বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

‘প্রতি সেকেন্ডে গুলি আসছিল, তবু এগিয়ে গেছি'

মহিউদ্দিন রাব্বানি
প্রকাশিত: ০৫ আগস্ট ২০২৬, ০৪:৩৫ পিএম

শেয়ার করুন:

‘প্রতি সেকেন্ডে গুলি আসছিল, তবু এগিয়ে গেছি'
সম্মুখসারির জুলাইযোদ্ধা সাইদুল ইসলাম। ছবি: সংগৃহীত

রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে জুলাই আন্দোলনের অন্যতম সক্রিয় যোদ্ধা ছিলেন সাইদুল ইসলাম। শুরু থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত রাজপথে ছিলেন তিনি। তার ভাষ্য, আন্দোলনের সবচেয়ে কঠিন সময় ছিল ইন্টারনেট বন্ধ থাকার দিনগুলো এবং ৪ ও ৫ আগস্টের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। আন্দোলনের সময় নানা স্মৃতি তুলে ধরেন ঢাকা মেইলের কাছে।

সাইদুল বলেন, ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। পুলিশের নজরদারি এড়াতে তারা বাসার ভেতরে মোবাইল সিম চালু রাখতেন না। প্রয়োজন হলে বাসা থেকে নিরাপদ দূরত্বে গিয়ে ফোন চালু করে পরিচিতদের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন। কোথায় কখন জড়ো হতে হবে, কোন এলাকায় কর্মসূচি হবে, এসব বিষয় সেখানেই ঠিক করা হতো। তবে তার মতে, আন্দোলনের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল সাধারণ মানুষ। এটি কোনো একটি সংগঠন বা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর আন্দোলন ছিল না, পুরো মহল্লার মানুষ এতে যুক্ত ছিলেন। তাই রাস্তায় দাঁড়ালেই মুহূর্তের মধ্যে মানুষ একত্র হয়ে যেত।

তিনি বলেন, আন্দোলন দমাতে পুলিশ একের পর এক বাসাবাড়িতে অভিযান চালিয়েছে। অনেক সময় যাদের খুঁজছিল তাদের না পেয়ে বাড়ির ভাড়াটিয়াদের ধরে নিয়ে যেত। নারী-পুরুষ কাউকেই ছাড় দেওয়া হয়নি। পুরো এলাকায় গণগ্রেফতারের পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। এ কারণে অনেক আন্দোলনকারী বাসায় থাকতেন না এবং আত্মগোপন করেই আন্দোলনের কার্যক্রম চালিয়ে যেতেন।

৪ আগস্টের পরিস্থিতি সম্পর্কে সাইদুল বলেন, সেদিন যাত্রাবাড়ীতে আবারও বড় ধরনের সংঘর্ষ শুরু হয়। তার দাবি, সেনাবাহিনী সামনে-পেছনে অবস্থান নেওয়ায় আন্দোলনকারীরা পুলিশের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেননি। এতে অনেকেই আহত হন এবং কয়েকজন নিহতও হন।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, ৫ আগস্টের সকাল থেকেই যাত্রাবাড়ী এলাকায় পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। পুলিশ বারবার গুলি ছুড়তে থাকে। শেখ হাসিনা দেশত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়ার সময় আন্দোলনকারীরা যাত্রাবাড়ী থানার সামনে থাকা ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা করলে পুলিশ একযোগে ব্যাপক গুলিবর্ষণ শুরু করে।

Saidur3

সাইদুল সেই মুহূর্তের স্মৃতি বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের মাঝখানে ছিল কেবল একটি ফ্লাইওভারের পিলারের ব্যবধান। আন্দোলনকারীরা একটি পিলার থেকে আরেকটি পিলারের আড়াল নিয়ে সামনে এগোচ্ছিলেন। কিন্তু পিলারের আড়াল ছেড়ে বের হলেই গুলির মুখে পড়তে হচ্ছিল। তার ভাষায়, প্রতি সেকেন্ডে ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি আসছিল। তিনি নিজের চোখের সামনে ১৩ জনকে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যেতে দেখেছেন। দুপুর ২টার দিকে ফ্লাইওভারের আশপাশে এসব মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন বলে তিনি দাবি করেন।

সাইদুলের দাবি, ওই সময় সেনাবাহিনী যাত্রাবাড়ী থানার সামনেই অবস্থান করছিল। কিন্তু পুলিশের গুলিবর্ষণ বন্ধে তারা কোনো কার্যকর ভূমিকা নেয়নি। পরে পুলিশ থানার ভেতরে আশ্রয় নিলে সেনাবাহিনী আন্দোলনকারীদের সামনে ব্যারিকেড তৈরি করে।

তার ভাষ্য, সেনাবাহিনী চাইছিল আন্দোলনকারীরা যাত্রাবাড়িতেই অবস্থান করুক এবং গণভবনের দিকে অগ্রসর না হোক। কিন্তু আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য ছিল শাহবাগ হয়ে গণভবনের দিকে যাওয়া। এ নিয়ে সেনাবাহিনীর সঙ্গে আন্দোলনকারীদের ধস্তাধস্তি ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। একপর্যায়ে আন্দোলনকারীরা ব্যারিকেড ভেঙে গণভবনের উদ্দেশ্যে রওনা হন।

সাইদুল বলেন, গণভবনে পৌঁছানোর মধ্য দিয়েই তারা আন্দোলনের প্রাথমিক বিজয় অর্জন করেন। তবে তার মতে, সরকারের পতনই ছিল না আন্দোলনের চূড়ান্ত লক্ষ্য। তিনি মনে করেন, জুলাই আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিল রাষ্ট্রের মৌলিক সংস্কার এবং একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলা।

Saidur2

তার ভাষায়, ৫৪ বছর ধরে যে রাষ্ট্রীয় কাঠামো গড়ে উঠেছে, সেটিকে পরিবর্তন করে দুর্নীতিমুক্ত, শোষণমুক্ত এবং ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে মানুষ ইনসাফ, সম্মান ও আত্মমর্যাদার সঙ্গে জীবনযাপন করতে পারবে।

সাইদুলের অভিযোগ, এখন অনেক রাজনৈতিক দল জুলাই আন্দোলনের মূল আকাঙ্ক্ষাকে যথাযথভাবে ধারণ করছে না। তারা বিষয়টিকে শুধু ক্ষমতার পালাবদল বা নির্বাচনী রাজনীতির দৃষ্টিতে দেখছে। অথচ আন্দোলনকারীদের প্রত্যাশা ছিল রাষ্ট্রব্যবস্থার গভীর সংস্কার।

তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনে জীবন দেওয়া শহীদদের আত্মত্যাগের প্রকৃত মূল্যায়ন হবে তখনই, যখন রাজনৈতিক দলগুলো পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে এগিয়ে আসবে। তার বিশ্বাস, কেবল সরকার পরিবর্তন নয়, বরং সংস্কার, ন্যায়বিচার এবং জবাবদিহির ভিত্তিতে নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলাই ছিল জুলাই আন্দোলনের প্রকৃত লক্ষ্য।

এমআর/জেবি

 

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger

টাইমলাইন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর