বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

রাজপথের যেসব স্লোগানে কেঁপেছিল হাসিনার মসনদ

মিরাজুল ইসলাম
প্রকাশিত: ০৫ আগস্ট ২০২৬, ০২:৪৩ পিএম

শেয়ার করুন:

রাজপথের যেসব স্লোগানে কেঁপেছিল হাসিনার মসনদ
জুলাই-আগস্টে এক একটি ক্ষুরধার স্লোগানে খণ্ড-বিখণ্ড হয়েছিল ফ্যাসিবাদ হাসিনার মসনদ। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

জুলাইয়ের ১ থেকে ৩৬ শত সহস্র স্লোগানে কেঁপেছে রাজপথ। শব্দের শক্তি রক্তে তোলে ঝড় প্লাবন ওঠে স্বৈরাচার পতন আন্দোলনে। জুলাই-আগস্টে এক একটি ক্ষুরধার স্লোগানে খণ্ড-বিখণ্ড হয়েছিল ফ্যাসিবাদ হাসিনার মসনদ। জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান শুধু রাজপথের সংঘর্ষ, মিছিল কিংবা ব্যারিকেডের ইতিহাস নয়; এটি শব্দেরও এক অনন্য ইতিহাস। একের পর এক স্লোগানে মুখর হয়েছিল দেশের শহর-বন্দর, বিশ্ববিদ্যালয়, অলিগলি আর মহাসড়ক। সেই স্লোগান কখনো প্রতিবাদ, কখনো শোক, কখনো ব্যঙ্গ, আবার কখনো অদম্য প্রতিরোধের ভাষা হয়ে উঠেছিল।

একটি স্লোগান মুহূর্তেই হাজারো কণ্ঠে ছড়িয়ে পড়েছে, মিছিল থেকে মিছিলে, ক্যাম্পাস থেকে রাজপথে। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে শব্দই ছিল সবচেয়ে বড় সংগঠক- যে শব্দ ভয় ভেঙেছে, মানুষকে এক করেছে এবং শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছে।

আন্দোলনের শুরুতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের দাবি ছিল কোটা সংস্কার। কিন্তু দমন-পীড়ন, প্রাণহানি ও গ্রেফতার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্লোগানের ভাষাও বদলে যায়। দাবি থেকে প্রতিবাদ, প্রতিবাদ থেকে প্রতিরোধ-এই রূপান্তরের পথচলা স্পষ্ট হয়ে ওঠে রাজপথের প্রতিটি মিছিলে।

image

এই স্লোগানটি আন্দোলনের সবচেয়ে আলোচিত প্রতীক হয়ে ওঠে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় শিক্ষার্থীরা ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে এটি উচ্চারণ করেন। পরে এর জবাবে শোনা যায়-‘কে বলেছে, কে বলেছে? স্বৈরাচার, স্বৈরাচার।’ রাষ্ট্রীয় ভাষ্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং ক্ষমতার প্রতি সরাসরি প্রশ্ন ছুড়ে দেওয়ার প্রতীক হয়ে ওঠে এই স্লোগান।

এই দেশ আমার দেশ, বাংলাদেশ বাংলাদেশ
- দেশ কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়; রাষ্ট্রের মালিক জনগণ-এই বার্তাই বহন করে স্লোগানটি।

রাজধানীতে রিকশাচালকদের মিছিলেও এই স্লোগান ধ্বনিত হয়। আন্দোলন যে কেবল শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণও বাড়ছিল- এটি তার একটি প্রতীক। দমন-পীড়নের মুখেও আন্দোলনকারীদের অটল অবস্থানের প্রকাশ ছিল এই স্লোগানে।

image

আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যরা যখন ছাত্রসমাজের ন্যায্য আন্দোলন দমাতে পাখির মতো গুলি করে মারতে শুরু করল, ঠিক তখনই এই স্লোগানটি সাহসের বাতিঘর হিসেবে হৃদয়ে ঝড় তোলে।

স্লোগানটিতে অনেকের কাছে শহীদ আবু সাঈদের আত্মত্যাগের প্রতীক হয়ে ওঠে।

মিছিলে বারবার ফিরে এসেছে এই স্লোগান। সমঝোতার বদলে ন্যায়ের দাবিতে অবিচল থাকার আহ্বান এবং জনতার রাজপথকেই আন্দোলনের কেন্দ্র হিসেবে তুলে ধরা।

‘লেগেছে রে লেগেছে, রক্তে আগুন লেগেছে; জেগেছে রে জেগেছে, ছাত্রসমাজ জেগেছে’-বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজকেন্দ্রিক মিছিলগুলোতে এটি ছিল অন্যতম জনপ্রিয় স্লোগান। ক্ষোভ ও আত্মত্যাগ আন্দোলনকে আরও বিস্তৃত করেছে-এই স্লোগানটি।

