একদিকে ভারতের সীমান্ত, অন্যদিকে পাঁচ জেলার সংযোগস্থল-ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ঝিনাইদহে মাদকের বিস্তার ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়েছে। জেলার মহেশপুর উপজেলার সঙ্গে ভারতের প্রায় ৭২ কিলোমিটার সীমান্ত থাকায় এ অঞ্চলে সক্রিয় রয়েছে মাদক ও চোরাকারবারি চক্র। সীমান্তপথে বিভিন্ন ধরনের মাদক ঢোকার পাশাপাশি জেলার সঙ্গে যশোর, মাগুরা, চুয়াডাঙ্গা, কুষ্টিয়া ও রাজবাড়ীর সরাসরি যোগাযোগ থাকায় এসব মাদক দ্রুত দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে।
গাঁজা, ইয়াবা ও ফেনসিডিলসহ নানা ধরনের মাদক এখন অনেকটা সহজলভ্য হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
মাদক নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়মিত অভিযান, মাদক উদ্ধার, মামলা ও কারবারিদের গ্রেফতার অব্যাহত থাকলেও পরিস্থিতির বড় কোনো পরিবর্তন হয়নি। সীমান্তের দুর্গম পথ, বিস্তৃত যোগাযোগব্যবস্থা এবং আন্তঃজেলা মাদক পরিবহনের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে কারবারিরা তাদের তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে।
তবে সম্প্রতি পুলিশের ডোপ টেস্ট কার্যক্রম চালু হওয়ায় মাদকসেবীদের শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনার ক্ষেত্রে নতুন গতি এসেছে। গত দুই সপ্তাহে ডোপ টেস্টের মাধ্যমে আগের তুলনায় বেশি মাদকসেবী পুলিশের জালে আটক হচ্ছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। ফলে একদিকে যেমন মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে, অন্যদিকে মাদকসেবীদের শনাক্তকরণেও জোর দেওয়া হচ্ছে।
অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মাদকবিরোধী অভিযান চললেও চক্রগুলো কৌশল বদলে সক্রিয় রয়েছে। কখনো ছোট ছোট চালানে, আবার কখনো বিভিন্ন পরিবহনের আড়ালে এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় মাদক পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে নিয়মিত কারবারিরা গ্রেফতার হলেও বড় বড় গডফাদাররা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ঝিনাইদহ জেলা পুলিশের তথ্যমতে, ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত জেলায় ১০ গ্রাম হেরোইন, ১৭ বোতল ফেনসিডিল, ১০ কেজি ২০৮ গ্রাম গাঁজা, ৬ হাজার ৬৫৬ পিস ইয়াবাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক উদ্ধার করা হয়েছে, যার আনুমানিক বাজারমূল্য ৪৩ লাখ ৩৭ হাজার ২৪৩ টাকা। এ সময় ৩০৪টি মামলা দায়ের করে ৪১৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
একই সময়ে র্যাব অভিযান চালিয়ে প্রায় ৮ কোটি ১৭ লাখ ৭ হাজার ৮০০ টাকার মাদক উদ্ধার করেছে। এ ঘটনায় ২২টি মামলায় ৩১ জনকে গ্রেফতার করা হয়। জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর ৬৯ লাখ ৪০ হাজার ৭০০ টাকার বিভিন্ন ধরনের মাদক উদ্ধার করে ২৩টি মামলায় ২৪ জনকে গ্রেফতার করেছে। এছাড়া বিজিবি ৩০ জুন পর্যন্ত ৪২ হাজার ৭০০ টাকার মাদক উদ্ধার করে ৫টি মামলায় ৬ জনকে আটক করেছে।
শৈলকুপা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) হুমায়ুন কবির মোল্লা ঢাকা মেইলকে বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে আমরা কঠোর অবস্থান নিয়েছি। কারবারিদের আটকের পাশাপাশি মাদকসেবীদের ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে শাস্তির আওতায় আনা হচ্ছে।
সীমান্তবর্তী মহেশপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মেহেদী হাসান ঢাকা মেইলকে বলেন, আমার দায়িত্বাধীন এলাকার অধিকাংশই ভারতীয় সীমান্তবর্তী গ্রাম। সেখানে বিজিবি প্রধান দায়িত্ব পালন করলেও পুলিশও বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে মাদকসহ কারবারিদের আটক করছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে ইয়াবা, গাঁজা, ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক সেবন করেন এমন ব্যক্তিদের মধ্যে ডোপ টেস্ট নিয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে চাকরি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজে জড়িত ব্যক্তিরা ডোপ টেস্টের বিষয়টি সামনে আসায় পুলিশের নজর এড়াতে অনেকেই চলাফেরায় সতর্কতা অবলম্বন করছেন।
পুলিশের তথ্যমতে, গত ১৪ জুলাই থেকে ১৯ আগস্ট পর্যন্ত ডোপ টেস্ট করে আদালতের মাধ্যমে ১৫৯ জন মাদকসেবীকে ১ থেকে ৬ মাস পর্যন্ত সাজা দেওয়া হয়েছে। মাদকসেবীদের মধ্যে ৮৭ জন ইয়াবা ও ৭২ জন গাঁজা সেবন করতো। এর মধ্যে সদর থানায় ৩০ জন, শৈলকুপা থানায় ৫৩ জন, কালীগঞ্জ থানায় ২৫ জন, কোটচাঁদপুর থানায় ১১ জন, হরিণাকুণ্ডু থানায় ১১ জন ও ডিবি পুলিশ ২৯ জনকে আটক করে ডোপ টেস্টের জন্য আদালতে সোপর্দ করে।
ঝিনাইদহের পুলিশ সুপার মিয়া মোহম্মদ আশিস বিন হাছান ঢাকা মেইলকে বলেন, এ জেলায় যোগদানের পর থেকেই মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছি। থানা পুলিশের পাশাপাশি পুলিশের একাধিক বিশেষ টিম নিয়মিত অভিযান চালিয়ে মাদক কারবারিদের আটক করছে।
এসপি বলেন, মাদকের ভয়াবহতা এতটাই বেশি যে, শুধু পুলিশি অভিযানের মাধ্যমে এটি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না। অনেক কারবারি আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে জামিনে বেরিয়ে যাচ্ছে। তাই বর্তমানে আটক ব্যক্তিদের ডোপ টেস্ট করানো হচ্ছে, যাতে তাদের বিরুদ্ধে আরও কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যায়। একই সঙ্গে বড় মাদক কারবারিদের শনাক্ত ও গ্রেফতারে গোয়েন্দা তৎপরতাও বাড়ানো হয়েছে।
জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক হাশেম আলী ঢাকা মেইলকে বলেন, মাদক কারবারের পাশাপাশি জেলায় মাদকসেবীর সংখ্যাও বেড়েছে। আমরা নিয়মিত অভিযান চালিয়ে কারবারি ও সেবীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করছি।
প্রতিনিধি/জেবি




















