খুলনার লবণচরা থানার হরিণটানা আশিবিঘা বালুর মাঠে মাদক কারবার ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে মঞ্জুরুল ইসলাম নামে এক যুবককে হত্যা করা হয়। সেই হত্যার বদলা নিতে মাত্র দুই ঘণ্টার ব্যবধানে নাজমুল নামে প্রতিপক্ষের এক যুবক খুন হন।
গত ১৯ আগস্ট সংঘটিত এ দুটি হত্যাকাণ্ড শহরে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। ঘটনার দুই দিন পরে গোপালগঞ্জের মাঝিগাতি বাজার এলাকা থেকে মূল অভিযুক্ত টুটপাড়ার শীর্ষ সন্ত্রাসী আলামিন হাসান সাইফি ও তার সহযোগী রফিকুল ইসলাম রফিককে গ্রেফতার করে র্যাব-৬।
গত ৪ সেপ্টেম্বর খুলনা সদর থানার বিকে মেইন রোড এলাকায় মাদক সেবন ও বেচাকেনার অভিযোগে বিক্ষুব্ধ জনতা ওই মাদক কারবারিদের বাড়িতে ভাঙচুর চালায়। পরে পুলিশ চারজনকে আটক করে।
মহানগর পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের তথ্য বলছে, চলতি বছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত শহরে ২৪টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। যার মধ্যে সাতটি সরাসরি মাদক সংক্রান্ত ঘটনায়। এসব হত্যাকাণ্ডে এজাহারভুক্ত ৩৮ জন আসামিকে ইতোমধ্যে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
কেএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশান) এম এম শাকিলুজ্জামান ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘শহরে অধিকাংশ হত্যাকাণ্ডের পেছনে রয়েছে মাদক সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তার। বেশিরভাগ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের গ্রেফতার করা হয়েছে। এছাড়া কয়েকদিন আগে আটটি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। শহরের আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে পুলিশ সর্বাত্বক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।’

জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে জেলা ও মহানগরে এখন পর্যন্ত মাদক উদ্ধারে ৬৩৯টি অভিযান চালানো হয়েছে। মাদক নিয়ন্ত্রণ আইনে ৮১টি মামলায় ১৭৫ জনকে আসামিও করা হয়েছে। এছাড়া মাদক উদ্ধারের ঘটনায় ভ্রাম্যমাণ আদালতে ১০৩টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এসব অভিযানে ১৭ কেজি গাঁজা, ১৭ হাজার ২২৬ পিস ইয়াবা, ১৩ বোতল ওয়াইন এবং ৪৫ বোতল ফেনসিডিল উদ্ধার করা হয়।
নগরীতে মাদক বেচাকেনার ১১৭ স্পটের তালিকা প্রধানমন্ত্রীর দফতরে
এদিকে নগরীর ৩১টি ওয়ার্ডের ১১৭টি স্পটের মাদক বিক্রি এবং মাদক ব্যবসার বিস্তারিত বিবরণ তালিকা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর খুলনা। এসব স্পটে সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত মাদক বেচাকেনা হয়। এর সঙ্গে ২৭২ জন মাদক কারবারি জড়িত বলে শনাক্ত করা হয়েছে।
সাতক্ষীরা ও যশোর থেকে চোরাকারবারিরা সড়ক ও রেলপথে ফেনসিডিল ও ইয়াবা নিয়ে আসে। পণ্যবাহী পরিবহনে করে এসব মাদক পথের বাজার ও জিরোপয়েন্ট দিয়ে নগরীতে প্রবেশ করে। বেনাপোল থেকে আসা কমিউটার ট্রেনেও ফেনসিডিল ও ইয়াবা কারবারিরা দৌলতপুর ও খুলনা স্টেশনে নামে বলে তালিকায় উল্লেখ করা হয়েছে।
জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মলয় ভূষণ চক্রবর্তী বলেন, লোকবল সংকট সত্ত্বেও আমরা নিয়মিত মাদকবিরোধী অভিযান চালাচ্ছি। আসামি গ্রেফতার হলে পরে আইনি দুর্বলতায় দ্রুত জামিন পেয়ে যায়। পরবর্তীতে তারা আবারও অপরাধে জড়ায়।
তিনি আরও জানান, মানুষকে মাদক থেকে দূরে রাখতে পাড়া-মহল্লা স্কুল, কলেজে সচেতনতামূলক সভা, সেমিনার করা হয়। মাদকাসক্তদের জন্য সরকারি মাদক নিরাময় কেন্দ্রে কাউন্সিলিংয়ের ব্যবস্থা রয়েছে। সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি বেসরকারি মাদক নিরাময় কেন্দ্রে চিকিৎসা নেওয়ারও সুযোগ রয়েছে।
খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘সবচেয়ে অবাক হওয়ার মত তথ্য হচ্ছে, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জায়গা মাদকের হটস্পট হিসেবে শনাক্ত হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, সেখানকার প্রশাসন কী করে! অবশ্যই তাদের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ। প্রশাসনের উচিত শনাক্ত হওয়া মাদকের স্পটগুলো ভেঙে দেওয়া।’
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি আরও বলেন, ‘মাদক সংক্রান্ত বিষয়ে মূল ভূমিকা রাখার কথা সরকারি এই প্রতিষ্ঠানটির। কিন্তু তাদের দৃশ্যমান কোনো কার্যক্রম নেই। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের উচিত এ প্রতিষ্ঠানটিকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া।’
প্রতিনিধি/এএইচ





















