ডেমরার এক মধ্যবিত্ত পরিবারের সব স্বপ্নের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন আব্দুল্লাহ (ছদ্মনাম)। তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে সবার বড় এই সন্তানকে ঘিরে বাবা-মায়ের প্রত্যাশাটাও ছিল একটু বেশি। তারা চেয়েছিলেন, ছেলে ভালো পড়াশোনা করবেন, নিজের পায়ে দাঁড়াবেন, একদিন পরিবারের হাল ধরবেন; ছোট ভাই-বোনদের হয়ে উঠবেন অভিভাবকের মতো।
কিন্তু যে ছেলেকে ঘিরে এত স্বপ্ন, কৈশোরেই সে হাঁটতে শুরু করে উল্টো পথে। পড়াশোনায় অনাগ্রহ থেকে পাড়ার বড় ভাইদের সঙ্গে আড্ডা, সিগারেট, এরপর ধীরে ধীরে মাদক। একসময় ইয়াবা এমনভাবে তার জীবনকে গ্রাস করে, স্বপ্নের সেই আব্দুল্লাহ হারিয়ে যান নেশার অন্ধকারে।
একসময় প্রবাসে গিয়েছেন। বিয়ে করেছেন। বাবা হয়েছেন। পরিবারের সবাই ভেবেছিল, জীবনের নতুন অধ্যায় হয়ত তাকে বদলে দেবে। কিন্তু দেশে ফেরার পর ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে থাকে, নেশা তাকে ছাড়েনি। বরং ততদিনে নেশার কাছে অনেকটাই হার মেনে ফেলেছেন তিনি।
আজ তার নিজের কোনো স্থায়ী ক্যারিয়ার নেই। নষ্ট হয়েছে সঞ্চয়। বিক্রি করতে হয়েছে নিজের দামি জিনিসপত্র। স্ত্রীর গয়না পর্যন্ত রেহাই পায়নি। নেশার টাকা না পেলে শুরু হয় গালিগালাজ, মারধর।
সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয়, সেই নির্যাতনের শিকার হয়েছেন তার নিজের বাবা-মা, স্ত্রী ও ছোট ভাই-বোনেরাও।
একপর্যায়ে নিজের স্ত্রীকে ছুরি দেখিয়ে দেড় বছরের সন্তানকে হত্যার হুমকি দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। একটি পরিবারের কাছে এর চেয়ে বড় আতঙ্ক আর কী হতে পারে?
কৈশোরেই বদলে গেল পথ
পরিবার সূত্রে জানা যায়, আব্দুল্লাহর ছোটবেলা ছিল স্বাভাবিক। পরিবারের ইচ্ছায় তাকে হিফজখানায় ভর্তি করা হয়েছিল। পরে সাধারণ স্কুলে পড়াশোনা শুরু করেন। কিন্তু ষষ্ঠ বা সপ্তম শ্রেণির পর পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ কমে যায়।
পাড়ার কিছু ছেলের সঙ্গে নিয়মিত আড্ডা দিতে শুরু করেন। সেখান থেকেই সিগারেটের অভ্যাস। এরপর ধীরে ধীরে মাদকের সঙ্গে পরিচয়। পরিবার তখন তাকে ফেরানোর চেষ্টা করেছে নানা উপায়ে।
তাবলিগে পাঠানো হয়েছে। পরিবেশ পরিবর্তনের চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু কোনো উদ্যোগই স্থায়ী ফল দেয়নি। ২০১৭ সালে তাকে বিদেশেও পাঠানো হয়।
পরিবারের আশা ছিল, প্রবাসে গিয়ে হয়তো নতুনভাবে জীবন শুরু করবেন। নিজের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলবেন। ছয়-সাত বছর বিদেশে কাটানোর মধ্যে দেশে এসে বিয়ে করেন আব্দুল্লাহ। সংসারে আসে সন্তান। বাবা-মায়ের মনে আবার আশার আলো জ্বলে ওঠে। ছেলে হয়ত এবার স্থির হবে। স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে সংসার করবে। পুরনো জীবন পেছনে ফেলে নিজের ক্যারিয়ার গড়বে। ২০২৪-২৫ সালের দিকে দেশে ফিরে আসেন তিনি। কিন্তু দেশে ফেরার পরই পরিবারের সামনে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে থাকে বাস্তবতা।
নেশার টাকার জন্য একে একে সব বিক্রি
ইয়াবার নেশা মেটাতে টাকার প্রয়োজন ছিল প্রতিদিন। প্রথমে নিজের জমানো টাকা খরচ করেন। এরপর বিক্রি করেন দামি মোবাইল ফোন। তারপর স্ত্রীর গয়না। বিয়ের আংটি, অন্যান্য গয়না একে একে বিক্রি হতে থাকে। টাকা না পেলেই শুরু হতো ঝগড়া। গালিগালাজ। এরপর মারধর।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, শুধু স্ত্রী নন, তার মা-বাবা ও ছোট ভাই-বোনরাও বিভিন্ন সময় তার হাতে মারধরের শিকার হয়েছেন।
একজন মা যিনি সন্তানকে মানুষ করতে জীবনের সবটুকু বিলিয়ে দিয়েছেন, সেই মাকেই সন্তানের আচরণে আতঙ্কিত হয়ে থাকতে হচ্ছে। বাবার ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। যে ছেলেকে নিয়ে একদিন স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই ছেলের কাছেই নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়েছেন তারা।
বাইরে থেকে বোঝা যায় না, ভেতরে এক অন্য মানুষ
আব্দুল্লাহকে দেখলে বোঝার উপায় নেই তিনি মাদকাসক্ত। পরিপাটি পোশাক, স্বাভাবিক চলাফেরা, কথাবার্তাতেও সবসময় অস্বাভাবিকতার ছাপ থাকে না। বাইরে থেকে তাকে দেখে বরং আর দশজন স্বাভাবিক মানুষের মতোই মনে হবে।
কিন্তু পরিবারের সদস্যরা জানেন, নেশার প্রভাবে তার আচরণ কীভাবে বদলে যায়। ধীরে ধীরে তার মধ্যে তৈরি হয় অমূলক ভয়, সন্দেহ ও উৎকণ্ঠা। তার মনে হতে থাকে, কেউ তাকে অনুসরণ করছে, কেউ তাকে হত্যা করতে চাইছে।
রাতের পর রাত ঘুমাতে পারতেন না আব্দুল্লাহ। অন্ধকারকে ভয় পেতেন, তাই ঘরের সব আলো জ্বালিয়ে বসে থাকতেন। কখনো কখনো তার সেই ভয় ও সন্দেহ এতটাই তীব্র হয়ে উঠত যে, স্বাভাবিক আচরণ করাও কঠিন হয়ে পড়ত।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, একপর্যায়ে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়। নেশার প্রভাবে তিনি ঘরের গ্যাস সিলিন্ডার তুলে আছাড় মেরে তাতে আগুন ধরিয়ে দেন। এতে মুহূর্তেই পুরো পরিবারকে পুড়িয়ে মারার মতো ভয়াবহ পরিস্থিতির আশঙ্কা তৈরি হয়।
ডোপ টেস্টে মিলল নেশার ভয়াবহতা
পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, একবার ডোপ টেস্টে আব্দুল্লাহর শরীরে ইয়াবার মূল উপাদান অ্যামফিটামিনের মাত্রা অত্যন্ত বেশি পাওয়া যায়।
ইয়াবা সেবনের পাঁচ দিন পরও তার শরীরে অ্যামফিটামিনের মাত্রা ১০ হাজারের বেশি ছিল বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়।
চিকিৎসকদের মতে, অতিরিক্ত অ্যামফিটামিন গ্রহণের ফলে মানুষের আচরণ ও চিন্তাভাবনায় গুরুতর পরিবর্তন আসতে পারে। অমূলক ভয়, সন্দেহ, উত্তেজনা কিংবা বাস্তবতাবোধের বিকৃতিও দেখা দিতে পারে।
আব্দুল্লাহর আচরণে এসব লক্ষণই ধীরে ধীরে প্রকট হয়ে উঠছিল বলে পরিবারের সদস্যরা জানান।
রিহ্যাব থেকে ফিরেও স্থায়ী হলো না পরিবর্তন
শেষ পর্যন্ত ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে পরিবার তাকে একটি মাদক নিরাময় কেন্দ্রে ভর্তি করে। সেখানে তিন-চার মাস থাকার পর তার আচরণে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যায়। রিহ্যাব থেকে বের হওয়ার পর একটি প্রতিষ্ঠানে ব্যবস্থাপক হিসেবেও কাজ শুরু করেন। পরিবার আবার আশাবাদী হয়ে ওঠে।
তাদের মনে হয়েছিল, দীর্ঘদিন পর হয়তো ছেলে স্বাভাবিক জীবনে ফিরছে। কিন্তু সেই পরিবর্তন স্থায়ী হয়নি।
রিহ্যাব থেকে ফেরার কিছুদিন পর আবারও ইয়াবায় ফিরে যান আব্দুল্লাহ। ফিরে আসে পুরোনো আচরণ। নেশার টাকার জন্য পরিবারের ওপর চাপ বাড়তে থাকে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে চলতি বছরের জুলাইয়ে তাকে গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু সেখান থেকেও পালিয়ে ফিরে আসেন তিনি।
স্ত্রীর গলায় ছুরি ঠেকানোর সেই ঘটনা
গত কোরবানির ঈদের পরদিনের ঘটনা। উৎসবের আমেজ তখনো পুরোপুরি কাটেনি। অথচ পরিবারের ঘরের ভেতর তখন নেমে এসেছে চরম আতঙ্ক। বৃদ্ধ বাবা-মা এক পাশে বসে কাঁদছেন, আর আব্দুল্লাহ স্ত্রীর গলায় ছুরি ঠেকিয়ে টাকা দাবি করছেন।
একপর্যায়ে স্ত্রীকে হুমকি দিয়ে তিনি বলেন, টাকা না দিলে তাদের দেড় বছরের সন্তানকে মেরে ফেলবেন। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ হয়ে ওঠে যে, নিজের সন্তানকে তার বাবার হাত থেকেই রক্ষা করার মতো অসহায় অবস্থায় পড়তে হয় পরিবারকে।
এরপর আর আব্দুল্লাহকে বাড়িতে রাখার ঝুঁকি নেয়নি পরিবার। গত আগস্টে তাকে আবারও মাদক নিরাময় কেন্দ্রে ভর্তি করা হয়। এখন চার দেয়ালের ভেতর আব্দুল্লাহ, আর সেই চার দেয়ালের বাইরে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছে তার পরিবার।
ছোট শিশুটি প্রতিদিন বাবাকে খোঁজে। সে জানে না, কেন বাবা তার সঙ্গে নেই; কেন অন্য শিশুদের মতো প্রতিদিন বাবাকে দেখতে পায় না। স্ত্রীও জানেন না, সামনে তাদের সংসারের জন্য কী অপেক্ষা করছে।
একসময় যে মানুষটির সঙ্গে ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখেছিলেন, আজ সেই মানুষটির হাতেই নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়তে হয়েছে তাকে। বাবা-মায়ের জন্যও পরিস্থিতি কম কঠিন নয়। একদিকে তারা চান, ছেলে সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসুক। অন্যদিকে ভয়ও হয়-নেশামুক্ত না হয়ে যদি আবার বাড়িতে ফিরে আসে, তাহলে কী ঘটবে?
এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই কাটছে তাদের দিন। কেটে যাচ্ছে একেকটি নির্ঘুম রাত। অপেক্ষা শুধু একটাই-তাদের ছেলে কি সত্যিই একদিন নেশার অন্ধকার পেছনে ফেলে সুস্থ, স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবে?
একটি পরিবারের ভাঙনের গল্প
আব্দুল্লাহর গল্পকে শুধু একজন মাদকাসক্ত মানুষের গল্প হিসেবে দেখলে হয়তো পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না। কারণ মাদকাসক্ত একজন মানুষের সঙ্গে ধ্বংস হয় তার চারপাশের মানুষের জীবনও। এই পরিবারে একজন বাবার স্বপ্ন ভেঙেছে। একজন মায়ের নিরাপত্তাবোধ হারিয়েছে। একজন স্ত্রী আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। একটি ছোট শিশু বাবাকে কাছে না পাওয়ার বাস্তবতার মধ্যে বড় হচ্ছে। অথচ এই পরিবারের শুরুটা এমন ছিল না।
একদিন এই বাড়ির সবচেয়ে বড় স্বপ্ন ছিল তাদের প্রথম সন্তানকে ঘিরে। সেই ছেলেই একসময় পরিবারের সবচেয়ে বড় ভরসা হবে, এমনটাই ভেবেছিলেন বাবা-মা। আজ সেই ছেলেকেই সুস্থ করে ঘরে ফেরানোর অপেক্ষায় তারা। ইয়াবা হয়তো আব্দুল্লাহর জীবনের অনেক কিছু কেড়ে নিয়েছে। কিন্তু তার পরিবার এখনো তাকে পুরোপুরি হারিয়ে ফেলতে চায় না।
তাদের অপেক্ষা তাই শুধু একজন মাদকাসক্ত মানুষের রিহ্যাব থেকে বের হয়ে আসার অপেক্ষা নয়। এটি একটি পরিবারের বহু বছরের পুরোনো স্বপ্নকে আবার ফিরে পাওয়ার অপেক্ষা। যে ছেলে একদিন বাবা-মায়ের স্বপ্ন ছিল, তারা চান সেই ছেলেটিই একদিন আবার তাদের কাছে ফিরে আসুক।
এমআর/জেবি











