২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তনের আন্দোলন ছিল না, অনেকের কাছে তা ছিল মর্যাদা, বাকস্বাধীনতা এবং মানবিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লড়াই। একজন চিকিৎসক হিসেবে আহত আন্দোলনকারীদের চিকিৎসাসেবা দেওয়া এবং একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে রাজপথে নেমে আন্দোলনে অংশ নেওয়া—এই দুই অভিজ্ঞতাই একসঙ্গে বহন করছেন নিউরোলজিস্ট ও ন্যাশনাল হেলথ এলায়েন্সের (এনএইচএ) মুখ্য সমন্বয়ক ডা. হুমায়ুন কবীর হিমু।
তার ভাষায়, শেখ হাসিনার সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে একটি অধ্যায়ের অবসান হলেও জুলাইয়ের যে স্বপ্ন ছিল, তা এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতিচারণ, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতা ঢাকা মেইলের কাছে তুলে ধরেন ডা. হুমায়ুন কবীর হিমু। তিনি বলেন, জুলাইয়ের আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য ছিল এমন একটি সমাজ গড়ে তোলা, যেখানে সবাই সমান মর্যাদা নিয়ে বাঁচতে পারবে। তার দাবি, দীর্ঘ সময় ধরে দেশে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, যেখানে ক্ষমতাসীনদের বাইরে সাধারণ মানুষ নিজেদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক মনে করতেন।
বিশিষ্ট এই চিকিৎসক বলেন, ‘মানুষের বাকস্বাধীনতা ছিল না, প্রতিবাদ করলেই গুম, গ্রেফতার কিংবা হত্যার ভয় কাজ করত। ফলে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ থাকলেও তা প্রকাশের সুযোগ ছিল না। কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে যখন দেশজুড়ে বিক্ষোভ শুরু হয়, তখন সেই জমে থাকা ক্ষোভ বিস্ফোরিত হওয়ার সুযোগ পায়।’ বিশেষ করে ১৬ জুলাই আবু সাঈদ নিহত হওয়ার ঘটনাকে তিনি আন্দোলনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া মুহূর্ত হিসেবে দেখেন।
হুমায়ুন কবীর হিমুর ভাষায়, ‘আবু সাঈদের ভিডিওটা কয়েকবার দেখেছি। নিজেকে ধরে রাখতে পারিনি। বাসায় বসেই কেঁদে ফেলেছিলাম। আমার স্ত্রী জানতে চেয়েছিল কী হয়েছে। আমি শুধু বলেছিলাম, এভাবে আর সহ্য করা যায় না। মনে হয়েছিল, আমাদেরও কিছু করা উচিত।’
তিনি জানান, সেই সময় তাঁর স্ত্রীও আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার দৃশ্য দেখে ভেঙে পড়েছিলেন। প্রতিদিন নামাজের পর আন্দোলনরত শিক্ষার্থী ও তরুণদের জন্য বিশেষভাবে দোয়া করতেন তারা।
আন্দোলনের উত্তপ্ত দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘রাজধানীর মিরপুর ১০ নম্বর এলাকায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে ছিলাম। সেদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত রাজপথেই অবস্থান করেছি। পুলিশের গুলি, টিয়ারশেল আর ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার মধ্যেও শিক্ষার্থীদের সাহস আমাকে মুগ্ধ করেছিল।’
ডা. হিমু বলেন, ‘আমি ওদের মতো সাহসী ছিলাম না। সামনে না গিয়ে পেছনেই থাকতাম। কিন্তু ছেলেমেয়েগুলো যেভাবে সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছে, ইট-পাটকেল ছুড়ে পুলিশকে পিছু হটিয়েছে, সেই সাহসকে আমি আজও স্যালুট করি।’
