‘মামাকে বলে একটা হেলিকপ্টার পাঠাতে পারো কি না দেখো। না হলে জাবির হোটেলেই মারা যাবো। আগুন লেগেছে পুরো হোটেলে... ছয় তলায় আছি। আর দেখা হবে না। আমাকে মাফ করে দিও।’— মৃত্যুর ঠিক আধা ঘণ্টা আগে মা ও বড় ভাবির কাছে মোবাইল ফোনে কল করে আকুল কণ্ঠে কথাগুলো বলেছিল ১৩ বছরের কিশোর মেহেদী হাসান।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট, স্বৈরাচার পতনের সেই ঐতিহাসিক দিনে আনন্দের বিজয় মিছিল মুহূর্তেই বিষাদে রূপ নেয় যশোরের ‘হোটেল জাবির ইন্টারন্যাশনাল’-এ। অগ্নিকাণ্ডের বিকট ধোঁয়া আর আগুনের লেলহান শিখায় ওই দিন যেসব প্রাণ অকালে ঝরে গিয়েছিল, তাদেরই একজন পুলেরহাট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র মেহেদী হাসান। আজ ৫ আগস্ট ট্র্যাজেডির বর্ষপূর্তিতে আজও বুকফাটা কান্না থামেনি তার পরিবারের।
যশোর সদর উপজেলার কৃষ্ণবাটি আমিননগর গ্রামের রুস্তম আলীর ছোট ছেলে মেহেদী ছিল পরিবারের চোখের মণি। স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত মা মনোয়ারা বেগম ভারতের চিকিৎসকের পরামর্শে মেহেদীকে গর্ভে নিয়েছিলেন; মেহেদীর জন্মের পর সত্যিই অলৌকিকভাবে ক্যানসারমুক্ত হন মা। সেই মা-ই আজ আক্ষেপ করে বলেন, ‘যে সন্তানের কারণে আমি জীবন পেলাম, সেই সন্তানই আমাকে ছেড়ে চলে গেল।’
আন্দোলনের অদম্য মুখ ও শেষ বিদায়
জুলাই আন্দোলনে প্রতিদিন স্কুল শেষে চাঁচড়া চেকপোস্টে মিছিল-সমাবেশে ছুটত মেহেদী। মা-বাবা বিপদের আশঙ্কায় বারণ করলে সে বলত, ‘আবু সাঈদ মারা গেছে। ভয়ে বসে থাকলে স্বৈরাচার হটাতে পারব না। প্রয়োজনে শহীদ হব।’
ঘটনার দিন দুপুরে বাবার কাছ থেকে ৩০ টাকা নিয়ে ‘বিজয় মিছিলে যাচ্ছি’ বলে বাইসাইকেল নিয়ে বের হয় মেহেদী। মিছিলে জাবির হোটেলের সামনে হঠাৎ বিকট শব্দে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লে আত্মরক্ষার্থে অন্যদের সঙ্গে সে-ও হোটেলের ভেতর আশ্রয় নেয়। কিন্তু সেই নিরাপদ ভাবাই কাল হলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই ভবনে আগুন লেগে ধোঁয়ায় অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে তারা।
ফায়ার সার্ভিস ও স্বজনেরা ছুটে যাওয়ার আগেই সব শেষ হয়ে যায়। রাতে যশোর জেনারেল হাসপাতালের মর্গে অর্ধপোড়া অবস্থায় মেহেদীর লাশ খুঁজে পান তার বাবা। পকেটে পড়ে ছিল বাবার দেওয়া সেই ৩০ টাকার অব্যবহৃত ২০ টাকা।
পরিবার চায় পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি
মেহেদী হাসানের অকালপ্রয়াণে জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশন, জেলা প্রশাসন ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে আর্থিক সহায়তা ও স্মারক দেওয়া হলেও পরিবারটি আজও অপেক্ষা করে আছে পূর্ণাঙ্গ গেজেটের।
বাবা রুস্তম আলী ক্ষোভ ও দুঃখের সাথে স্পষ্ট জানান, মেহেদী কোনো ধ্বংসাত্মক কাজে বা লুটপাটে সেখানে যায়নি; মিছিলে থাকা অবস্থায় জীবন বাঁচাতে সে আশ্রয় নিয়েছিল। বিপ্লবের এই কনিষ্ঠ বীর সেনানিকে অতি দ্রুত পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রীয় ‘শহীদ’ এর মর্যাদা ও গেজেটভুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন তাঁর স্বজনসহ পুরো যশোরবাসী।
প্রতিনিধি/জেবি






















































