশনা ছিল না। কিন্তু আন্দোলন থেমে যায়নি। বরং মাঠপর্যায়ের মানুষ নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিয়ে আন্দোলন চালিয়ে গেছেন। যাত্রাবাড়ী থেকে চিটাগাং রোড পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সড়ক আন্দোলনকারীদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। দেশের দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলের অন্যতম প্রবেশপথ হওয়ায় এই এলাকা কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এই অবস্থান ধরে রাখার ফলে আন্দোলনের গতি বজায় থাকে এবং সরকারের ওপর চাপও বাড়ে। আমার বিশ্বাস, এই সময় থেকেই আন্দোলন শুধু শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে এটি ধীরে ধীরে একটি গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়।

rabbani-3প্রশ্ন: আন্দোলনে সাধারণ মানুষের অবদানকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন?

আকিফ আব্দুল্লাহ: সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে যাত্রাবাড়ী, বাড্ডাসহ শ্রমজীবী মানুষের এলাকাগুলোতে আমরা অসাধারণ সমর্থন পেয়েছি। যখন পুলিশ গুলি চালাত, তখন স্বাভাবিকভাবেই অনেক শিক্ষার্থীর মধ্যে ভয় কাজ করত। কিন্তু দিনমজুর, রিকশাচালক, মাছ বিক্রেতা, ডিম বিক্রেতাসহ সাধারণ মানুষ সামনে দাঁড়িয়ে যেতেন। তাদের সাহস আমাদেরও সাহস জুগিয়েছে। অনেক শ্রমজীবী মানুষ শহীদ হয়েছেন। তাদের আত্মত্যাগ ইতিহাসে যথাযথভাবে মূল্যায়ন হওয়া উচিত। আমি মনে করি, সাধারণ মানুষের এই অংশগ্রহণই আন্দোলনকে গণমানুষের আন্দোলনে পরিণত করেছে।

প্রশ্ন: ১৮ জুলাই নারায়ণগঞ্জের চাষাড়া মোড়ের সেই দিনের অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

আকিফ আব্দুল্লাহ: সেদিনের দৃশ্য ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। চারদিক থেকে হামলা হচ্ছিল। একদিকে পুলিশ, অন্যদিকে রাজনৈতিক কর্মীরা আন্দোলনকারীদের ঘিরে ফেলেছিল। টিয়ারশেল, গুলি, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ায় পুরো এলাকায় আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। আমার চোখের সামনে একজন ফটোসাংবাদিক দুই চোখে গুলিবিদ্ধ হন। তার চোখ দিয়ে রক্ত ঝরছিল। সেই অসহায় দৃশ্য আজও ভুলতে পারিনি। ওই দিনের অভিজ্ঞতা আমাকে এখনো নাড়া দেয় এবং মনে করিয়ে দেয়, আন্দোলনের মূল্য কত বড় ছিল।

rabbani-4প্রশ্ন: শহীদ পরিবারগুলোর জন্য এখন কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে?

আকিফ আব্দুল্লাহ: আমরা পাঁচ শতাধিক শহীদ পরিবারের সঙ্গে দেখা করেছি। তাদের স্মৃতিচারণ, সাক্ষাৎকার, ভিডিও, অডিও এবং বিভিন্ন তথ্য সংরক্ষণ করছি। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেন প্রকৃত ইতিহাস জানতে পারে, সেটাই আমাদের লক্ষ্য। জুলাই জাদুঘরের জন্য শহীদদের রক্তমাখা পোশাক, ব্যক্তিগত স্মৃতিচিহ্নসহ বিভিন্ন উপকরণ সংগ্রহ করা হচ্ছে। পাশাপাশি যেসব পরিবার এখনো পর্যাপ্ত সহায়তা পাননি, তাদের পাশে ব্যক্তিগতভাবে দাঁড়ানোর চেষ্টা চলছে। একজন শহীদের বাবার জীবিকার ব্যবস্থা করতে মানুষের সহযোগিতায় একটি অটোরিকশাও কিনে দেওয়া হয়েছে। আমরা মনে করি, শহীদ পরিবারের পাশে দাঁড়ানো শুধু দায়িত্ব নয়, এটি আমাদের নৈতিক অঙ্গীকার।

প্রশ্ন: ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আপনার বার্তা কী?

আকিফ আব্দুল্লাহ: আমরা এমন একটি প্রজন্ম গড়ে তুলতে চাই, যারা শুধু আত্মত্যাগের মানসিকতা নয়, যোগ্যতা, দক্ষতা ও নেতৃত্বের গুণেও সমৃদ্ধ হবে। দেশের জন্য জীবন দেওয়ার মানসিকতা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে সেই সঙ্গে জ্ঞান, দক্ষতা, সততা ও দেশপ্রেম দিয়ে রাষ্ট্র গঠনের সক্ষমতাও থাকতে হবে।

আমাদের স্বপ্ন এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে তরুণরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে, আবার একই সঙ্গে নিজেদের দক্ষতা দিয়ে দেশকে এগিয়ে নেবে। সংগ্রাম শেষ হয়নি। দেশ গড়ার লড়াই এখনো চলছে, আর সেই লড়াইয়ে নতুন প্রজন্মকে প্রস্তুত করাই আমাদের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য।

এমআর/এমআর

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger

টাইমলাইন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর