সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

নতুন মাদকের নীরব বিস্তারে বদলে যাচ্ছে ‘নেশার বাজার’

একে সালমান
প্রকাশিত: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:০৮ এএম

শেয়ার করুন:

নতুন মাদকের নীরব বিস্তারে বদলে যাচ্ছে ‘নেশার বাজার’

ইয়াবা, ফেনসিডিল, গাঁজা ও হেরোইনের মতো পরিচিত মাদকের বাইরে বাংলাদেশে ধীরে ধীরে বিস্তৃত হচ্ছে নতুন ধরনের সিনথেটিক মাদকের বাজার। গত এক দশকের বেশি সময়ে একের পর এক নতুন মাদকের সন্ধান মিললেও সেগুলো শনাক্ত, উপাদান বিশ্লেষণ ও নিয়ন্ত্রণে চ্যালেঞ্জ বাড়ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সংশ্লিষ্টদের। মাদকের ধরন বদলের পাশাপাশি বদলেছে এর সরবরাহের কৌশলও।

নতুন নতুন মাদক বাজারে প্রবেশ করছে নানা পথে। অনেক ক্ষেত্রে এসব মাদক সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ শেষ হওয়ার আগেই তা ছড়িয়ে পড়ছে। সীমান্তপথের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক কুরিয়ার, ফরেন পোস্টাল ও আন্তর্জাতিক দ্রুত ডাকসেবা (ইএমএস) ব্যবহার করে বিদেশ থেকে মাদক দেশে ঢোকার প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে। ফলে চেনা মাদকের পাশাপাশি অচেনা মাদকের বিস্তার ঠেকাতে প্রচলিত নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার বাইরে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে সংশ্লিষ্টদের।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সংশ্লিষ্টদের সাম্প্রতিক অভিযানে ইয়াবার পাশাপাশি ক্রিস্টাল মেথ বা ‘আইস’, এলএসডি, ডিএমটিসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক উদ্ধারের ঘটনা সামনে এসেছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে বাংলাদেশে নতুন ১২ ধরনের মাদক আনুষ্ঠানিকভাবে শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ক্রিস্টাল মেথ বা ‘আইস’, এলএসডি, ডিএমটি, সাইলোসাইবিন ও এমডিএমএ উল্লেখযোগ্য।

বাংলাদেশের মাদকবাজারে আলোচিত নতুন সংযোজনগুলোর একটি ক্রিস্টাল মেথ বা ‘আইস’। মেথামফেটামিনজাত এ মাদক ইয়াবার তুলনায় আরও শক্তিশালী হিসেবে পরিচিত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সীমান্তপথে ইয়াবার পাশাপাশি ক্রিস্টাল মেথ উদ্ধারের ঘটনাও ঘটেছে।

অনলাইন-ডার্ক ওয়েবেও বাড়ছে সরবরাহ

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে অনলাইন, ডার্ক ওয়েব ও সামাজিক মাধ্যমভিত্তিক মাদকের সরবরাহও বেড়েছে। ২০১৯ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত নতুন ৯ ধরনের মাদকের বিক্রি ও চাহিদা এসব মাধ্যমে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর মধ্যে আইস, এলএসডি, ট্যাপেন্টাডল, কেটামিন, এমডিএমবি, ডিওবি ও এমডিএমএ উল্লেখযোগ্য।

তরুণ ও নারীদের মধ্যেও বাড়ছে নতুন মাদকের চাহিদা

কিশোর ও তরুণদের পাশাপাশি ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী নারীদের মধ্যেও এসব সিনথেটিক মাদকের চাহিদা বাড়ছে বলে সংশ্লিষ্টদের তথ্য থেকে জানা যায়।

