বছরের পর বছর কষ্ট করে জমানো সঞ্চয়। ভবিষ্যতের নিরাপত্তার জন্য কেনা সঞ্চয়পত্র। স্ত্রীর গায়ে থাকা স্বর্ণালংকার। সন্তানের পড়াশোনা ও পরিবারের জরুরি প্রয়োজনের জন্য রাখা টাকা। একে একে সবই শেষ হয়ে যাচ্ছে মাদকের কারণে। কারও ক্ষেত্রে নেশার টাকা জোগাতেই সঞ্চয় ভাঙতে হচ্ছে, আবার কারও ক্ষেত্রে মাদকাসক্ত স্বজনকে চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে রাখতে গিয়ে শেষ হয়ে যাচ্ছে পরিবারের জমানো অর্থ। সঞ্চয় শেষ হলে শুরু হচ্ছে ধারদেনা। শেষ পর্যন্ত ঋণের বোঝাও উঠছে বাবা-মায়ের কাঁধে।
রাজধানীর বনশ্রীর রায়হান (ছদ্মনাম) নামের এক ব্যক্তির পরিবারের গল্প এরই একটি উদাহরণ। বিদেশে কাজ করে গড়ে তোলা সঞ্চয়পত্র থেকে কয়েক দফায় প্রায় ৫ থেকে ৮ লাখ টাকা খরচ হয়েছে বলে দাবি পরিবারের। বিক্রি হয়েছে দামি মোবাইলফোন ও স্ত্রীর স্বর্ণালংকার। পরিবারের প্রায় ৬ লাখ টাকাও তার পেছনে খরচ হয়েছে বলে স্বজনদের দাবি। পরিস্থিতি সামাল দিতে বাবাকে করতে হয়েছে প্রায় ৬ লাখ টাকা ঋণ। চিকিৎসা, পুনর্বাসন, নেশার খরচ এবং পারিবারিক সংকট সামলাতে গিয়ে পুরো পরিবারই ধীরে ধীরে আর্থিক চাপে পড়ে।
সঞ্চয়পত্র ভেঙে নেশার টাকা
রায়হান একসময় বিদেশে কাজ করতেন। কষ্টের উপার্জন থেকে ভবিষ্যতের কথা ভেবে টাকা জমিয়েছিলেন। পরিবারের প্রয়োজন ও সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য করা সেই সঞ্চয়ের একটি অংশ ছিল সঞ্চয়পত্রে।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, মাদকাসক্ত হওয়ার পর নেশার খরচ মেটাতে প্রথমে নিজের আয় ও সঞ্চয়ের টাকা ব্যবহার করতে থাকেন রায়হান। পরে সঞ্চয়পত্র ভাঙার পালা আসে। কয়েক দফায় সেখান থেকে প্রায় ৫ থেকে ৮ লাখ টাকা তোলা হয়েছে বলে দাবি পরিবারের।
এরপর বিক্রি করা হয় দামি মুঠোফোন। স্ত্রীর স্বর্ণালংকারও বিক্রি করা হয়েছে বলে স্বজনদের দাবি। ভবিষ্যতের নিরাপত্তার জন্য রাখা সম্পদগুলো এভাবেই ধীরে ধীরে চলে যায়।
নিজের সঞ্চয় ও সম্পদ শেষ হওয়ার পর পরিবারের কাছ থেকেও টাকা নিতে থাকেন তিনি।
পরিবারের সঞ্চয়েও চাপ
স্বজনদের দাবি, মাদকের টাকা জোগাড় করতে বাবা-মা ও স্ত্রীর কাছে নিয়মিত অর্থ চাইতেন রায়হান। টাকা দেওয়া না হলে পারিবারিক বিরোধ তৈরি হতো।
একপর্যায়ে পরিবারের প্রায় ৬ লাখ টাকা পর্যন্ত তার পেছনে খরচ হয়েছে বলে দাবি স্বজনদের। এসব অর্থের বড় অংশ মাদক কেনার কাজে ব্যবহৃত হয়েছে বলে পরিবারের অভিযোগ। তবে এসব লেনদেনের পূর্ণাঙ্গ নথি প্রতিবেদকের কাছে নেই।

মাদকের অর্থ জোগাতে গিয়ে পরিবারটির আর্থিক চাপের পাশাপাশি পারিবারিক সম্পর্কেও টানাপোড়েন তৈরি হয়। স্বজনদের অভিযোগ, টাকা নিয়ে বিরোধের সময় স্ত্রীকে শারীরিকভাবে আঘাত করার ঘটনাও ঘটেছে।
ছেলের কারণে বাবার ঋণ
পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে সবচেয়ে বড় চাপ পড়েছে রায়হানের বাবার ওপর। রায়হানের বাবার দাবি, ছেলের নেশা ও অন্যান্য খরচ সামলাতে তাকে প্রায় ৬ লাখ টাকা ঋণ করতে হয়েছে। অর্থাৎ সন্তানের নেশা ও তাকে স্বাভাবিক জীবনে ফেরানোর চেষ্টার আর্থিক দায়ও শেষ পর্যন্ত এসে পড়েছে পরিবারের ওপর।
একসময় যে বাবা সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করেছিলেন, সেই বাবাকেই এখন ঋণ পরিশোধের চিন্তা করতে হচ্ছে।
রায়হানকে স্বাভাবিক জীবনে ফেরাতে পরিবার কয়েকবার মাদক পুনর্বাসন কেন্দ্রে ভর্তি করেছে বলে জানিয়েছে।
পরিবারের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, কোনো কোনো সময়ে মাসে প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। চার মাসের একটি কোর্সের ফি ছিল প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা। খাবার ও অন্যান্য ব্যয় যুক্ত হলে একেক দফায় মোট খরচ ৬০-৭০ হাজার টাকা থেকে প্রায় ১ লাখ টাকা পর্যন্ত হয়েছে বলে পরিবারের দাবি।
কিন্তু পুনর্বাসনের পরও আবার মাদকে ফিরে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ফলে একদিকে নেশার পেছনে অর্থ যাচ্ছে, অন্যদিকে চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের খরচও বহন করতে হচ্ছে পরিবারকে।
রায়হানের গল্প কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। মাদকাসক্ত স্বজনকে চিকিৎসা ও পুনর্বাসনে রাখতে গিয়ে পরিবারের সঞ্চয় শেষ হওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে আরও অনেকের।
কোথাও সন্তানের নেশার খরচ মেটাতে মায়ের গয়না বিক্রি হয়েছে। কোথাও বাবার অবসরকালীন সঞ্চয় শেষ হয়েছে। আবার কোথাও মাদকাসক্ত স্বজনকে বারবার পুনর্বাসন কেন্দ্রে ভর্তি করাতে গিয়ে ধার করতে হয়েছে।
মাদকাসক্ত ব্যক্তির চিকিৎসা প্রয়োজন, কিন্তু সেই চিকিৎসার দীর্ঘমেয়াদি খরচ অনেক পরিবারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে বারবার নেশায় ফিরে গেলে একই পরিবারের ওপর চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যয় পুনরায় চাপতে থাকে।
রিহ্যাবের মাসিক খরচ কত?
রাজধানীর মিরপুরের একটি মাদক পুনর্বাসন কেন্দ্রের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল্লাহ আল আহাদ ঢাকা মেইলকে বলেন, তাদের কেন্দ্রে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ চিকিৎসা নিতে আসেন। তবে অপেক্ষাকৃত কম বয়সী ও কিশোর-তরুণদের সংখ্যাও রয়েছে বলে জানান তিনি।
আব্দুল্লাহ আল আহাদ বলেন, বর্তমানে তাদের কেন্দ্রে ৩৬ জন মাদকাসক্ত ব্যক্তি চিকিৎসা নিচ্ছেন। চার মাসের একটি প্যাকেজে মাসে প্রায় ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা খরচ হয়। এই খরচের মধ্যে থাকা-খাওয়া, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ, মানসিক চিকিৎসা ও অন্যান্য সেবার ব্যবস্থা রয়েছে বলে জানান তিনি।
আব্দুল্লাহ আল আহাদের দাবি, আগের তুলনায় মাদকাসক্তির সঙ্গে জড়িয়ে পড়া মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। তবে এ দাবির পক্ষে তার প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব রোগীর সংখ্যা ছাড়া কোনো স্বাধীন পরিসংখ্যান প্রতিবেদকের কাছে নেই।
রিহ্যাব কেন্দ্রভেদে খরচের পার্থক্যও বেশ বড়। ঢাকার একটি বেসরকারি পুনর্বাসন কেন্দ্র তাদের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী মাসিক ২০ হাজার, ৩০ হাজার ও ৪০ হাজার টাকার বিভিন্ন প্যাকেজ চালু রেখেছে। প্যাকেজভেদে কক্ষের ধরন ও ব্যক্তিগত কাউন্সেলিংয়ের মতো সেবায় পার্থক্য রয়েছে।
অন্যদিকে একটি বেসরকারি মানসিক ও মাদকাসক্তি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সাধারণ ওয়ার্ডে মাসিক ৪৫ হাজার টাকা, সেমি-কেবিনে ৬০ হাজার, নন-এসি কেবিনে ৯০ হাজার এবং এসি ডিলাক্স কেবিনে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে।
আরেকটি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি আবাসিক কর্মসূচিতে মাসিক ৪০ থেকে ৬০ হাজার টাকা এবং ১৭ দিনের নিবিড় কর্মসূচিতে মোট ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা খরচের কথা বলা হয়েছে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, আবাসিক চিকিৎসার মধ্যে থাকা-খাওয়া, চিকিৎসা তদারকি, মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ও বিভিন্ন ধরনের থেরাপি অন্তর্ভুক্ত থাকে। অর্থাৎ চিকিৎসার ধরন, কক্ষ, সেবার পরিধি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করে রিহ্যাবের খরচ মাসে কয়েক দশ হাজার টাকা থেকে এক লাখ টাকার বেশি পর্যন্ত হতে পারে।
একটি পরিবারের জন্য মাসে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা খরচও কম নয়। চার মাসে তা দাঁড়ায় ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। এর সঙ্গে যদি ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা বিশেষায়িত চিকিৎসার অতিরিক্ত খরচ থাকে, তাহলে মোট ব্যয় আরও বাড়তে পারে।
উচ্চ খরচের কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে চার মাসের আবাসিক চিকিৎসার ব্যয় কয়েক লাখ টাকায় পৌঁছাতে পারে। ফলে মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে চিকিৎসার আওতায় আনতে গিয়ে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
রিহ্যাব থেকে ফিরেও কেন আবার নেশায়?
পরিবারগুলোর অভিযোগের বড় একটি অংশ হলো, রিহ্যাব থেকে ফেরার পর আবার নেশায় ফিরে যাওয়া। ফলে একই ব্যক্তিকে একাধিকবার পুনর্বাসন কেন্দ্রে ভর্তি করাতে হয়।

তবে চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে মাদকাসক্তি একটি দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন প্রয়োজন এমন সমস্যা। শুধু একটি নির্দিষ্ট সময় আবাসিক কেন্দ্রে থাকাই সব ক্ষেত্রে যথেষ্ট নাও হতে পারে। চিকিৎসার পাশাপাশি পুনর্বাসন-পরবর্তী সহায়তা, কাউন্সেলিং এবং পরিবারের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
কিছু পুনর্বাসন কেন্দ্রও দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও পরবর্তী পর্যায়ের সহায়তার ওপর গুরুত্ব দেয়। যেমন একটি প্রতিষ্ঠানের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তাদের দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচিতে আবাসিক চিকিৎসার পাশাপাশি পরবর্তী পর্যায়ের সহায়তাও রাখা হয়েছে।
সঞ্চয় শেষ, সামনে ঋণ
মাদকাসক্তের পরিবারের গল্পে তাই শুধু মাদকের পেছনে কত টাকা খরচ হয়েছে, সেই হিসাব নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের খরচ, সম্পদ বিক্রির ক্ষতি এবং ঋণের দায়।
সঞ্চয়পত্র ভাঙা, গয়না বিক্রি, দামি মুঠোফোন বিক্রি, পরিবারের সঞ্চয় শেষ করা এবং শেষ পর্যন্ত বাবার ঋণ—একজন ব্যক্তির মাদকাসক্তি কীভাবে একটি পরিবারের আর্থিক কাঠামোকে নড়বড়ে করে দিতে পারে, তার একটি চিত্র এই ঘটনা।
সমাজে এমন আরও পরিবার রয়েছে, যারা একদিকে প্রিয়জনকে নেশামুক্ত করার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে সেই চিকিৎসার ব্যয় জোগাতে নিজেদের ভবিষ্যতের সঞ্চয় খরচ করছে।
মাদকাসক্ত স্বজনকে চিকিৎসা না করিয়ে উপায় নেই। আবার দীর্ঘদিন চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের খরচ বহন করাও অনেক পরিবারের জন্য কঠিন।
তাই প্রয়োজন শুধু পুনর্বাসন কেন্দ্রের সংখ্যা বাড়ানো নয়; চিকিৎসার মান, খরচের স্বচ্ছতা, প্রশিক্ষিত চিকিৎসাকর্মী, নিয়মিত কাউন্সেলিং এবং চিকিৎসা-পরবর্তী পুনর্বাসনের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া।
একজন মানুষকে নেশামুক্ত করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার লড়াই যেন আরেকটি পরিবারকে নিঃস্ব না করে, সেটিও ভাবতে হবে।
নেশা থেকে প্রিয় মানুষটিকে ফেরানোর চেষ্টা চলছে, কিন্তু সেই চেষ্টার মূল্য দিতে গিয়ে শেষ হয়েছে সঞ্চয়, বিক্রি হয়েছে সম্পদ, বেড়েছে ঋণ।
সেন্ট্রাল ড্রাগ এডিকশন ট্রিটমেন্ট সেন্টার (ঢাকা)-এর মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. রাহানুল ইসলাম ঢাকা মেইলকে বলেন, মাদকাসক্তির সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের মানসিক রোগের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। এসব রোগীর টেকসই সুস্থতা নিশ্চিত করতে চিকিৎসার পাশাপাশি পরিবারের সচেতনতা, মানসিক সমর্থন এবং ইতিবাচক পারিবারিক পরিবেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রিহ্যাবিলিটেশন বা চিকিৎসা শেষে রোগী বাড়ি ফেরার পর পরিবারের দায়িত্ব আরও বেড়ে যায় উল্লেখ করে তিনি বলেন, রিহ্যাব থেকে ফিরে আসা চিকিৎসার শেষ ধাপ নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি সুস্থতার পথে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নতুন পর্যায়। এ সময় পরিবারের সদস্যরা রোগীকে অতীতের ভুলের জন্য বারবার দোষারোপ, অপমান কিংবা অতিরিক্ত সন্দেহ করলে তার মানসিক চাপ বেড়ে যেতে পারে। এতে পুনরায় মাদক গ্রহণ বা ‘রিল্যাপস’-এর ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
এমআর/জেবি






















