বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

মোস্তফা শাকিলের স্মৃতিতে আজও তাজা গুলিবিদ্ধ হওয়ার দুঃসহ স্মৃতি

সুমন চন্দ্র, দিনাজপুর
প্রকাশিত: ০৫ আগস্ট ২০২৬, ০৩:০৮ পিএম

শেয়ার করুন:

মোস্তফা শাকিলের স্মৃতিতে আজও তাজা গুলিবিদ্ধ হওয়ার দুঃসহ স্মৃতি
জুলাইযোদ্ধা মোস্তফা শাকিল। ছবি: সংগৃহীত

জুলাই শুধু একটি মাস নয়; বাংলাদেশের অনেক মানুষের কাছে এটি সাহস, ত্যাগ, রক্ত আর সংগ্রামের এক অনন্য অধ্যায়। সেই অধ্যায়ের একজন জীবন্ত সাক্ষী দিনাজপুর সদর উপজেলার কাশিমপুর এলাকার বাসিন্দা মোস্তফা শাকিল। বর্তমানে তিনি সিটি ইউনিভার্সিটির মেকানিক্যাল ইঞ্জিয়ারিং বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র আন্দোলনে ঢাকায় অবস্থান করে তিনি সরাসরি অংশ নিয়েছিলেন। সেই আন্দোলনের স্মৃতি আজও তাঁর শরীরে গুলির ক্ষতচিহ্ন হয়ে বহমান।

মোস্তফা শাকিল ঢাকা মেইলকে বলেন, শুরুতে আমি অন্যান্য শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনে যুক্ত হই। কিন্তু সময়ের সঙ্গে আন্দোলনের পরিধি বাড়তে থাকলে বৈষম্যহীন ও কোটামুক্ত একটি দেশ গড়ার প্রত্যয়ে আমি আরও সক্রিয়ভাবে রাজপথে নেমে যাই।

এই শিক্ষার্থী বলেন, ৪ জুলাই ২০২৪ রাজু ভাস্কর্যের সামনে প্রথম আন্দোলনে অংশ নিই। সেদিনই মনে হয়েছিল, বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে হলে রাজপথেই থাকতে হবে।

তিনি আরও বলেন, আন্দোলনের দিনগুলোর মধ্যে ৪ ও ৫ আগস্ট ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ। ৪ আগস্ট নিজের চোখের সামনে বহু সহযোদ্ধাকে গুলিবিদ্ধ হতে দেখেছি। কেউ কেউ সেখানেই প্রাণ হারিয়েছেন। সেই রক্তাক্ত দৃশ্য আজও আমাকে তাড়া করে ফেরে।

মোস্তফা শাকিল বলেন, আন্দোলনের একপর্যায়ে ছাত্রলীগের একটি ব্যানার অপসারণকে কেন্দ্র করে ১০ থেকে ১৫ জন আমাকে ঘিরে ধরে মারধর করে। আমাকে এলোপাতাড়ি পিটিয়ে জার্সি ছিঁড়ে ফেলা হয় এবং শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়।

তিনি বলেন, শুধু আন্দোলনে অংশ নেওয়াই নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিএনপি ও বেগম খালেদা জিয়াকে নিয়ে লেখালেখির কারণেও আমাকে নিয়মিত গালিগালাজ, ভয়ভীতি ও নানা ধরনের হুমকির মুখে পড়তে হয়েছে। একপর্যায়ে আমাকে একা পেয়ে আবারও মারধর করা হয়। এমনকি আমার বাবা ও বোনের স্বামীকেও হামলার হুমকি দেয়। তবে ভয় কিংবা নির্যাতন আমাকে আন্দোলন থেকে সরিয়ে দিতে পারেনি। গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও শিক্ষার্থীদের ন্যায্য অধিকারের দাবিতে আমি শেষ পর্যন্ত রাজপথেই ছিলাম।

Dinajpur-1

৫ আগস্টের ভয়াল দিনের স্মৃতি বর্ণনা করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন মোস্তফা শাকিল। তিনি বলেন, চারদিকে শুধু গুলির শব্দ, মানুষের দৌড়, চিৎকার আর আতঙ্ক। আশুলিয়া থানার সামনে তখন ব্যাপক গোলাগুলি চলছিল। সেই সময় আমিও গুলিবিদ্ধ হই।

তিনি আরও বলেন, গুলিবিদ্ধ হওয়ার সেই মুহূর্তটি আজও আমার কাছে দুঃস্বপ্নের মতো। গুলিটি আমার কোমর দিয়ে ঢুকে পেট দিয়ে বেরিয়ে যায়। মনে হচ্ছিল শরীরের সব রক্ত যেন বেরিয়ে যাচ্ছে। আশপাশে সাহায্য করার মতো কেউ ছিল না। পরে সহযোদ্ধারাই দলবদ্ধভাবে আমাকে হাসপাতালে নিয়ে যান। তাদের কারণেই আজ আমি বেঁচে আছি।

শাকিল বলেন, শরীরের ক্ষত হয়তো একদিন পুরোপুরি সেরে উঠবে, কিন্তু সেই দিনের স্মৃতি কোনোদিন মুছে যাবে না। আমার কাছে ৫ আগস্ট শুধু একটি তারিখ নয়, বরং জীবনের এমন এক দিন, যা প্রতিটি মুহূর্তে আমাকে সাহস, ত্যাগ ও সহযোদ্ধাদের মানবিকতার কথা মনে করিয়ে দেয়।

জুলাই দিবস উপলক্ষে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে মোস্তফা শাকিল বলেন, যারা আহত হয়েছেন, যারা জীবন দিয়েছেন এবং যারা আন্দোলনের কঠিন দিনগুলোতে একে অপরের পাশে দাঁড়িয়েছেন তাদের ত্যাগ ও সাহস ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। আমি চাই, দেশ সবসময় ন্যায়, সাম্য ও মানবিক মূল্যবোধের পথে এগিয়ে যাক।

প্রতিনিধি/জেবি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger

টাইমলাইন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর