সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

মাদক থেকে ফেরা না ফেরার গল্প

মো. মেহেদী হাসান হাসিব
প্রকাশিত: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:১৮ পিএম

শেয়ার করুন:

মাদক থেকে ফেরা না ফেরার গল্প
ফাইল ছবি

মাদকে সয়লাব গোটা দেশ। এই মাদকের নেশা মানুষকে নিজের পাশাপাশি পরিবার-পরিজন, শিক্ষা, কর্মজীবন—সবকিছু থেকেই বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। কেউ কেউ অবশ্য জীবনের কোনো এক পর্যায়ে উপলব্ধি করে অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসেন, তবে বেশিরভাগই রয়ে যান মাদকের অন্ধকার গলিতে।

মাদকের অন্ধকার জগৎ থেকে ফেরার গল্প যেমন আছে, তেমনি আছে না ফেরার নির্মম বাস্তবতাও। অর্পণ ও খালিদের গল্প যেন তারই দুই বিপরীত চিত্র। একজন ইচ্ছাশক্তি ও পরিবারের ভালোবাসায় মাদককে পেছনে ফেলে ফিরেছেন স্বাভাবিক জীবনে, অন্যজন পরিবারের হাজারো চেষ্টার পরও এখনো আটকে আছেন নেশার জালে।

মাদক থেকে নিজের চেষ্টায় ফিরে আসেন অর্পণ

সবে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিল অর্পণ। নতুন কয়েকজন বন্ধুও জুটে যায়। নিয়মিত ক্লাস করছেন। দিন ভালোই কাটছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষে একদিন বন্ধুরা পার্টি করবে বলে অর্পণকেও দাওয়াত দেয়। তিনিও একদিনের বিষয় ভেবে রাজি হয়ে যান। কিন্তু সেই একদিনের ঘোর কাটতে সময় লাগল প্রায় এক যুগ।

অর্পণের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করার পর চাকরিতে যোগ দিই। এরপর বিয়ে। তবে একদিন মাদক সেবন না করলে স্বাভাবিক থাকতে পারতাম না। তাই প্রতিদিনই চলতো মাদক সেবন। বিয়ের দুই বছরের মাথায় আমার কন্যাসন্তান হয়। এরপর একাধিকবার মাদক ছাড়ার চেষ্টা করেও পারিনি। 

তিনি জানান, এভাবে আমার মেয়ের বয়স হয়ে গেল পাঁচ বছর। তাকে স্কুলে ভর্তি করাব। একদিন মাদক সেবন করে বাসায় ফিরলে মেয়ে আমাকে বলে, ‘বাবা পচা জিনিস খেয়ে আর বাসায় আসবে না।’ ঠিক ওই সময় থেকেই মাদক ছেড়ে দিয়েছি। মূলত ইচ্ছাশক্তি এবং পরিবার পাশে থাকলে নিজে থেকেই মাদক ছাড়তে পারবেন।

অর্পণ বলেন, যখন মাদক ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম, প্রথম দুই-একদিন তেমন কোনো পার্থক্য বুঝতে পারিনি। ভেবেছিলাম, মাদক ছেড়ে দেওয়া তো অনেক সহজ। কিন্তু দিন যত এগিয়েছে, ততই বুঝতে পেরেছি পরিবর্তন। মেজাজ খিটখিটে থাকত সবসময়, সবাইকে সন্দেহের চোখে দেখা শুরু করেছিলাম। অফিসে সবার সঙ্গে এমন এমন আচরণ করে ফেলতাম, যে আচরণ একজন সুস্থ মানুষ করে না। তবে দিন যত এগিয়েছে, আস্তে আস্তে সব ঘোর কেটে গেছে। একপর্যায়ে আমি মাদকের থাবা থেকে পুরোপুরি বের হয়ে এসেছি।

পরিবারের হাজারো চেষ্টার পরও মাদক ছাড়তে পারেনি খালিদ

খালিদের বসবাস একটি জেলা শহরে। তিনি যখন ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী, তখন থেকেই এলাকার বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গ দিতে গিয়ে মাদকে জড়িয়ে পড়েন। এখন তিনি ঢাকা শহরের একটি কলেজে অনার্স তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। তবে মাদকের টাকা জোগাড় করার কারণে পড়াশোনা থেকে সরে এসেছেন। মাদক ছাড়া একদিনও চলে না তার। এমনভাবে মাদকাসক্ত হয়ে পড়েছেন যে, এখন পড়াশোনা বাদ দিয়ে কাজ করে মাদকের জন্য অর্থ জোগাড় করেন। নেই পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ।

খালিদ ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘আমি যখন ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র ছিলাম, তখন আমার পরিবার ঋণে জর্জরিত ছিল। আমাকে আমার মামার বাসায় রেখে পুরো পরিবার ঢাকায় চলে আসে। সে সময় মামা-মামি আমাকে পচা খাবারসহ আমার মামাতো ভাইয়ের কাপড় পর্যন্ত পরিষ্কার করিয়ে নিতেন। দিনের পর দিন এরকম চলতে থাকায় একসময় আমি মাদক সেবন শুরু করলাম। এভাবে দুই বছর পর জেএসসি পরীক্ষা দিয়ে মা-বাবার কাছে চলে এসেছিলাম।

তিনি বলেন, ঢাকায় আসার পর কিছুদিন ভালোই ছিলাম। কয়েকজন নতুন বন্ধু হয়েছিল, যারা সবাই মাদক থেকে দূরে থাকে। এরপর এসএসসি পরীক্ষা দিলাম। তবে রেজাল্ট খারাপ হওয়ায় ঢাকার কোনো কলেজে আমার ভর্তি হলো না। গ্রামে চলে গেলাম। তবে এবার আর মামার বাসায় উঠলাম না। হোস্টেলে উঠলাম, যা আমার জন্য কাল হয়ে দাঁড়াল।

খালিদ বলেন, হোস্টেলে ওঠার পর এলাকার কিছু বন্ধু-বান্ধব আমার এখানে আসা শুরু করল। আমি তখন কলেজে না গিয়ে সারাদিন বন্ধুদের সঙ্গে ইয়াবা সেবন করা শুরু করলাম। বছর শেষে মাকে বললাম, এ বছর পরীক্ষা দিতে পারব না। পড়া হয়নি। তবে মা বুঝে গেলেন। কারণ, এলাকার সবাই ফোন করে বলে দিয়েছিল, আমি নেশা করি। এরপর তারা আবার আমাকে ঢাকায় ফেরত নিয়ে গেলেন। তবে আমি আর বের হতে পারলাম না। ঢাকায় এসে খুঁজে বের করলাম, কোথায় ইয়াবা পাওয়া যায়। মা-বাবা দুজনই কাজের উদ্দেশে বের হলে আমি বাসায় বসেই ইয়াবা সেবন করতাম। এরপর আস্তে আস্তে সবাই আমাকে দূরে ঠেলে দেয়।

এই যুবক আরও বলেন, ভালো করার জন্য সেন্টারে পাঠিয়েছিল, ভালো হতে পারিনি। জেলে দিয়েছিল, তাও কাজ হয়নি। সবশেষে তিন চিল্লায় গিয়েছিলাম। এক চিল্লা দিয়েই পালিয়ে এসেছি, শুধু মাদকের জন্য। বুঝি, খারাপ; কিন্তু বের হতে পারি না। এভাবেই একদিন মরে যাবো, তাও জানি। কিন্তু মাদক থেকে কোনোদিন বের হতে পারব বলে মনে হয় না।

এমএইচএইচ/এএইচ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger

টাইমলাইন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর