- সন্ধ্যার পর মাঠ অনিরাপদ
- ৪৫% নারী আসক্ত ইয়াবায়
- মাদকে বাড়ছে অপরাধ
- মাদক আড্ডায় উদ্বেগ
- প্রতিদিন শতাধিক ভর্তি
শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার জন্য তৈরি খেলার মাঠ। বিকেল হলেই সেখানে ফুটবল, ক্রিকেট কিংবা অন্য খেলায় ব্যস্ত থাকার কথা তরুণদের। কিন্তু রাজধানীর কয়েকটি মাঠে সন্ধ্যা নামার পর বদলে যায় সেই চিত্র। মাঠের একাংশ ফাঁকা পড়ে থাকে, কোথাও খেলাধুলা বন্ধ থাকে, আবার কোথাও আলো-আঁধারির সুযোগে বসে তরুণদের আড্ডা। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব আড্ডার মধ্যে মাদক সেবনের ঘটনাও ঘটে। কোনো কোনো মাঠে মাদক কেনাবেচার অভিযোগও রয়েছে।
ফলে যে মাঠ শিশু-কিশোরদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জায়গা হওয়ার কথা, সেটি কোথাও কোথাও পরিণত হয়েছে অনিরাপদ স্থানে। দিনের বেলায় যেখানে খেলোয়াড়দের দেখা যায়, সন্ধ্যার পর সেখানে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। মাঠে খেলাধুলার কার্যক্রম কমে গেলে এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা দুর্বল থাকলে মাদকসেবীদের জন্য জায়গাগুলো আরও সহজ হয়ে ওঠে।
রাজধানীর মোহাম্মদপুর ও আশপাশের কয়েকটি মাঠকে ঘিরে এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বাবর রোড মাঠ, শ্যামলী পার্ক মাঠ, শ্যামলী ক্লাব মাঠ, তাজমহল রোড খেলার মাঠ, টাউন হল শহীদ পার্ক মাঠ, লালমাটিয়া ডি-ব্লক মাঠ, রায়েরবাজার বৈশাখী খেলার মাঠ ও লালমাটিয়া আড়ংয়ের মাঠের নাম মাদকসংক্রান্ত অভিযোগ পাওয়া যায়।
বিশেষ করে বাবর রোড মাঠ নিয়ে স্থানীয়দের অভিযোগ সবচেয়ে গুরুতর। মাঠটির আশপাশে বসবাসকারী কয়েকজনের অভিযোগ, সন্ধ্যার পর মাঠের নিরিবিলি অংশে তরুণদের জটলা দেখা যায়। তাদের কেউ দীর্ঘ সময় অবস্থান করে, আবার কেউ কিছুক্ষণ পরপর মাঠে আসে। স্থানীয়রা বলছেন, মাদক সেবনের কারণে সন্ধ্যার পর মাঠের পরিবেশ নিয়ে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে শ্যামলী পার্ক মাঠ নিয়েও। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, বিকেলের পর মাঠের আশপাশে তরুণদের আড্ডা বাড়তে থাকে। সন্ধ্যার পর মাঠের অন্ধকার অংশগুলোতে সাধারণ মানুষের চলাচল কমে যায়। তখন সেখানে বসে আড্ডা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
তাজমহল রোডের মাঠ নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, মাঠে নিয়মিত খেলাধুলার পরিবেশ নিশ্চিত না থাকলে সন্ধ্যার পর অন্যদের আড্ডার সুযোগ তৈরি হয়। এতে শিশু-কিশোরদের মাঠে খেলতে পাঠাতে অভিভাবকেরা অনিরাপত্তা বোধ করেন।
লালমাটিয়া ডি-ব্লক মাঠ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বাসিন্দারা বলছেন, মাঠের কোন অংশে নিয়মিত খেলা হয়, কখন মাঠ ফাঁকা থাকে, সন্ধ্যার পর সেখানে আলো কতটা থাকে এবং নিরাপত্তার ব্যবস্থা কী, এসব বিষয় সরেজমিনে যাচাই করা দরকার।
ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ রাতে মফিউদ্দিন রোডের তিন রাস্তার মোড় এবং বসিলা তিন রাস্তার মোড়ে মাদকবিরোধী ব্লক রেইড চালানো হয়। অভিযানে মাদক সেবনরত অবস্থায় ১৪ জনকে আটক করা হয়। এর মধ্যে মফিউদ্দিন রোডের তিন রাস্তার মোড় থেকে চারজন এবং বসিলা তিন রাস্তার মোড় থেকে ১০ জনকে আটক করা হয়। পরে তাদের আদালতে উপস্থাপন করা হলে সাজা দেওয়া হয়।
চলতি বছরের মার্চ ও মে মাসে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মাদকবিরোধী অভিযান চালায় শাহবাগ থানা পুলিশ। ডিএমপির সরকারি প্রকাশনা অনুযায়ী, মার্চে পরিচালিত মাদকবিরোধী অভিযানে মাদকসহ পাঁচজনকে গ্রেফতার করা হয়।
পরে ১৩ মে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ছদ্মবেশে মাদকবিরোধী অভিযান চালায় পুলিশ। এ সময় মাদকসেবী ও মাদক ব্যবসায়ীসহ সাতজনকে মাদকসহ গ্রেফতার করা হয়। ধারাবাহিক এসব অভিযানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মাদকসেবন ও মাদক কেনাবেচার বিরুদ্ধে পুলিশের তৎপরতার বিষয়টি উঠে আসে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে মাদকাসক্ত রোগীর সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। সরকারি ও বেসরকারি মাদকাসক্তি নিরাময়কেন্দ্রে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীর সংখ্যা বিশ্লেষণ করলে গত কয়েক বছরে মাদকাসক্তির বিস্তারের একটি চিত্র পাওয়া যায়। শুধু ২০২৫ সালে প্রতিদিন গড়ে শতাধিক মাদকাসক্ত রোগী বিভিন্ন নিরাময়কেন্দ্রে ভর্তি হয়েছেন।
অধিদফতরের তথ্যমতে, ২০১৭ সালে সরকারি ও বেসরকারি মাদকাসক্তি নিরাময়কেন্দ্রে প্রতিদিন গড়ে ৬৯ জন মাদকাসক্ত রোগী ভর্তি হন। এর পরের বছর অর্থাৎ ২০১৮ সালে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১০৪ জনে। আর পরবর্তী বছরে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১১৪ জন রোগী মাদকাসক্তি নিরাময়কেন্দ্রে চিকিৎসার জন্য ভর্তি হয়েছেন। অর্থাৎ কয়েক বছরের ব্যবধানে প্রতিদিন চিকিৎসা নিতে আসা মাদকাসক্ত রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
গত পাঁচ বছরের হিসাবেও মাদকাসক্তির ভয়াবহতার চিত্র উঠে এসেছে। ওই সময়ে দেশের পাঁচটি সরকারি মাদকাসক্তি নিরাময়কেন্দ্রে ৯০ হাজার ১৩৩ জন চিকিৎসা নিয়েছেন। একই সময়ে ৩২৪টি বেসরকারি মাদকাসক্তি নিরাময়কেন্দ্রে চিকিৎসা নিয়েছেন আরও ৫৩ হাজার ৭২০ জন। সব মিলিয়ে পাঁচ বছরে সরকারি ও বেসরকারি নিরাময়কেন্দ্রগুলোতে চিকিৎসা নিয়েছেন ১ লাখ ৪৩ হাজার ৮৫৩ জন মাদকাসক্ত রোগী।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, মাদকাসক্তির চিকিৎসা নিতে আসা রোগীর বড় একটি অংশ বেসরকারি নিরাময়কেন্দ্রের ওপর নির্ভরশীল। দেশের বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠা এসব কেন্দ্রে মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হয়। তবে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীর সংখ্যা শুধু মাদকাসক্তির বিস্তারের পুরো চিত্র তুলে ধরে না। কারণ অনেক মাদকাসক্ত ব্যক্তি চিকিৎসার আওতায় আসেন না। ফলে নিরাময়কেন্দ্রে চিকিৎসা নেওয়া রোগীর সংখ্যা প্রকৃত মাদকাসক্ত মানুষের সংখ্যার চেয়ে কম হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
মাদকাসক্তির ক্ষেত্রে নারী রোগীর সংখ্যাও উদ্বেগ তৈরি করছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, সরকারি মাদকাসক্তি নিরাময়কেন্দ্রে চিকিৎসা নেওয়া নারী রোগীর সংখ্যা এক বছরের ব্যবধানে প্রায় চার গুণ বেড়েছে। ২০১৮ সালে সরকারি মাদকাসক্তি নিরাময়কেন্দ্রে চিকিৎসা নিয়েছিলেন ৯১ জন নারী। পরের বছর জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সময়ে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৬০ জনে।
নারী রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধির এই তথ্যকে মাদকাসক্তির বিস্তারের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে মাদক গ্রহণের প্রবণতা শুধু তরুণ পুরুষদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে নারী ও বিভিন্ন বয়সী মানুষের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
আহছানিয়া মিশনের গত ছয় মাসের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চিকিৎসা নিতে আসা নারী মাদকাসক্তদের বড় একটি অংশই তরুণ। তাদের মধ্যে ৭৩ শতাংশের বয়স ১৪ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। ৩৬ থেকে ৪৫ বছর বয়সী নারী মাদকাসক্তের হার প্রায় ২৪ শতাংশ।
তথ্য অনুযায়ী, নারী মাদকসেবীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আসক্তি ইয়াবায়। চিকিৎসাধীন নারীদের প্রায় ৪৫ শতাংশ ইয়াবায় এবং ৪৩ শতাংশ গাঁজায় আসক্ত। এ ছাড়া প্রায় ৭ শতাংশ নারী অ্যালকোহলে আসক্ত।
চিকিৎসাধীন নারী মাদকাসক্তদের ৭৭ শতাংশই ঢাকায় বসবাস করেন। তাদের মধ্যে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং বেসরকারি চাকরিজীবী রয়েছেন। মাদকাসক্ত নারীদের মধ্যে এমবিবিএস ডিগ্রিধারী চিকিৎসক, গৃহিণী, ব্যবসায়ী ও বেকারও রয়েছেন।
ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মো. আকতার হোসেন বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। মাদকের সঙ্গে জড়িত কাউকেই কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না। মাদক নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান অব্যাহত থাকবে।
মানসিক ও মাদকাসক্তি রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. নাসির উদ্দিন আহমেদ ঢাকা মেইলকে বলেন, মাদকাসক্তি বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম সামাজিক সমস্যা। এর ফলে তরুণ সমাজ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পড়াশোনায় অমনোযোগ, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা, অপরাধপ্রবণতা ও কর্মক্ষমতা হ্রাস, সবকিছুই মাদকাসক্তির কারণে বাড়ছে। পরিবারে অশান্তি, অর্থনৈতিক ক্ষতি এবং সমাজে অপরাধের হারও দিন দিন বাড়ছে। শুধু ব্যক্তি নয়, মাদক পুরো সমাজকেই অস্থির ও অশান্ত করে তুলছে। তাই মাদকাসক্তি প্রতিরোধ এখন আমাদের সবার দায়িত্ব।
এই চিকিৎসক বলেন, মাদকাসক্ত সন্তানকে এই খারাপ বলয় থেকে ফিরিয়ে আনতে এর কারণ, লক্ষণ ও প্রতিরোধের উপায় সম্পর্কে জানতে হবে। মানসিক চাপ, হতাশা বা বিষণ্নতা, ভুল বন্ধু বা পরিবেশের প্রভাব, কৌতূহল বা আনন্দ খোঁজার প্রবণতা, পারিবারিক অশান্তি বা অবহেলা এবং সহজে মাদক পাওয়া মাদকাসক্তির অন্যতম কারণ। মাদকাসক্তির ক্ষেত্রে আচরণে পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। হঠাৎ রাগ, সন্দেহপ্রবণতা, পড়াশোনা বা কাজে অমনোযোগী হয়ে যাওয়া, শারীরিক দুর্বলতা, ক্ষুধামন্দা, ঘুম কমে যাওয়া, নতুন বন্ধু তৈরি করা, গোপনীয় আচরণ করা, চোখ লাল হয়ে যাওয়া বা শারীরিক পরিবর্তন মাদক গ্রহণের লক্ষণ হতে পারে।
নাসির উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘মাদকাসক্তি প্রতিরোধে পরিবারে খোলামেলা আলোচনা ও মানসিক সমর্থন জরুরি। সন্তান ও তরুণদের খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত রাখতে হবে এবং সঠিক বন্ধু ও পরিবেশে থাকতে উৎসাহ দিতে হবে। মানসিক চাপ বা হতাশা দেখা দিলে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। পাশাপাশি মাদকদ্রব্যের সহজলভ্যতা রোধে সামাজিক উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। মনে রাখতে হবে, সময়মতো সঠিক চিকিৎসা ও কাউন্সেলিং নিলে মাদকাসক্ত ব্যক্তি সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন।’
সম্প্রতি এক সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, মাদকাসক্তি একটি মারাত্মক মানসিক ও শারীরিক ব্যাধি। যারা এর ফাঁদে পড়েছেন, তারা সমাজ বা রাষ্ট্রের চোখে অপরাধী নন, বরং তারা রোগী। তাই তাদের সুস্থ ধারায় ফিরিয়ে আনতে বিভাগীয় পর্যায়ে ২০০ শয্যার সরকারি নিরাময় কেন্দ্র নির্মাণ করা হবে। মাদক কোনো একক দেশের বা একক সংস্থার পক্ষে দূর করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন সমন্বিত সামাজিক আন্দোলন।
মন্ত্রী বলেন, দেশের যুবসমাজ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষায় সমাজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অভিভাবক, শিক্ষক, ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ, সুশীল সমাজ এবং সকল স্বেচ্ছাসেবী ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে মাদকের বিরুদ্ধে সোচ্চার হবে। সরকার শুধু খুচরা বিক্রেতা বা বহনকারীদের ধরপাকড়েই সীমাবদ্ধ নয়, বরং মাদক ব্যবসার মূল হোতা, অর্থ জোগানদাতা বা গডফাদারদের আইনের আওতায় আনতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।
এএইচ/জেবি



















