সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

অভ্যুত্থানের মাধ্যমে পরিবর্তনের ধারা সূচিত হয়েছে: ঢাকা মেইলকে সারজিস

মো. ইলিয়াস হোসেন 
প্রকাশিত: ০৫ আগস্ট ২০২৬, ০৭:১৬ পিএম

শেয়ার করুন:

অভ্যুত্থানের মাধ্যমে পরিবর্তনের ধারা সূচিত হয়েছে: ঢাকা মেইলকে সারজিস
ঢাকা মেইল প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপচারিতায় নানা প্রশ্নের জবাব দিচ্ছেন এনসিপি নেতা ও জুলাই বিপ্লবী সারজিস আলম

আজ ৫ আগস্ট। রক্তক্ষয়ী জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী। ২০২৪ সালের ৫ জুন কোটা বৈষম্যের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া আন্দোলন ৫ আগস্টে গিয়ে চূড়ান্ত রূপ লাভ করে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে প্রায় দেড় হাজার মানুষকে প্রাণ দিতে হয়। 

তবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের যে আকাঙ্ক্ষা বা প্রত্যাশা ছিল, তা কতটুকু পূরণ হয়েছে? অভ্যুত্থানের অন্যতম সমন্বয়ক ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলমের কাছে সেই প্রশ্নই রেখেছিল ঢাকা মেইল।

তিনি বলেন, ‘আমার কাছে মনে হয় যে, আসলে আমাদের যে ক্ষতটা, বাংলাদেশের সামগ্রিকভাবে—আমাদের চিন্তায়, মননে, মগজে, কালচারে, আমাদের সিস্টেমগুলোতে—এটা একটা দীর্ঘ সময়ের ক্ষত। প্রথমে এটা মনে করছিলাম যে, এটা স্বাধীনতা পরবর্তী ৫৫ বছরের ক্ষত। তারপর মনে হলো যে না, এর আগেও তো পাকিস্তান যে আমল ছিল, ওই সময়েও তো আমরা এমন একটা করাপ্টেড কালচারের মধ্য দিয়ে এসেছি। এর আগে ব্রিটিশ আমল, শোষণের কালচারের মধ্য দিয়ে এসেছি, বৈষম্যের কালচারের মধ্য দিয়ে এসেছি। সো, এটা অনেকটা মনে হচ্ছে ব্যাপারটা আমাদের রক্তে প্রথিত হয়ে গিয়েছে।’

সারজিস বলেন, ‘সেই জায়গা থেকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরে অন্তত এই দুই বছরে কিংবা ওই সময়ে যতটা প্রত্যাশা ছিল, ততটা তো পূরণ হয়নি। কিন্তু আমি একটা জিনিস মনে করি যে, একটা পরিবর্তনের ধারা সূচিত হয়েছে। সেটা হচ্ছে, আপনি দেখবেন যে, ২৪-এর আগে তরুণ প্রজন্মের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ সেভাবে ছিল না। মতামতও সেভাবে দেওয়া হতো না এবং একটা ‘আই হেইট পলিটিক্স’—এই টাইপের একটা মানসিকতা ছিল। সেখান থেকে বের হয়ে এসে তারা রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করছে, মতামত দিচ্ছে এবং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।’

তিনি বলেন, ‘এখন যেকোনো পলিটিশিয়ান, আমলা বা যে কেউ যেকোনো কিছু করেই পার পেয়ে যাচ্ছেন, ওই সুযোগটা এখন আর নাই এবং আগের যে রাজনৈতিক কালচারগুলো ছিল, ওই একই কালচার যদি কেউ কন্টিনিউ করে, তাহলে রাজনীতিতে তার জন্য প্রাসঙ্গিক থাকা খুবই কঠিন হয়ে যাবে।’

এনসিপি নেতা বলেন, ‘আমার যেটা মনে হয় যে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছে, এটা একটা অর্জন। এর পরবর্তীতে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের রোডম্যাপ আমাদের সামনে এসেছে। যদিও এগুলো আরও বাস্তবায়ন যদি ওই টাইমে হয়ে যেত, তাহলে ভালো হতো। তো এই রোডম্যাপটাও আমাদের একটা অর্জন।’

তিনি বলেন, ‘এখন বিএনপি সরকার গঠন করেছে। ইতোমধ্যেই কিছুগুলো অধ্যাদেশ তারা আইনে পরিণত করেছে, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণগুলো এখনো করে নাই। তো সেটা যদি করে এবং যদি গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করে, তাহলে এটা একটা অর্জন হবে। ধীরে ধীরে এই সংস্কারটা আগাবে। কিন্তু যদি এটা না করে, তাহলে আমরা এটা মনে করি যে, বিএনপি ৫ বছর তাদের জন্য ক্ষমতায় টিকে থাকা কঠিন হবে। কারণ তারা তো মানুষের সঙ্গে প্রতারণার মধ্য দিয়ে টিকে থাকতে চাচ্ছে, এটা কিন্তু সম্ভব হবে না।’

সারজিস আরও বলেন, ‘এই যে ওসমান হাদির মতো মানুষেরা, তারা জীবন দিয়ে গেল; প্রত্যেকটা জেলা-উপজেলায় যখন আমরা যাই, মানুষ—তরুণ প্রজন্ম এই কথাটা বলে, ‘ওসমান হাদি হত্যার বিচারটা করেন। তারা এটাতে কানেক্টেড ফিল করে। সামগ্রিকভাবে মনে হয় যে, প্রত্যাশিত পরিবর্তন হয়নি, কিন্তু পরিবর্তনের ধারা সূচিত হয়েছে।’

এদিকে দুই বছরেই অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে অনৈক্য তৈরি হয়েছে। মামলা-হামলার মতো ঘটনাও ঘটছে। এর পেছনে কারণ কী? 

সারজিস আলম বলেন, ‘প্রথমত জুলাইয়ের আন্দোলনটা কোনো দলীয় ব্যানারে ছিল না। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে ছিল এবং সেখানে যারা সমন্বয়ক হিসেবে ছিল, তারাও ব্যাপারটা এরকম না যে একদম দলীয় মেইনস্ট্রিম পলিটিক্স করে আসা-ব্যাপারটা এরকম না। সেই জায়গা থেকে তাদের প্রতি মানুষের একটা আস্থা ছিল, গণমানুষ নেমে এসেছিল। একদম দলমত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষ নেমে এসেছিল রাস্তায়।’

তিনি বলেন, ‘যেমন ধরেন বিএনপি, তার ছাত্রসংগঠন বা যুবসংগঠন; জামায়াত, তাদের অঙ্গসংগঠন; ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, তাদের অঙ্গসংগঠনসহ এরকম অনেকেই- একদম দলমত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সিভিল সোসাইটি, শিক্ষক, কৃষক, মজুর, শ্রমিক, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা, মাদরাসার শিক্ষার্থীরা, সবাই নেমে এসেছিল।’

সারজিস বলেন, ‘অভ্যুত্থানের একদফার যে আংশিক অংশ, যেটা হচ্ছে শেখ হাসিনার পতন- অভ্যুত্থানের এই একদফার দুইটা মানে ছিল। এক, শেখ হাসিনার পতন এবং দ্বিতীয়ত, নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত। শেখ হাসিনার পতন হওয়ার পরেই যারা বিভিন্ন পলিটিক্যাল ঘর থেকে এসেছিল, তারা কিন্তু তাদের ঘরে ফিরে গিয়েছে।’

উদাহরণ দিয়ে এনসিপি নেতা বলেন, ‘ধরেন ছাত্রদল এখন বিএনপির সঙ্গে আছে, শিবির জামায়াতের সঙ্গে বা আমাদের অভ্যুত্থানের অনেক সহযোদ্ধা এনসিপির সঙ্গে আছে- এরকম একেকজন একেকজনের সঙ্গে।’

তিনি বলেন, ‘নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত গড়ার ক্ষেত্রে এইখানে যে ইউনিটিটা থাকা দরকার ছিল, সেই ইউনিটিটা এখন সেভাবে নাই। কেন নাই? কারণটা হচ্ছে, সবাই তাদের রাজনৈতিক দলের এজেন্ডাটাকে এখন মোর প্রায়োরিটি দিচ্ছে। শেখ হাসিনার পতনের সময় শেখ হাসিনার পতনের এজেন্ডাটাকে দলের এজেন্ডার চেয়ে বেশি প্রায়োরিটি দেওয়া হয়েছিল বলেই ওটা ঐক্যবদ্ধভাবে সম্ভব হয়েছিল। আবার আমি এটাও মনে করি যে, শেখ হাসিনার পতনের পরে যে যার দলে যাবে- এটাও স্বাভাবিক।’

সারজিস বলেন, ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হচ্ছে, এই যে সংস্কারের প্রশ্ন, সিস্টেমগুলো ঠিক করার প্রশ্ন—এই জায়গায় আমরা ইউনাইটেড হতে পারছি কি না, এটাকে মোর প্রায়োরিটি দিতে পারছি কি না এবং এটা কাদের দিতে হবে? যারা ক্ষমতায় থাকবে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তখন তাদেরকে প্রায়োরিটি দিতে হতো। যতটা দেওয়া দরকার, হয়তো ততটা পারার চেষ্টা করেছে।
এরপরে বিএনপি সরকার যতটা দেওয়া দরকার, অন্তর্বর্তীর ধারেকাছেও তারা দিচ্ছে না। তারা এখন তাদের ক্ষমতায় টিকে থাকা, মোর পাওয়ার—ওই জিনিসটাতে ফোকাসড।’

তিনি বলেন, ‘সবার আগে বিএনপি। বিএনপি যদি গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করে, বিএনপি যদি অধ্যাদেশগুলোকে সবগুলোকে আইনে পরিণত করে, তাদেরকে আমরা কী নিয়ে তখন বিরোধিতা করব? তখন হয়তো আমরা নাগরিক অধিকার নিয়ে কথা বলব। কিন্তু ওই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে তো তাদের সঙ্গে আর বিরোধিতা করার আমাদের কিছু থাকবে না।’

সারজিস বলেন, ‘এখন বিরোধিতা কেন করছি? কারণ তারা তো এটার (গণভোট) সঙ্গে সরাসরি প্রতারণা করছে। তারা যে কমিটমেন্টগুলো দিয়েছিল, জনগণ ৭০ শতাংশ ভোট দিয়েছে—সেগুলো তারা মানছে না। সেই জায়গা থেকে দলীয় একটা বিভাজন হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এখনকার বিভাজনটা মোর দলীয়র চেয়ে কারা সংস্কারের পক্ষে, কারা পক্ষে না; কারা পুরনো অপকালচারগুলোর পক্ষে, কারা পক্ষে না। আমরা এটার পক্ষে না। বিএনপি যদি এটার পক্ষে হয়, তাদের বিরুদ্ধে আমাদের এই ফাইটটা চলবে। এটা নিয়ে আমরা বিন্দুমাত্র পিছপা হওয়ার মানুষ না।’

এএইচ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger

টাইমলাইন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর