সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

ঢাকার ৫০ থানায় মাদকের বিস্তার, পুলিশের তালিকায় ৩৬৩ নাম

মোস্তফা ইমরুল কায়েস ও একে সালমান
প্রকাশিত: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৪৭ এএম

শেয়ার করুন:

ঢাকার ৫০ থানায় মাদকের বিস্তার, পুলিশের তালিকায় ৩৬৩ নাম
ছবি: ঢাকা মেইল।

সীমান্ত পেরিয়ে প্রতিদিনই রাজধানীতে ঢুকছে মাদকের চালান। শত শত কোটি টাকার এই অবৈধ কারবার ছড়িয়ে পড়েছে ঢাকার অলিগলি থেকে আবাসিক এলাকা, বস্তি, বাস-ট্রাক টার্মিনাল ও রেললাইন পর্যন্ত। মাদক নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত অভিযান চললেও থামানো যাচ্ছে না কারবার।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গোপন তালিকায় রাজধানীর মাদক পরিস্থিতির ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার ৫০টি থানায় মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ৩৬৩ জনকে শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের কেউ সরাসরি মাদক বিক্রির সঙ্গে জড়িত, কেউ সরবরাহের কাজ করে, আবার কেউ আড়ালে থেকে পুরো চক্রের অর্থ ও যোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ করে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে এসব কারবারির অনেকেই গ্রেফতার হলেও কিছুদিন পর জামিনে বেরিয়ে ফের জড়িয়ে পড়ছে একই ব্যবসায়। ফলে একদিকে যেমন বাড়ছে মাদকের বিস্তার বাড়ছে, অন্যদিকে নতুন নতুন এলাকায় তৈরি হচ্ছে কারবারিদের ‘শক্তিশালী নেটওয়ার্ক’।

জানা যায়, রাজধানীর বিভিন্ন আবাসিক এলাকা, বস্তি, বাস-ট্রাক স্টেশন ও রেললাইন এলাকায় মাদক কারবারিদের তৎপরতা বেশি। এসব এলাকায় স্থানীয় পর্যায়ের খুচরা বিক্রেতাদের পাশাপাশি রয়েছে মাদক সরবরাহ ও নিয়ন্ত্রণকারী চক্র। তাদের পেছনে রাজনৈতিক ছত্রছায়া থাকারও অভিযোগ রয়েছে। কোনো মাদক কারবারি গ্রেফতার হলে কিংবা মাদকের স্পটে বড় ধরনের অভিযান হলে তাদের ছাড়িয়ে নিতে রাজনৈতিক নেতাদের তৎপর হওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

মোবাইল ফোনের পাশাপাশি অনলাইন ও সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করেও চলছে মাদকের কেনাবেচা। ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী বিভিন্ন মাধ্যমে অর্ডার নেওয়ার পর নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে মাদক।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্ট সূত্রের দেওয়া তালিকা বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোহাম্মদপুর, যাত্রাবাড়ী, মিরপুর ও হাজারীবাগ এলাকায় মাদক কারবারের বিস্তার তুলনামূলক বেশি।

৫০ থানা এলাকায় কারা চালাচ্ছে মাদকের কারবার

রাজধানীর ৫০টি থানার মধ্যে মোহাম্মদপুর, যাত্রাবাড়ী, মিরপুর ও হাজারীবাগ এলাকায় মাদক কারবারের বিস্তার বেশি বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এসব এলাকার পাশাপাশি রাজধানীর বিভিন্ন থানায়ও মাদক বিক্রি ও সরবরাহের অভিযোগ রয়েছে।

তেজগাঁও বিভাগ

পুলিশের তালিকায় এই এলাকায় শীর্ষ মাদক কারবারি হিসেবে রয়েছে আরিফ ওরফে চাপা আরিফের নাম। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, তার মাধ্যমে মোহাম্মদপুরের বিভিন্ন এলাকায় হেরোইন ও ইয়াবা পৌঁছে দেওয়া হয়। এ কাজে তার স্ত্রী ও স্ত্রীর ভাই দামি গাড়ি ব্যবহার করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। পুরো পরিবার মিলে মাদক ব্যবসার একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

মোহাম্মদপুর জেনেভা ক্যাম্পের এক সময়ের শীর্ষ মাদক কারবারি সোহেল ওরফে বুনিয়া সোহেল এখন কারাগারে আছেন। তার পাশাপাশি, জেনেভা ক্যাম্পে মনু ওরফে গালকাটা মনু, পিচ্চি রাজা ও চুয়া সেলিমের ব্যবসা চলমান আছে বলে জানা গেছে। তাদের হয়ে মাঠপর্যায়ে মাদক পৌঁছে দেওয়ার কাজে জানে আলম, সারফু, আরমান, তাজ, আনোয়ার হোসেন কান্নু, জাবেদ ওরফে টিপুসহ কয়েকজন জড়িত বলে পুলিশের তালিকায় উল্লেখ রয়েছে।

আদাবর ও শেরে বাংলা এলাকা

‎আদাবর এলাকায় কাজী স্বপন ওরফে সিডি স্বপন, জনি ও স্বপন ওরফে গ্রিল স্বপনের নাম পুলিশের তালিকায় রয়েছে।

শেরে বাংলা এলাকায় সাগী আহম্মদ বাহার আলী, শুক্কুর ও কুলসুম ওরফে কুলসির নাম মাদক কারবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

উত্তরখান

এ এলাকায় আজিজ ওরফে আইজ্জা, রবিন বক্স, শেফালি, শাওন, আরমান, শিপন, অলীল মিয়া, শফিকুল ইসলাম, সুমন সরকার ও শাহ আলমের নাম রয়েছে পুলিশের তালিকায়।

‎এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) ইবনে মিজান বলেন, ‘মাদক রোধে আমরা তেজগাঁওয়ের বেশ কয়েকটি এলাকা চিহ্নিত করে সেখানে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি। মাদকপ্রবন এলাকাগুলোতে পুলিশের চেকপোস্টসহ নিয়মিত টহল বাড়ানো হয়েছে।

MADAK
তরুণদের মধ্যে মাদকের বিস্তার ও আসক্তি নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ।

‘‎এছাড়াও যেসব এলাকায় মাদক সেবন ও মাদক ব্যবসায়ীদের চলাচল বেশি; সে এলাকাগুলোতে আমরা র‍্যাব, পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা মিলে বড় পরিসরে অভিযান পরিচালনা করছি। মাদক নির্মূলে এলাকাভিত্তিক মাদক কারবারিদের তালিকা করে নিয়মিত অভিযান করে তাদের গ্রেফতার করছি।’‎

ইবনে মিজান আরও বলেন, ‘মাদক নির্মূল করতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। এ বিষয়ে আমাদের জিরো টলারেন্স নীতির নির্দেশনা রয়েছে। মাদকের নির্মূল আমরা কোনো ছাড় দিচ্ছি না। আশা করছি খুব শিগগিরই মাদক নির্মূল করতে পারব।’

গুলশান ও বাড্ডা এলাকা

গুলশান এলাকায় পুলিশের তালিকায় মাদক কারবারি হিসেবে হেনা বেগম, শাহাবুদ্দিন, মিলন, আল আমিন ওরফে ডিস আল আমিন, শুভ আহমেদ, তাওছিন আকন, আল আমিন, শামসুল হক ও শাহজাহান ওরফে সাজুর নাম রয়েছে।

বাড্ডা থানা এলাকায় জালাল উদ্দিন, তৌফিকুল ইসলাম অন্তর, মর্জিনা বেগম, কাওসার মোল্লা ওরফে কানা কাওসার, বিনা বেগম, সুমন ইসলাম, অলক চন্দ্র দাস, জুলহাস, হোসনা আক্তার, ফারুক হোসেন, বিল্লাল হোসেন ওরফে ভেলা ও আলাউদ্দিনের নাম আছে তালিকায়।

উত্তরা বিভাগ

দক্ষিণ খান এলাকায় ফরহাদ দেওয়ান, মাসুদ রানা বাবু ওরফে চাপতি বাবু, সাকিবুল হাসান সানি, মনির হোসন, শিমুল হোসেন, মনির হোসেন, আলতাফ হোসেন, আখতারুজ্জামান ছোটন ও মিজানের নাম তালিকায় রয়েছে।

উত্তরা পূর্ব থানা এলাকায় মোশারফ, হাবিবুর রহমান টুটুল, আলতাফ হোসেন ও মহসিন মিয়ার নাম আছে।

মিরপুর বিভাগ

ক্যান্টনমেন্ট থানা এলাকায় রুপচাঁন ওরফে রুপচাঁন খান, রুবেল ওরফে কসাই রুবেল ও জামাল মাদক কারবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হিসেবে পুলিশের তালিকায় রয়েছে।

মিরপুর এলাকায় সাইফুল ইসলাম পাখি, এবাদুল ইসলাম, বকুলী ওরফে পারুল, শাহজাহান আবেদীন লিটনসহ ৩০-৪০ জন মাদক কারবারি রয়েছে।

‎লালবাগ বিভাগ

হাজারীবাগ থানা এলাকায় সুমন, নিপা আক্তার ওরফে নিপুনি, সুমি, লাকি, আবুল কালাম, রোকসানা, মানিক, আসাদ মিয়া, সোনিয়া বেগম, মোমিন মিয়া, আজগর আলী, ফালান শিকদার, আব্দুস সামাদ, হযরত ওরফে বশির ও সালমা আক্তার সাথীর নাম রয়েছে মাদক কারবারির তালিকায়।

কামরাঙ্গীরচর এলাকায় মনির হোসেন, হাসি, আরমান, রমজান, ইয়াকুব আলী, খুরশিদা বেগম ওরফে খুশি, মোশারফ হোসেন, টুটুল হোসেন, দেলোয়ার, আব্দুর রহমান কালু, সিদ্দিক মিয়া ও রহমত উল্লাহর নাম আছে।

কোতয়ালি থানা এলাকায় মন্টি কুমার নাগ, পারুলী রানী, সাইফুল ইসলাম, শঙ্ভুনাথ শুর, মাইনুদ্দিন, আকরাম, আজিম, জীবন, সাজন প্রসাদ ও জিতু চন্দ্র দাসের নাম তালিকায় আছে।

চকবাজার এলাকায় লিটন, রতন প্রামানিক ওরফে চামারু রতন, আরমান হোসেন ওরফে ডানু, তারা মিয়া ও শাহিনের নাম রয়েছে।

লালবাগ এলাকায় মাদক কারবারি হিসেবে তুহিন, শাওন, স্বপন, রোজিনা আক্তার, বাবুল ওরফে টাইগার বাবুল, সোহেল রানা, শাকিল, মিজান, মামুন, পিপাস আরিফ, জুয়েল, হায়দার হোসেন, রোজিনা বেগম, খলিল, সাব্বির, মহিন, ইয়াসিন ও সজলের নাম জানা গেছে।

drug-3
নেশার অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছে অনেক সম্ভাবনাময় জীবন।

বংশাল এলাকায় হিরা মিয়া, টেক্কা ওরফে সুমন, রকি ওরফে বেরী রকি, কাওসার উদ্দিন মানিক, মনির হোসেন, বিল্লা হোসেন শাওন, আব্দুল রাব্বি আসিফ ওরফে মুরগি আসিফ, সাগর বেপারী, বাপ্পী ও পারভেজের নাম আছে তালিকায়।

লালবাগ বিভাগের ডিসি তালেবুর রহমান ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘আমরা মাদক ব্যবসায়ীদের একটি তালিকা করেছি। তাদের ধরতে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। মাদকসেবীদেরকেও ধরা হচ্ছে। মাদক ব্যবসা বন্ধে যা যা করার, আমরা তাই করছি।’

ওয়ারী বিভাগ

ডেমরা এলাকায় হৃদয় ওরফে পিচ্চি হৃদয়, সোহেল ওরফে পেটু সোহেল, সজিব, এমদাদুল হক, তালাত মাহমুদ সোহেল ওরফে কান্দি সোহেল, কামাল হোসেন, রবিউল ইসলাম, লিটন, শিশির খান, রফিকুল ইসলাম সুজন, টুটুল আলম ভূইয়া, ইয়াকুল আলী, জাকির হোসেন ও সোহেল সাউদের নাম তালিকায় রয়েছে।

যাত্রাবাড়ী এলাকায় ইয়াসিন আহমেদ সাকিব, আমির হোসেন, রতন মাদবর ওরফে চান্দি রতন, মাসুদ তালুকদার ওরফে দীপু, পিচ্ছি মাসুম, সোর্স রমজান, দেলোয়ার, সাকিব, আসমা, নাসিমা, জগ্গু, জজ মিয়া, তেরোসাদ্দাম, বুলেট রতন, আলীর বউ, আমির ও কামালের বউয়ের নাম রয়েছে।

শ্যামপুর এলাকায় কাজল ওরফে দিনার কাজল, মাসুম মিয়া, ও সোহেল ওরফে কসাই সোহেলের নাম জানা গেছে।

‎ওয়ারী এলাকায় লাবনী আক্তার, মেজবাহ আহমদ জিতু, নাসির উদ্দিন রনি, আল আমিন ওরফে মানিক, রিপন মিয়া ও শহিদুল ইসলাম মুক্তিসহ ১০-১৫ জন মাদক কারবারে জড়িত বলে জানা গেছে।

গেন্ডারিয়া এলাকায় রহিমা, মনিরুল হক রবিন, রানা ওরফে পিচ্চি রানাসহ ১৫-২০ জনের নাম আছে তালিকায়।

‎কদমতলী এলাকায় জুলহাস, বাপ্পারাজ ওরফে বাপ্পা, আবুল হোসেন কালু ও সেকান্দার আলীসহ ৮-১২ জনের মাদক ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট আছে।

মুগদা এলাকায় হিমেল, আনোয়ার হোসেন মিল্লাত, মঞ্জুর হোসেন নিজুসহ ১২-১৫ জনের মাদক ব্যবসায় জড়িত বলে জানা গেছে।

মতিঝিল বিভাগ

পল্টন এলাকায় চাঁদনি আক্তার, রুবিনা, পাখি, আকাশ হাওলাদারসহ ২০-২৫ জনের সক্রিয় গ্রুপ রয়েছে। মতিঝিল এলাকায় তানিয়া, সাকিল সিদ্দিক, হিরা, আমিন, শুক্কুর আলীসহ ১৮-২০ জনের একটি গ্রুপ মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ করে বলে জানা গেছে।

খিলগাঁও এলাকায় খালেদ মিয়া, বাবুল মোল্লা, মাইনউদ্দিন ও শাহজালালসহ ১০-১৫ জন মাদক কারবারে সক্রিয়।

শাহজাহানপুর এলাকায় হারিস মিয়া, আশরাফুল, সজল, শাওন চৌধূরী, শাহাবুদ্দিনসহ ১০-১৫ জন মাদক ব্যবসায় জড়িত বলে জানা গেছে।

রামপুরা এলাকায় হারজিনা, সজল হাওলাদার, ফাতেমা আক্তার ওরফে ফতেহ, সোহাগ প্রকাশ ওরফে পেন্ডি প্রকাশসহ ১৫-২০ জনের মাদক ব্যবসায় সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে।

সবুজবাগ এলাকায় চম্পা, মিলন, আশিকুর রহমান শান্ত, তানিয়া বেগমসহ ১০-১৫ জনের চক্র রয়েছে।

এ বিষয়ে বক্তব্য নিতে মতিঝিল বিভাগের ডিসি হারুন অর রশিদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। পরে তার মোবাইল ফোনে ক্ষুদে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

এমআইকে/একেএস/এমআর

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger

টাইমলাইন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর