তরুণদের মধ্যে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে মাদকাসক্তি। প্রতিদিনই নতুন করে মাদকের ফাঁদে জড়াচ্ছেন বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। কেউ বন্ধুদের প্ররোচনায়, কেউ হতাশা-বেকারত্বের চাপে, আবার কেউ কৌতূহল বা নানা প্রলোভনে শুরু করছেন মাদক গ্রহণ। ধীরে ধীরে সেই অভ্যাসই পরিণত হচ্ছে নির্ভরতায়।
সন্তানদের মাদকাসক্ত হয়ে পড়ার ঘটনায় উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় দিন কাটছে অভিভাবকদের। তাদের মতে, মাদকের বিস্তার ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতার পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজে নৈতিকতা ও মূল্যবোধের চর্চা বাড়াতে হবে। বিশেষ করে তরুণদের জন্য প্রয়োজন সুস্থ বিনোদন, কর্মসংস্থান ও ইতিবাচক সামাজিক পরিবেশ।
ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী আতিক হাসান (ছদ্মনাম)। পড়ছেন অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে। প্রথম বর্ষের মাঝামাঝি সময়ে বন্ধুদের আড্ডার ছলে মাদকাসক্ত হয়ে পড়েন তিনি। বর্তমানে প্রতিদিন কিংবা সপ্তাহে দুই থেকে চার দিন মাদক গ্রহণ না করলে তার কাছে ভালো লাগে না। মাদক গ্রহণ করতে যান ঢাকা কলেজের আশেপাশের কয়েকটি বারে। এতে তিনি এবং তার বন্ধুরা নিরাপদে মাদক গ্রহণ করতে পারেন। মাদক গ্রহণ করার পর কখনো কখনো মাতাল হয়ে পড়েন এবং রুমের মধ্যে অচেতন হয়ে থাকেন।
আরও পড়ুন: ২৪ জেলার সীমান্ত দিয়ে দেশে ঢুকছে মাদক
আতিক হাসান (ছদ্মনাম) নিজেই ঢাকা মেইলকে জানিয়েছেন মাদকাসক্তির পেছনের গল্প। তিনি বলেন, ইন্টারমিডিয়েটের পর অনার্সের ভর্তি প্রস্তুতি নিতে ঢাকায় আসি। এই সময়ে ধ্যান-জ্ঞান সবকিছু ছিল পড়াশোনা। এরপর অনার্স ভর্তি হওয়ার পর স্থায়ী বন্ধু হতে থাকে। এরমধ্যে বন্ধুত্বের কয়েকটি সার্কেল তৈরি হয়। অনার্সের কয়েক মাস যাওয়ার পর এক বন্ধু মদ খাওয়ার অফার করে, প্রথমে কৌতূহলে সাড়া দিলেও ধীরে ধীরে আসক্তি চলে আসে।
এই কলেজ শিক্ষার্থী বলেন, এখন আমার মাদকের সঙ্গে সিগারেট নিত্য সময়ের সঙ্গী। মাদক আর সিগারেট ছাড়া আমি থাকতে পারবো না। এই দুটি আমার লাগবেই। মদ গ্রহণ না করলে শরীরেও ভালো লাগে না।
শুধু আতিক হাসানই নন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বাড়ছে মাদকাসক্তির সংখ্যা। স্কুল, কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাদক ছড়িয়ে পড়ছে ব্যাধির মতো। এই সচেতন মহলেও গ্রাস করেছে ভয়াল মাদকের ছোঁয়া। এদিকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সচেতনতা ও নৈতিক শিক্ষার বিকল্প নেই। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এসে অনেক শিক্ষার্থী নৈতিক জ্ঞান হারিয়ে অনৈতিক পথে পা বাড়াচ্ছে। রাষ্ট্রকে চিন্তা করতে হবে কীভাবে শিক্ষার্থীদের ভালো রাখা যায়। সেইসঙ্গে কর্মসংস্থান নিশ্চিত ও বেকারত্ব দূর করতে হবে।
তারা আরও বলছেন, শিক্ষার্থীদের অধিকাংশই কৌতূহল ও বন্ধুদের প্ররোচনায় প্রথমে ধূমপান করেন। ধীরে ধীরে তারা মাদকাসক্ত হয়ে পড়েন। তবে চিকিৎসার বাইরে থেকে যাচ্ছেন অধিকাংশ মাদকসেবী।
জানতে চাইলে ভোলার শিক্ষক ও অভিভাবক মিজানুর রহমান ঢাকা মেইলকে বলেন, সন্তানদের আমরা গ্রাম থেকে ঢাকায় পাঠাই উচ্চ শিক্ষিত হওয়ার জন্য। তারা সেখানে কী করে সার্বক্ষণিক খোঁজ রাখাও সম্ভব নয়। কেননা, আমরা সেখানে থাকি না। সন্তানরা তাদের বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে থাকে। অনেক সময় বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে কেউ কেউ খারাপ পথে পা বাড়াচ্ছে। তাদের এই পথ থেকে ফেরানোর মাধ্যম হলো নৈতিক ও মূল্যবোধের শিক্ষা দেওয়া।
এই অভিভাবক বলেন, বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা নৈতিক ও মূল্যবোধের উপযোগী নয়। নৈতিকতা চর্চার কথা মুখে মুখে বলা হয়, কিন্তু বাস্তবে মানা হচ্ছে না। যার ফলে চারদিকে তরুণরা মাদকসহ বিভিন্ন পথে যাচ্ছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর (ডিএনসি) সূত্রে জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের মাদকের প্রচলন থাকলেও ইয়াবা, ফেনসিডিল, গাঁজার ব্যবহার সবচেয়ে বেশি। চলতি সময়ের বিপজ্জনক মাদক ইয়াবায় আসক্তদের অন্তত ৪৫ শতাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।
অধিদফতরের একটি প্রাথমিক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে প্রায় ২ লাখের মতো বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থী ইয়াবা সেবন করে থাকে। ইয়াবার দাম বেশি হওয়ায় অপেক্ষাকৃত ধনী পরিবারের শিক্ষার্থীরা ওই মাদক সেবন করে। গবেষণার তথ্য মতে, অন্য মাদক ছাড়াও সারা দেশে শুধু ইয়াবাসেবী রয়েছে প্রায় সাড়ে তিন লাখ। তাদের মধ্যে প্রায় ২ লাখ বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থী। এরমধ্যে রয়েছে ২০ হাজার নারী শিক্ষার্থী। ওই শিক্ষার্থীদের বয়স ২০ থেকে ২৫-এর মধ্যে। এদের প্রায় ৭০ শতাংশ উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তান।
আরও পড়ুন: ঘরে বসেই অর্ডার, দরজায় পৌঁছে যাচ্ছে মাদক
এদিকে দেশে ১৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যেও মাদকাসক্তি বাড়ছে। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থী, এমনকি উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যেও বাড়ছে মাদকাসক্তের হার। ২০২০ সালে ডিএনসির চারটি সরকারি কেন্দ্রে ১৪ হাজার ৯৫২ জন চিকিৎসা নিয়েছেন। এরমধ্যে তরুণ মাদকসেবীদের কাছে ইয়াবার চাহিদা সবচেয়ে বেশি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানেও বেশি উদ্ধার হয় ইয়াবা। তবে চিকিৎসা নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে হেরোইনে আসক্ত ৩৪ শতাংশ ও ইয়াবায় আসক্ত ২৮ শতাংশ। অর্থাৎ চিকিৎসা নেওয়া ব্যক্তিদের অর্ধেকের বেশি হেরোইন ও ইয়াবায় আসক্ত। এর বাইরে ফেনসিডিল, গাঁজা, সিরিঞ্জের মাধ্যমে নেওয়া মাদক, মদ্যপান, ঘুমের ওষুধ সেবন এবং গুল সেবনে আসক্ত ব্যক্তি পাওয়া গেছে।
ডিএনসির তথ্য অনুযায়ী, বেকার মাদকসেবীর সংখ্যা বাড়ছে। ২০১৯ সালে দেশে মোট মাদকসেবীর মধ্যে প্রায় ৪১ শতাংশ ছিলেন বেকার। এক বছরের ব্যবধানে ২০২০ সালে এই হার বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৫৮ শতাংশ। পাঁচ বছর আগে এই হার ছিল প্রায় ৪৪ শতাংশ।
এছাড়া ভৌগোলিকভাবে অবস্থানগত দিক থেকে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মাদক রুট গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল এবং গোল্ডেন ক্রিসেন্টের কাছাকাছি। এ কারণে খুবই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার মধ্যে আছে বাংলাদেশ। পাশাপাশি অরক্ষিত সীমান্তের কারণে দেশের অন্তত ২০টি জেলার ৯৫টি রুট দিয়ে মাদক আসছে।
জানতে চাইলে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলাম ঢাকা মেইলকে বলেন, তরুণদের মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ার পেছনে কৌতূহল, বন্ধুমহলের প্রভাব, পারিবারিক দূরত্ব, হতাশা, একাকিত্ব ও মানসিক চাপসহ নানা কারণ কাজ করে। অনেক সময় মাদক গ্রহণকে তারা সাময়িক স্বস্তি বা বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে ভাবলেও ধীরে ধীরে তা নির্ভরশীলতায় পরিণত হয়। তাই বিষয়টিকে শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখলে হবে না; এটি একই সঙ্গে একটি গুরুতর মানসিক স্বাস্থ্য ও সামাজিক সমস্যা। তরুণদের আচরণে পরিবর্তন দেখা দিলে পরিবারকে শাসনের পরিবর্তে তার কারণ বোঝার চেষ্টা করতে হবে এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত কাউন্সেলিং ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে।
এই বিশেষজ্ঞ বলেন, মাদক প্রতিরোধে পরিবারের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি, তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং মানসিক চাপ ও হতাশার সময়ে পাশে থাকা জরুরি। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। যারা ইতোমধ্যে মাদকে জড়িয়ে পড়েছে, তাদের সামাজিকভাবে হেয় না করে চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ দিতে হবে। কারণ একজন তরুণকে মাদক থেকে ফিরিয়ে আনা মানে শুধু একটি জীবন নয়, একটি পরিবার ও সমাজের ভবিষ্যৎকেও রক্ষা করা।
আরও পড়ুন: বিচারে গতি আনতে ২২ মাদক ট্রাইব্যুনাল গঠন
মাদকের উৎস বন্ধের তাগিদ দিয়ে সাইকোলজিস্ট জিসান আহমেদ ঢাকা মেইলকে বলেন, তরুণদের মধ্যে মাদকের বিস্তার রোধে শুধু সচেতনতামূলক প্রচারণা বা আইন প্রয়োগ যথেষ্ট নয়; মাদকের চাহিদা ও সরবরাহ—দুই দিকেই সমান গুরুত্ব দিতে হবে। কেন তরুণরা মাদকের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে, কোন পরিবেশে তারা বেশি ঝুঁকিতে পড়ছে এবং কীভাবে মাদক তাদের কাছে পৌঁছাচ্ছে—এসব বিষয় চিহ্নিত করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে। একই সঙ্গে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে তরুণদের মানসিক চাপ মোকাবিলা, বন্ধুমহলের চাপ থেকে বেরিয়ে আসা এবং ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ এড়িয়ে চলার বিষয়ে কার্যকর প্রশিক্ষণ ও কাউন্সেলিং চালু করা প্রয়োজন।
জিসান আহমেদ বলেন, মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে শুধু অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। সরবরাহ নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি আক্রান্তদের চিকিৎসা, কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসনের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। তরুণদের খেলাধুলা, সংস্কৃতি, শিক্ষা ও কর্মমুখী কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার সুযোগ বাড়াতে পারলে মাদকের বিকল্প ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি হবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এই ভয়াবহ ঝুঁকি থেকে অনেকটাই সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব হবে।
এসএইচ/জেবি











