জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়। কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে শুরু হয়ে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেওয়া সেই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতার পালাবদল ঘটে।
তবে আন্দোলনের পরিকল্পনা, ইন্টারনেট বন্ধ থাকাকালে দেশজুড়ে সমন্বয়, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সম্পৃক্ততা, ৫ আগস্টের ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির সিদ্ধান্ত এবং আন্দোলনের প্রকৃত লক্ষ্য নিয়ে এখনো নানা আলোচনা চলছে।
জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম সমন্বয়ক ও তৎকালীন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেছেন, সরকারের পতনই আন্দোলনের একমাত্র লক্ষ্য ছিল না; রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তর ও ফ্যাসিবাদী কাঠামো ভাঙাও ছিল আন্দোলনের অন্যতম উদ্দেশ্য।
একই সঙ্গে তিনি মনে করেন, অভ্যুত্থানের পরও রাজনৈতিক সহিংসতা ও হামলার ঘটনা প্রমাণ করে পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি এখনো পুরোপুরি বদলে যায়নি। আন্দোলনের নেপথ্যের নানা সিদ্ধান্ত, চ্যালেঞ্জ ও বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ঢাকা মেইলের নিজস্ব প্রতিবেদক আব্দুল হাকিম।
ঢাকা মেইল: জুলাইজুড়ে সারাদেশে আন্দোলন কীভাবে সমন্বয় করতেন? বিশেষ করে ইন্টারনেট বন্ধের সময়?
আসিফ মাহমুদ: আমরা শুরু থেকেই আন্দোলনকে ব্যক্তি-নির্ভর করিনি। আন্দোলনের নেতৃত্ব কয়েকটি লেয়ারে ভাগ করা ছিল। প্রতিটি অঞ্চলে সমন্বয়ক ও বিকল্প সমন্বয়ক ছিলেন। ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে গেলেও স্থানীয় নেতৃত্ব পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি বাস্তবায়ন করত। আমাদের লক্ষ্য ছিল, কেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ না থাকলেও আন্দোলন যেন থেমে না যায়।
ঢাকা মেইল: ছাত্রদল-বিএনপি ও শিবির-জামায়াতের ভূমিকা কী ছিল?
আসিফ মাহমুদ: শুরুটা ছিল শিক্ষার্থীদের। তাছাড়া ছাত্র সংগঠনগুলোর সঙ্গে সমন্বয় ছিল। পরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী নিজ নিজ অবস্থান থেকে আন্দোলনে যুক্ত হয়েছেন। তবে আন্দোলনের সিদ্ধান্ত, কর্মসূচি ও নেতৃত্ব ছিল শিক্ষার্থীদের হাতেই। এটি কোনো একক দলের আন্দোলন ছিল না, এটি ছিল ছাত্র-জনতার সম্মিলিত প্রতিরোধ।
ঢাকা মেইল: মাদরাসা ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল?
আসিফ মাহমুদ: বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হওয়ার পর আমরা সব স্তরের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানাই। বিশেষ করে আবু সাঈদের শাহাদাতের পর প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ব্যাপকভাবে আন্দোলনে যুক্ত হন। একইভাবে মাদরাসার শিক্ষার্থীরাও যাত্রাবাড়ীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সম্মুখসারিতে থেকে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন।
ঢাকা মেইল: ৫ আগস্টের আগে সবচেয়ে বড় চাপ কী ছিল?
আসিফ মাহমুদ: সহযোদ্ধারা শহীদ হচ্ছিলেন, অনেকে গ্রেফতার হচ্ছিলেন। আমরা কেউ আত্মগোপনে, কেউ ডিবি হেফাজতে ছিলাম। পরিবারের ওপর চাপ, যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত কঠিন। কিন্তু সমন্বয়কদের একটাই নির্দেশনা ছিল, যে পরিস্থিতিই আসুক, আন্দোলন থামানো যাবে না।
ঢাকা মেইল: ৬ আগস্টের বদলে ৫ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ করার সিদ্ধান্ত কেন?
আসিফ মাহমুদ: ৪ আগস্ট রাতেই সারাদেশ থেকে আরও প্রাণহানি ও সহিংসতার খবর আসছিল। একই সঙ্গে তথ্য পাই, সরকার আরও কঠোর অভিযান চালাতে পারে এবং ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তখন মনে হয়েছে, আর একদিন অপেক্ষা করলে আন্দোলনের গতি হারিয়ে যাবে। প্রাণহানি বাড়বে। তাই ঝুঁকি নিয়েই কর্মসূচি একদিন এগিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিই।
ঢাকা মেইল: কী প্রত্যাশা ছিল? কতটুকু পূরণ হয়েছে?
আসিফ মাহমুদ: সরকারের পতনই শেষ লক্ষ্য ছিল না। পুরো ফ্যাসিবাদী কাঠামোটাকে ভাঙতে চেয়েছিলাম। তাছাড়া বিচার নিশ্চিত করা, রাষ্ট্র সংস্কার এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলাও ছিল উদ্দেশ্য। রাজনৈতিক পরিবর্তন এসেছে, কিন্তু জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষার পূর্ণ বাস্তবায়নের জন্য এখনো অনেক পথ বাকি।
ঢাকা মেইল: বর্তমানে এনসিপির নেতাদের ওপর হামলাকে কীভাবে দেখেন?
আসিফ মাহমুদ: জুলাইয়ের চেতনা ছিল দমন-পীড়নের অবসান এবং গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা। অভ্যুত্থানের পরও যদি রাজনৈতিক হামলা চলতে থাকে, তাহলে বুঝতে হবে সেই পুরোনো সংস্কৃতি এখনো পুরোপুরি বদলায়নি। আমরা জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের লড়াই চালিয়ে যাব।
এএইচ/জেবি
