শুধু আন্দোলনে অংশ নেওয়াই নয়, আহতদের প্রাথমিক চিকিৎসাও দিয়েছেন তিনি। সঙ্গে ছিল মলম, ব্যান্ডেজ ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রী। অন্য কয়েকজন চিকিৎসক ও মেডিকেল শিক্ষার্থীর সঙ্গে মিলে আহতদের সেবা দিয়েছেন এই নিউরোলজিস্ট।
তিনি জানান, সেদিন অনেকেই গুলিবিদ্ধ হন। কারও চোখে গুলি লাগে, কারও শরীরে ছররা গুলি বিদ্ধ হয়। এক তরুণের চোখের পাশে গুলি লেগে রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। তাকে দ্রুত হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন তারা।
আন্দোলনের সময় এবং পরবর্তী দিনগুলোতে তার চেম্বারেও বহু আহত শিক্ষার্থী চিকিৎসা নিতে এসেছেন। তিনি বলেন, ‘ছাত্রলীগের হামলায় আহত কয়েকজন তরুণের শরীরে নির্যাতনের স্পষ্ট চিহ্ন ছিল। একজনকে এতটাই মারধর করা হয়েছিল যে, পুরো শরীরে লালচে ক্ষতের দাগ হয়ে যায়। আরেকজনের গাল ঘেঁষে গুলি বেরিয়ে যাওয়ায় স্নায়ুর ক্ষতি হয়েছিল। নিরাপত্তার কারণে তারা মুখ ঢেকে চিকিৎসা নিতে আসতেন।’
ডা. হিমু বলেন, ‘অনেকের চিকিৎসার খরচ আমরা নিজেরাই দিয়েছি। প্রেসক্রিপশনে প্রকৃত ঘটনার বদলে লিখেছি, পড়ে গিয়ে আঘাত পেয়েছে—যাতে তারা কোনো ঝামেলায় না পড়ে।’
তিনি জানান, নিউরোসায়েন্স হাসপাতালের চিকিৎসকেরা, বিশেষ করে নিউরোসার্জারি ও অ্যানেস্থেসিয়া বিভাগের অনেক চিকিৎসক আহতদের চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। বিশেষ করে নিউরো সায়েন্সেস হাসপাতালের নিউরো সার্জন ডা. মাহফুজুর রহমানের কথা স্মরণ করেন তিনি।
রাজধানীর বড় বড় হাসপাতালগুলোতে রোগীদের চিকিৎসা প্রদানে বাধার ঘটনা ঘটলেও ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতাল ভিন্ন ছিল বলে জানান তিনি। এমনকি হাসপাতাল প্রশাসনও কোনো বাধা না দিয়ে সহযোগিতা করেছে বলে জানান এই জুলাই যোদ্ধা চিকিৎসক। তিনি বলেন, ‘দেশের সব হাসপাতালে এমন পরিবেশ ছিল না।’
জুলাই আন্দোলনের মূল্যায়ন করতে গিয়ে ডা. হিমু বলেন, তাদের লক্ষ্য শুধু সরকার পরিবর্তন ছিল না; লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রব্যবস্থার পরিবর্তন। ৫ আগস্টের পর মানুষ স্বাধীনতার অনুভূতি পেলেও জুলাইয়ের স্বপ্নের পূর্ণ বাস্তবায়ন এখনো হয়নি।
তবে এই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় অর্জন হিসেবে তিনি মানুষের ভয় কাটিয়ে ওঠাকে দেখেন। তিনি বলেন, আগে অন্যায় সহ্য করলেও মানুষ প্রতিবাদ করতে সাহস পেত না। জঙ্গি নাটকে তরুণদের হত্যা করা হলেও বাবারা তাদের সন্তানদের লাশও নেওয়ার সাহস করতেন না। কিন্তু এখন সাধারণ মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলছে। তরুণদের আত্মবিশ্বাস বেড়েছে এবং ভবিষ্যতে কোনো স্বৈরাচার বা ফ্যাসিবাদী শাসন প্রতিষ্ঠা করা সহজ হবে না।
ডা. হিমু মনে করেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে খাটো করার বা আন্দোলনকারীদের নিয়ে নেতিবাচক প্রচারণার চেষ্টা সফল হবে না। তিনি বলেন, ‘কিছু কথিত সংস্কৃতি কর্মী বা কালচারাল ফ্যাসিস্ট জুলাই আন্দোলনকে খাটো করার চেষ্টা করছে, খাটো করে কথা বলছে বা 'জঙ্গি' তকমা দিচ্ছে, তাদের এই অপচেষ্টা সাধারণ মানুষ মেনে নেবে না। কারণ দেশের প্রায় প্রতিটি পরিবার থেকে কেউ না কেউ এই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছে।’
এমএইচ/জেবি





