‘ঝড়-বৃষ্টি, আঁধার রাতে; আমরা আছি রাজপথে’- দিন-রাত টানা কর্মসূচির সময় এই স্লোগান ছিল আন্দোলনকারীদের মুখে। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও আন্দোলন থেকে সরে না যাওয়ার অঙ্গীকার।

image

‘দফা এক, দাবি এক - কোটা নট কামব্যাক’-  কোটা ব্যবস্থা পুনর্বহালের বিরোধিতায় এ স্লোগান ছড়িয়ে পড়ে। বৈষম্যবিরোধী একক দাবিকে স্পষ্ট ও সংক্ষিপ্তভাবে তুলে ধরা।

‘বায়ান্নর বাংলায় বৈষম্যের ঠাঁই নাই, একাত্তরের বাংলায় বৈষম্যের ঠাঁই নাই’- ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে সমসাময়িক আন্দোলনের সংযোগ টেনে আনা হয় এই স্লোগানে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রচিন্তার সঙ্গে বৈষম্যবিরোধী অবস্থানকে একসূত্রে গেঁথে দেওয়া।

‘কোটা প্রথার কবর দে, সারা বাংলায় খবর দে’-কোটা সংস্কার আন্দোলনের প্রথম দিকের বহুল ব্যবহৃত স্লোগান। বৈষম্যমূলক শাসন ব্যবস্থার অবসানের আহ্বান।

‘লাখো শহীদের রক্তে কেনা, দেশটা কারও বাপের না’- এই স্লোগান দ্রুতই জনতার মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে। স্বাধীন বাংলাদেশ জনগণের। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর একচ্ছত্র মালিকানা নেই।

image

‘লাশের হিসাব কে দেবে, কোন কোটায় দাফন হবে? তোর কোটা তুই নে, আমার ভাইদের ফিরিয়ে দে’- প্রাণহানির পর আন্দোলনের আবেগী ও শোকাহত চিত্র ফুটে ওঠে এই স্লোগানে। নিহতদের জন্য বিচার ও জবাবদিহির দাবি জানানো হয় এই স্লোগানের মাধ্যমে।

‘লড়াই, লড়াই, লড়াই চাই; লড়াই করেই বাঁচতে চাই’-‘আমার ভাই কবরে, খুনি কেন বাইরে?’- নিহতদের স্মরণে এই স্লোগানগুলো ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। বিচারহীনতার বিরুদ্ধে ক্ষোভ এবং ন্যায়বিচারের দাবি ছিল স্লোগানটিতে।

‘এক, দুই, তিন, চার-শেখ হাসিনা গদি ছাড়’- আন্দোলনের শেষ পর্যায়ে মিছিলে এটি বহুল উচ্চারিত হয়।

‘লাশের ভেতর জীবন দে, নইলে গদি ছেড়ে দে’-প্রাণহানির ঘটনার পর ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ছিল এই স্লোগান। নিহতদের রক্তের দায় এড়ানো যাবে না-এই বার্তা তুলে ধরা।

‘সামনে আসছে ফাগুন, আমরা হব দ্বিগুণ’-আন্দোলনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার প্রত্যয় প্রকাশ পায় এতে। দমন নয়, প্রতিরোধ আরও বিস্তৃত হবে-এই আশাবাদ।

‘ছি, ছি, ছি হাসিনা, লজ্জায় বাঁচি না’

‘আবু সাঈদ, মুগ্ধ-শেষ হয়নি যুদ্ধ’

image

আবু সাঈদসহ নিহতদের স্মরণে এসব স্লোগান ছড়িয়ে পড়ে। আত্মত্যাগকে সংগ্রামের অনুপ্রেরণায় রূপ দেওয়ার চেষ্টা।

‘কে এসেছে? কে এসেছে? পুলিশ এসেছে। কী করছে? কী করছে? স্বৈরাচারের পা চাটছে’

পুলিশের ভূমিকার সমালোচনায় এই স্লোগান ব্যবহৃত হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষতা নিয়ে আন্দোলনকারীদের অসন্তোষের প্রকাশ।

‘বন্দুকের নলের সামনে সংলাপ হয় না’-এটি মূলত আন্দোলনের শেষ পর্যায়ে বহুল উদ্ধৃত একটি রাজনৈতিক বক্তব্যে পরিণত হয়। সহিংসতা ও দমন-পীড়নের পরিবেশে অর্থবহ সংলাপ সম্ভব নয়-এই অবস্থান তুলে ধরা।

জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে এসব স্লোগান কেবল মিছিলের ছন্দ ছিল না; এগুলো হয়ে উঠেছিল সময়ের ভাষ্য। কোথাও প্রতিবাদ, কোথাও শোক, কোথাও বিদ্রূপ, আবার কোথাও প্রতিরোধের অঙ্গীকার-প্রতিটি স্লোগান আন্দোলনের একেকটি অধ্যায় বহন করেছে। বাংলাদেশের গণআন্দোলনের ধারাবাহিকতায় জুলাইয়ের এই স্লোগানগুলো ভবিষ্যতেও রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত হবে।

এমআই

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger

টাইমলাইন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর