বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

রক্তে লেখা ৫ আগস্ট: উত্তরায় গুলির মুখেও হাজারো মানুষের বিজয়যাত্রা

মোস্তফা ইমরুল কায়েস
প্রকাশিত: ০৫ আগস্ট ২০২৬, ১২:২৫ এএম

শেয়ার করুন:

রক্তে লেখা ৫ আগস্ট: উত্তরায় গুলির মুখেও হাজারো মানুষের বিজয়যাত্রা

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। শেখ হাসিনার দেশত্যাগের খবরে যখন বিজয়ের উল্লাসে ফেটে পড়েছিল রাজধানীর উত্তরা, তখনই সেই আনন্দ মুহূর্তেই রূপ নেয় রক্তাক্ত ট্র্যাজেডিতে। হাউজ বিল্ডিং, রাজলক্ষ্মী, জসিমউদ্দিন, আজমপুর থেকে উত্তরা পূর্ব থানা—রাজপথজুড়ে শুরু হয় সংঘর্ষ, গুলিবর্ষণ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, পুলিশ ও র‍্যাবের গুলিতে বহু মানুষ হতাহত হন। দিনশেষে উত্তরায় প্রাণ হারান ২৮ জন। জুলাইয়ের শুরু থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত এলাকাটিতে নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় ৯২ জনে। বিজয়ের প্রত্যাশায় রাজপথে নামা মানুষের কাছে দিনটি পরিণত হয় বেদনাবিধুর স্মৃতির এক নির্মম অধ্যায়ে।

যেভাবে রণক্ষেত্রে পরিণত হয় উত্তরা

চব্বিশ সালের ৫ আগস্টে দিনটি অন্যান্য দিনের মতোই শুরু হলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে উত্তরা। ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ঘিরে সকাল থেকেই হাজারো ছাত্র-জনতা হাউজ বিল্ডিং, রাজলক্ষ্মী, জসিমউদ্দিন, আজমপুর, জামজাম টাওয়ারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করতে থাকে। দুপুরের দিকে আন্দোলনের তীব্রতা আরও বাড়তে থাকে।

বেলা দুইটার পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে বিজয় মিছিল নিয়ে ঢাকার রাজপথে নেমে আসেন লাখ লাখ মানুষ। উত্তরার সড়কও মুহূর্তের মধ্যে লোকারণ্য হয়ে যায়। তবে সেই উল্লাস বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। উত্তরার বিভিন্ন স্থানে পুলিশ ও র‍্যাব আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ারশেল ও গুলি ছোড়ে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান।

বিকেলের দিকে উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে উত্তরা পূর্ব থানা ও র‍্যাব কার্যালয় সংলগ্ন এলাকা। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিকেল চারটার পর পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি ঘটে। থানা ঘিরে বিক্ষোভ চলাকালে আন্দোলনকারীদের একটি অংশ ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করলে পুলিশ টিয়ারশেল, রাবার বুলেট ও গুলি ছোড়ে। পরে র‍্যাব সদস্যরাও ঘটনাস্থলে যোগ দেন। বিকেল পৌনে পাঁচটার দিকে সংঘর্ষ আরও তীব্র আকার ধারণ করে। গুলিবর্ষণ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া এবং ব্যাপক সহিংসতায় বহু মানুষ আহত হন, আর সেদিন উত্তরায় প্রাণ হারান ২৮ জন। জুলাইয়ের শুরু থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত এলাকাটিতে নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় ৯২ জন।

শেখ হাসিনার দেশত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর হাজারো মানুষ গণভবনের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করলেও পথে একাধিক স্থানে বাধার মুখে পড়েন।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, পুলিশ ও র‍্যাবের গুলির মধ্যেও আন্দোলনকারীরা পিছু হটেননি; বরং প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। পরে সেনাবাহিনীর সদস্যরা কয়েকটি স্থানে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন এবং অনেককে সামনে এগিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দেন। তবে সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় অনেকে মাঝপথ থেকেই ফিরে যান।

বিক্ষোভে অংশ নেওয়া জুলাই যোদ্ধা সাব্বির আজাদ বলেন, শেখ হাসিনার দেশত্যাগের খবরের পর আন্দোলনকারীরা উত্তরা পূর্ব থানার সামনে গিয়ে বিক্ষোভ করেন। তখন থানার ভেতর থেকে পুলিশ সদস্যরা বেরিয়ে এসে অতর্কিত গুলি ছোড়ে। এতে কয়েকজন নিহত ও অনেকে আহত হলে বিক্ষোভকারীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে তারা থানা ঘেরাও করেন এবং অগ্নিসংযোগ করেন। মূলত নিরস্ত্র মানুষের ওপর গুলি চালানোর ঘটনাই পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যায়।

uttoraআরেক প্রত্যক্ষদর্শী নাঈম জমাদ্দার বলেন, সেদিন সেনাবাহিনী আন্দোলনকারীদের জন্য সেফগার্ডের ভূমিকা পালন করেছিল।

তার মতে, সেনাসদস্যদের উপস্থিতির কারণেই অনেক মানুষ উত্তরা থেকে গণভবনের অভিমুখে যেতে পেরেছিলেন। অন্যথায় প্রাণহানি আরও বাড়তো।।

সেদিনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে রাজউক কলেজ শিক্ষক মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘সেদিন দুপুরে উত্তরা থেকে মিছিল নিয়ে এয়ারপোর্ট যাওয়ার আগে দুইটা ব্যারিকেডের মধ্যে পড়তে হয়েছিল। একটা ছিল আজমপুর আরেকটা জসিমউদ্দিন রোডে। প্রথম ব্যারিকেড সহজে আমরা ভেঙে ফেলি। পুলিশও বাধা দেয়নি তখন। এরপর দ্বিতীয় ব্যারিকেডটাও সহজে ভাঙতে সক্ষম হই। যখন মিছিল নিয়ে বিমানবন্দর সড়ক হয়ে খিলক্ষেতের দিকে এগোচ্ছিলেন তখন পেছনে লাখ লাখ মানুষ। পথে আরও কয়েকটি ব্যারিকেড পেছনে ফেলেন তারা। সামনে দেখেন পুলিশ, বিজিবিসহ বিভিন্ন বাহিনী গুলি আর গুলি করছে। 

‘আমি দেখছিলাম গুলি আর গুলি। কত হাজার গুলি করছিল তা বলে শেষ করা যাবে না।’

সন্ধ্যা গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে উত্তরা পূর্ব থানাকে ঘিরে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সংঘর্ষ চলাকালে একটি সাঁজোয়া যান (এপিসি) ও আশপাশের কয়েকটি স্থাপনায় আগুন লাগানো হয়। পরে বিক্ষুব্ধ জনতা থানায় অগ্নিসংযোগ করে। সংঘর্ষে গুলি চালানো কয়েকজন পুলিশ সদস্য জনতার হামলার শিকার হন এবং তাদের মধ্যে ১০ জন নিহত হন। সন্ধ্যার দিকে সেনাবাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছে থানার ভেতরে আটকে পড়া পুলিশ সদস্যদের উদ্ধার করে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালায়।

গুলিতে আহতদের দ্রুত উত্তরার বিভিন্ন হাসপাতালে নেওয়া হয়। বিশেষ করে কুয়েকমৈত্রী হাসপাতালে শত শত মানুষ আহত হয়ে চিকিৎসার জন্য আসতে থাকেন। বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত হাসপাতালগুলোতে আহত মানুষের ঢল নামে। চিকিৎসক ও স্বজনদের ব্যস্ততা, অ্যাম্বুলেন্সের অবিরাম যাতায়াত এবং স্বজনহারাদের আহাজারিতে পুরো এলাকা ভারী হয়ে ওঠে। রাত পর্যন্ত উত্তরার বিভিন্ন এলাকায় উত্তেজনা, বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ ও নিরাপত্তাহীনতার পরিবেশ বিরাজ করে।

৫ আগস্টের সেই রক্তাক্ত দিন শুধু উত্তরার নয়, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসেরও এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে উত্তরার রাজপথ ও অলিগলি স্বৈরাচার পতনের এক নির্মম ও ঐতিহাসিক সাক্ষী হয়ে আছে।

এমআইকে/এমআর

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger

টাইমলাইন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর