- হোটেল থেকে গলি-মাদকের অবাধ বিস্তার
- রাজনীতির আড়ালে মাদকের কারবার
- রক্ষকই জড়িত মাদক কারবারে!
- মাদক ঠেকানোর দায়িত্বেই মাদকের কারবার?
মদ-গাজা, গাম, ফেনসিডিল-ফেয়ারডিল, ইয়াবা, ক্রিস্টাল মেথ-আইস, হেরোইনসহ কী নেই! সব ধরনের মাদকে ভাসছে চট্টগ্রাম মহানগর থেকে জেলার প্রত্যন্ত এলাকা। যেখানে হাত বাড়ালেই মিলছে মাদক। শুধু ভাসছে না, এসব মাদক বিক্রয় ও সেবনে পুরো অস্থির চট্টগ্রাম।
প্রত্যন্ত এলাকার বাসিন্দাদের মতে, বয়স ও শ্রেণিভেদে এসব মাদক সেবন হয়। যেমন মদ-গাজা, ফেনসিডিল-ফেয়ারডিল সেবন করে নিম্ন শ্রেণি থেকে মধ্যবিত্ত শ্রেণি পর্যন্ত। যা মিলছে নগরীর অলিগলি থেকে বিভিন্ন সংগঠন ও ক্লাবে।
সিএমপির তথ্যমতে, নগরীর অন্তত ৫০০ স্পট ও জেলার উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে মিলছে এসব মাদক।
আর বিদেশি মদ উচ্চবিত্তদের সুপেয় খাবার, যা মিলে নগর ও জেলার বিভিন্ন অভিজাত হোটেল-রেস্তোরাঁ ও ক্লাবে। একই সাখে হেরোইন ও ক্রিস্টাল মেথ-আইসও সেবন করছে মধ্যবিত্ত থেকে উচ্চবিত্ত পর্যন্ত সবাই। একমাত্র ইয়াবা সেবনে নেই কোনো শ্রেণি বিভেদ। সহজলভ্য হওয়ায় ইয়াবা এখন সব শ্রেণি পেশার মাদকসেবির খাবার।
আরও পড়ুন: খেলার মাঠে খেলা নেই, বসে মাদকের আসর!
অনেক নিঃস্ব বেকার যুবকও এই ইয়াবা সেবন করে থাকে। তবে সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, শিশু-কিশোররা পর্যন্ত বাদ নেই মাদক সেবন থেকে। বিশেষ করে নগরীর মোড়ে মোড়ে পথশিশুরা এক ধরনের গাম সেবন করে নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে।
আর এই মাদক কিনতে চট্টগ্রাম মহানগর থেকে গ্রাম পর্যন্ত চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে হরহামেশা। ডাকাতির মতো ঘটনার সাথেও জড়িত হচ্ছে তরুণ-কিশোর ও পথশিশুরা। এমনকি নগর থেকে গ্রাম পর্যন্ত খুন-ধর্ষণের মতো ঘটনাও ঘটছে প্রতিনিয়ত। যার প্রভাবে জর্জরিত শহর-বন্দর ও সমাজ।
প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, মাদক বিক্রয় ও সেবনে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন বেশি জড়িত। এরপর রয়েছে ইসলাম ধর্মাবলম্বী জনগোষ্ঠী। বাকি অন্যান্য সম্প্রদায়ও মাদক বিক্রয় ও সেবনে জড়িত। অথচ ইসলামসহ সব ধর্মে মাদক সেবন হারাম বা নিষিদ্ধ।
মাদক কারবারে রাজনীতিবিদরা!
প্রত্যন্ত এলাকার সচেতন মানুষের মতে, সমাজের সবচেয়ে হতদরিদ্র বেকার যুবকরা এক সময় দেশে তৈরি চোলাই মদ ও গাজা বিক্রি করতেন। যা তাদের আয়ের একমাত্র পথ ছিল। অত্যন্ত গোপনে আড়ালে আবডালে থেকে মদ ও গাজা বিক্রি করতেন তারা।
আর যারা সেবন করতেন তারাও এক সময় আয়ের পথ হিসেবে মদ-গাজা বিক্রি শুরু করেন। আর এ কাজ করতে গিয়ে নিকটস্থ থানা পুলিশকে মাসোহারা হিসেবে নিদিষ্ট অঙ্কের অর্থ দিতেন। দিতে হতো মদ গাঁজাও। যা সেবন করতেন থানা পুলিশও। এই সহজ পথ সুগম হওয়ায় মাদকের বিস্তৃতি ঘটে নগর-বন্দর থেকে অলিগলি পর্যন্ত।
যা নজরে পড়ে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের। যারা মাদক বিক্রেতাদের সঙ্গে মিশে শুরু করেন মাদক কারবার। যার প্রসার এখন দিগন্তছোঁয়া। ব্যবসার সুবিধার্থে তারা ব্যবহার করেন দলীয় পদ-পদবি। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী পরিচয়ে এখন চলছে মাদক কারবার। এর মধ্যে এখন সবচেয়ে লাভজনক ব্যবসা হচ্ছে ইয়াবা। ক্রিস্টাল মেথ-আইস ও হেরোইন বেচাকেনা।
রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী পরিচয়ে দিনের বেলায় টেন্ডারবাজি, দখলবাজি করলেও গোপনে চলছে মাদক কারবার। দলীয় নেতাকর্মীদের সিংহভাগের পেশা এখন মাদক ব্যবসা। অল্প সময়ে ধনী হওয়ার প্রবণতা থেকে দেশের অসৎ লোকেরা মাদক কারবারে জড়িয়ে পড়ছে। এ ব্যবসায় পৃষ্ঠপোষক, ব্যবসায়ী, বাহক ও বিক্রির নেটওয়ার্কে প্রতিবছরই লোকসংখ্যা বাড়ছে। এদের সাথে দারুণ সখ্য আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর কর্মকর্তাদের সাথে। এতে অসহায় সাধারণ মানুষ।
সিএমপির তথ্যমতে, ২০১৮ সালের দিকে চট্টগ্রাম মহানগর ও জেলায় মাদক ব্যবসায় যুক্ত ৯০ জনের একটি তালিকা করেছিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। আরেকটি তালিকা করা হয়েছে পৃষ্ঠপোষকদের। এই তালিকায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রভাবশালী রাজনীতিক ও থানার ওসিসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের নামও আছে।
এর মধ্যে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের তৎকালীন বিতর্কিত ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল কাদের ওরফে মাছ কাদেরের নাম রয়েছে এ তালিকায়। রয়েছে তৎকালীন ওয়ার্ড কাউন্সিলর জসিম উদ্দিন, শৈবাল দাস সুমন, এসরারুল হক এসরার, যুবলীগ নেতা হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর, রাঙ্গুনিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার সামশুর নামও।
যারা নিজেদের অনুগত ও বিশ্বস্ত শত শত নেতাকর্মী দিয়ে মাদক বিক্রয় ও পাচার করেন। একই পথে রয়েছে বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের শত শত প্রভাবশালী নেতাকর্মী। নতুন তালিকা না হওয়ায় যাদের নাম এখনো পর্যন্ত তালিকাভুক্ত হয়নি। ফলে তাদের কারও বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে তালিকাভুক্ত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা পলাতক এবং মোবাইলফোন বন্ধ থাকায় তাদের কারও সাথে কথা বলা সম্ভব হয়নি।
চট্রগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মুহাম্মদ ফয়সাল আহম্মেদ এ প্রসঙ্গে ঢাকা মেইলকে বলেন, চট্টগ্রাম মাদক পরিবহনের প্রধান রুট। এর সঙ্গে কিছু গডফাদার যুক্ত। গডফাদার ও ব্যবসায়ীদের তালিকা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ শুরু করেছে। তদন্তসাপেক্ষে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মাদক পাচার ও সেবনে খোদ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী!
দেশে মাদক সেবন-পাচার ও বিক্রয় নিয়ন্ত্রণে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর, পুলিশ-আনসার-র্যাবসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিয়োজিত থাকলেও মূলত সংস্থাগুলোর সদস্যরাও লিপ্ত মাদক সেবন-পাচার ও বিক্রয়ে। যা ইতোমধ্যে প্রমাণিত।
মাদকের সাথে জড়িত থাকা সরকারি সংস্থাগুলোর অনেকেই চাকরি হারিয়েছেন। যার মধ্যে পুলিশ ও আনসার সদস্য বেশি। যারা চাকরি হাারিয়েও ছাড়েনি মাদক বিক্রয়, পাচার ও সেবন। বরং উল্টো আঁকড়ে ধরেছেন মাদক ব্যবসাকে। ফলে থেমে নেই মাদকসেবন, পাচার ও বিক্রয়।
গত ২০ আগস্ট এক অভিযানে মিলেছে এর প্রমাণ। সেদিন চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায় ইয়াবার আসর থেকে চাকরিচ্যুত পুলিশ সদস্য নিউটন সিকদার (৩৭) ও তার এক সহযোগীকে গ্রেফতার করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার ভ্রাম্যমাণ আদালত। আদালত তাদের তিন মাসের কারাদণ্ড দেন।
নিউটন সিকদার লোহাগাড়া উপজেলার বড়হাতিয়া ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সেনেরহাট হিন্দুপাড়া এলাকার দোলন সিকদারের ছেলে। ইয়াবা পাচারের দায়ে দুই বছর আগে চাকরি হারান তিনি। সাজা পাওয়া অপর জন হলেন- রাজেশ ধর (২৮)। তিনি এবং একই এলাকার সবুজ ধরের ছেলে।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের ডিসি (ডিবি-দক্ষিণ), অতিরিক্ত ডিআইজি পদে পদোন্নতিপ্রাপ্ত শেখ শরীফুল ইসলামের তথ্য মতে, গত কয়েক বছরে মাদক বিক্রয় ও সেবনের দায়ে সিএমপির তিন শতাধিক পুলিশ সদস্য ও কয়েকশ আনসার সদস্যের চাকরি গেছে। কয়েকজন পুলিশ সদস্য গ্রেফতারও হয়েছেন।
রক্ষক যদি ভক্ষক হয়-তখন অপরাধীরা বেপরোয়া হয়ে উঠে। ঠিক তেমনি পরিস্থিতি এখন চট্টগ্রামের। নগরবাসীর ভাষ্য, সন্ধ্যা থেকে রাত দূরের কথা, দিনে-দুপুরেও অনেক পুলিশ সদস্য মদ্যপ অবস্থায় ডিউটি করতে দেখা যায়। যাদের অধিকাংশই হয় ইয়াবা আসক্ত, নয়তো মদ্যপ। যারা মানুষের সাথে অসংলগ্ন আচরণ করে। মানুষ যখন বুঝতে পারে তিনি নেশাগ্রস্ত তখন সেদিকে কান না দিয়ে চলে যায় নিজ গন্তব্যে। এ অবস্থায় নগরীর সাধারণ মানুষ অসহায় বোধ করছে।
চট্টগ্রামে মাদকের স্পট
নগরবাসীর মতে, চট্টগ্রাম শহরের সব প্রধান সড়ক ও উড়াল সড়কের নিচে বসে দিনে দুপুরে মদ-গাজা সেবন করে কিশোর থেকে উঠতি যুবকরা, এমনকি মধ্যবয়সী লোকজনও। রেল স্টেশন, বাস স্টেশনগুলো যেন মদ গাজা সেবনের নিরাপদ জায়গা।
এছাড়া বরিশাল কলোনি, চট্টগ্রাম কদমতলী বাস টার্মিনাল, মতিঝরনা, এনায়েতবাজার গোয়ালপাড়া, বায়েজিদ শের শাহ কলোনি, অক্সিজেন মোড়, ফিরোজ শাহ কলোনি, অলংকার মোড়, পাহাড়তলী, টাইগারপাস, বাটালি হিল চান্দগাঁও মাদকের সবচেয়ে বড় বাজার।
সবচেয়ে বিস্ময়ের ব্যাপার, ৪-৫ বছর বয়সী পথশিশুরা পর্যন্ত মদ গাঁজা ও গাম জাতীয় মাদক সেবন করে। পুলিশ তাদের এসব দেখেও দেখে না। পুলিশ পাশ দিয়ে হেঁটে যায় আর গালি দিয়ে বলে- খা।
অলিগলি পেরিয়ে এবার চোখ দেওয়া যাক চট্টগ্রাম শহরের অভিজাত হোটেল-রেস্টুরেন্টের দিকে। নগরীর স্টেডিয়াম পাড়ায় অবস্থিত অভিজাত হোটেল রেডিসন ব্লু-বে, চট্টগ্রাম ক্লাব, জিইসির মোড়ে অবস্থিত পেনিনসুলা, আগ্রাবাদে অবস্থিত হোটেল আগ্রাবাদ, হোটেল সেন্টমার্টিন, পতেঙ্গা বোট ক্লাব, নন্দনকানন পুলিশ প্লাজাসহ থ্রি স্টার থেকে ফাইভ স্টার মানের সব হোটেলে দেশি-বিদেশি মাদকদ্রব্য সেবনের নিরাপদ স্পট। এসব হোটেলের বারগুলো যেন একেকটা পাপপুরি। ইয়াবা থেকে নিয়ে সব ধরনের দেশি-বিদেশি মাদক মিলে এসব হোটেলে। দেশের শিল্পপতি ও রাজনীতিকরা এসব পাপপুরির খদ্দের। আর এসব হোটেলে মাদক বিক্রয় ও সেবনের লাইসেন্স দেয় মাদক নিয়ন্ত্রক অধিদফতর। ফলে এসব হোটেলের দিকে চোখ তুলে থাকায় না প্রশাসনের কেউ।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত তালিকা অনুযায়ী, মাদক বেচাকেনা ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের জন্য চট্টগ্রাম বিভাগে ৩৭টি খাতে মোট ১ হাজার ৬২৪টি লাইসেন্স ও জোত পারমিট দিয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর। এসব লাইসেন্স ও পারমিটের আওতায় দেশীয়ভাবে উৎপাদিত মাদকসহ বিভিন্ন মাদকজাতীয় ও রাসায়নিক পণ্য সরবরাহ, সংরক্ষণ, ব্যবহার, আমদানি-রফতানি ও বিক্রির সুযোগ রয়েছে।
তবে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর খাতভিত্তিক তালিকা প্রকাশ করলেও লাইসেন্স ও জোত পারমিট পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম গোপন রেখেছে। ফলে কোন কোন প্রতিষ্ঠান এসব লাইসেন্স বা পারমিট পেয়েছে, তা জানা সম্ভব হয়নি।
ইয়াবা পাচারের অভিনব কৌশল
ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকতে ইয়াবা পাচারকারীরা অভিনব কৌশলে কক্সবাজারের টেকনাফ থেকে চট্টগ্রামে ইয়াবা নিয়ে আসছেন। পেটের ভেতর, পেঁয়াজ ও কুমড়ায়, মোটরসাইকেল ও গাড়ির জ্বালানির ট্যাংক, কাভার্ড ভ্যানের ভেতরে বিশেষ বাক্সে করে আসছে ইয়াবা।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর চট্টগ্রাম মেট্রো (দক্ষিণ) অঞ্চলের উপপরিচালক মো. মানজুরুল ইসলাম ঢাকা মেইলকে বলেন, নতুন নতুন কৌশলে নগরে মাদক ঢুকছে। সম্প্রতি নগরীর কোতোয়ালি থানার ব্রিজঘাট এলাকা থেকে দুজন ইয়াবা পাচারকারীকে গ্রেফতার করেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের কর্মকর্তারা। কক্সবাজারের টেকনাফ থেকে পেটের ভেতর ইয়াবা নিয়ে চট্টগ্রামে আসেন তারা। তাদের পেট থেকে ৫ হাজার ৮০০টি ইয়াবা বের করা হয়।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মতে, মিয়ানমার থেকে আসা ইয়াবা কক্সবাজারের টেকনাফ থেকে চট্টগ্রাম হয়ে দেশে সরবরাহ হচ্ছে। প্রতিদিনই ইয়াবা পাচার হচ্ছে। আবার প্রতিদিনই ধরাও পড়ছে। কিন্তু পাচারের তুলনায় জব্দ হচ্ছে খুব কম।
চট্টগ্রাম নগরীতে মাদক সেবন, বিক্রি ও পাচারের সঙ্গে পুলিশের কোনো সদস্য জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে-এমন প্রশ্নও উঠছে। অভিযোগ রয়েছে, পুলিশের কিছু সদস্যের মাদকের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ততা এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে নগরীতে মাদকের বিস্তার নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের কিছু সদস্যের বিরুদ্ধেও মাদক কারবারে সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে মাদক নিয়ন্ত্রণের কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) ভাষ্য, মাদক বিক্রি ও সেবনের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে গত কয়েক বছরে সিএমপির তিন শতাধিক পুলিশ সদস্য চাকরি হারিয়েছেন। একই সময়ে কয়েকশ আনসার সদস্যের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি মাদকের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালিয়ে সহস্রাধিক মাদকসেবী ও পাচারকারীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাদের বিরুদ্ধে দেশের প্রচলিত আইনে মামলা দিয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের ডিসি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মো. রইছ উদ্দিন ঢাকা মেইলকে বলেন, কারাগারে থাকা বন্দিদের মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশই মাদক মামলার আসামি। তবে কয়েক দিন থেকে কয়েক মাস কারাভোগের পর তারা জামিনে বা সাজা শেষে বেরিয়ে আবার মাদক সেবন, পাচার ও বিক্রির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছেন। ফলে শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান দিয়ে মাদকের বিস্তার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের ভাষ্য
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী ঢাকা মেইলকে বলেন, মাদকসহ যেকোনো অপরাধের বিরুদ্ধে পুলিশ জিরো টলারেন্সে। মাদক সেবন, পাচার ও বিক্রয়ে জড়িতদের বিরুদ্ধে পুলিশ প্রতিদিন অভিযান পরিচালনা করছে। নগরীর প্রধান সড়কগুলোতে চেকপোস্ট বসিয়ে প্রায় সময় অভিযান চালানো হচ্ছে।
এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, পুলিশের ভেতরে মাদক সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। নগরীর রেল স্টেশন, বাস স্টেশনসহ উড়াল সড়কের নিচে এবং সড়কের মোড়ে মোড়েও মাদকের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হবে।
চট্টগ্রাম পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম ঢাকা মেইলকে বলেন, সীমান্তের কোন কোন পথে মাদক আসছে সেটা আমরা চিহ্নিত করেছি। মাদকের প্রবেশ ঠেকাতে সংশ্লিষ্ট জেলা পুলিশ তৎপর রয়েছে। পাশাপাশি গোয়েন্দা পুলিশও কাজ করছে। নিয়মিত চেকপোস্ট ও অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। মাদক উদ্ধারের পাশাপাশি আসামি গ্রেফতার করা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে মাদক নিয়ে আসা হচ্ছে। অনেক সময় লোভ-লালসায় পড়ে এজেন্সির লোকজন মাদক কারবারে জড়িয়ে পড়ছে। যেসব বাহিনীর সদস্যরা এসব কাজে জড়াচ্ছে, জানতে পারলে তাদের শাস্তিও হচ্ছে। মাদক প্রবেশ ঠেকাতে পুলিশের তৎপরতা আরও বাড়ানো হয়েছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর, চট্টগ্রাম জেলার অতিরিক্ত পরিচালক মো. জাহিদ হোসেন মোল্লা ঢাকা মেইলকে বলেন, মাদকদ্রব্য সেবন, পাচার ও বিক্রয় নিয়ন্ত্রণে সবসময় সজাগ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর। চলতি বছরেই নগরীর বিভিন্ন জায়গায় একাধিক অভিযান পরিচালনা করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের চট্টগ্রাম জেলা কার্যালয়। এতে বিপুল পরিমাণ ইয়াবাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্য জব্দ ও সংশ্লিষ্টদের গ্রেফতার করে আদালতেও পাঠিয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর সরকারি বিধি মোতাবেক কিছু প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স ও জোত পারমিট দিয়ে থাকে। চট্টগ্রামে এমন ১ হাজার ৬২৪টি লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। যেখান থেকে সরকারের উল্লেখযোগ্য রাজস্ব যোগ হয়। বৈধ এই জোত পারমিট ছাড়া অবৈধ যেকোনো মাদকদ্রব্য সেবন, পাচার ও বিক্রয়ের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রাখবে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর।
বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য রেঞ্জ পরিচালক মোহাম্মদ আমিন উদ্দিন ঢাকা মেইলকে বলেন, মাদক সম্পৃক্ততায় প্রমাণিত আনসার সদস্যদের চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে। ফলে আনসার সদস্যরা এখন অনেক সুগঠিত। মাদক সম্পৃক্ততার মতো অভিযোগ এখন অনেকাংশে কমে গেছে আনসার সদস্যদের।
আইকে/জেবি




