বাংলাদেশে প্রথম সিনথেটিক মাদক হিসেবে ২০১১ সালে কেটামিন শনাক্ত করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর। আট বছর পর ২০১৯ সালে দেশে শনাক্ত হয় সিনথেটিক মাদক ‘আইস’।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, মালয়েশিয়া থেকে পড়াশোনা শেষে দেশে ফিরে এক যুবক নিজস্ব ল্যাবে এটি উৎপাদন শুরু করেন। ডার্ক ওয়েবের মাধ্যমে নাইজেরিয়ার এক নাগরিকের সহায়তায় তিনি এর ফর্মুলা সংগ্রহ করেছিলেন বলে জানা যায়।

একই বছর দেশে এলএসডির উপস্থিতিও শনাক্ত হয়। বিদেশি কুরিয়ারের মাধ্যমে এটি দেশে আসে। ডার্ক ওয়েব ব্যবহার করে বিটকয়েনের মাধ্যমে এর লেনদেন করা হতো বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

MADAK

২০২১ সালে ‘ডিওবি’ নামে আরেক সিনথেটিক মাদক শনাক্ত হয়। ডার্ক ওয়েবের মাধ্যমে ক্রিপ্টোকারেন্সিতে পোল্যান্ড থেকে এটি অর্ডার করা হয়েছিল। পরে আন্তর্জাতিক কুরিয়ারের মাধ্যমে তা দেশে আনা হয়।

২০২২ সালে আন্তর্জাতিক কুরিয়ারের মাধ্যমে উত্তর আমেরিকার একটি দেশ থেকে ‘এমডিএমএ’ মাদক দেশে আসে। ২০২৩ সালে ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেট অন্যান্য পণ্যের আড়ালে ভারত থেকে বিমানে করে দেশে আনা হয়। আর ২০২৫ সালে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর ‘এমডিএমবি’ নামে আরেক সিনথেটিক মাদক শনাক্ত করে। মালয়েশিয়া থেকে এক কারবারি অন্যান্য পণ্যের সঙ্গে এটি দেশে নিয়ে আসেন বলে সংস্থাটির তথ্য।

কুশসহ ছড়াচ্ছে নতুন ধরনের মাদক

সিনথেটিক মাদকের পাশাপাশি ২০২২ সালে ‘কুশ’ নামে নতুন ধরনের মাদকও শনাক্ত করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর। ক্যালিফোর্নিয়া থেকে আন্তর্জাতিক ডাকযোগে এক শিক্ষার্থী এটি দেশে নিয়ে আসেন বলে জানায় সংস্থাটি।

বিদেশ থেকে পড়াশোনা করে আসা কয়েকজনের নিজ বাড়িতে ল্যাব স্থাপন করে মাদক তৈরির প্রমাণও পাওয়ার কথা জানিয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর।

এ ছাড়া সেমি-সিনথেটিক মাদকের বিস্তারও রয়েছে দেশের বাজারে। ভারতের কিছু ল্যাবে উৎপাদিত এসব মাদক চোরাকারবারিদের মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। দেশের বিভিন্ন ফার্মেসি ও সীমান্তবর্তী এলাকায় এসব মাদক পাওয়ার তথ্য রয়েছে। এগুলো এসকপ সিরাপ, ফেয়ারডিল সিরাপ, উইনকোরেক্স সিরাপ, ব্রনোকফ-সি ও চকোপ্লাসসহ বিভিন্ন নামে বাজারজাত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

যেসব মাদকে সয়লাব বাজার

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে এখন পর্যন্ত ২৪ ধরনের মাদক উদ্ধারের তথ্য রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ইয়াবা, ফেনসিডিল, হেরোইন, গাঁজা, চোলাই মদ, দেশি মদ, বিদেশি মদ, বিয়ার, রেক্টিফাইড স্পিরিট, ডিনেচার্ড স্পিরিট, তাড়ি, প্যাথেডিন, বুপ্রেনরফিন (টি ডি জেসিক ইঞ্জেকশন), ভাং, কোডিন ট্যাবলেট, ফার্মেন্টেড ওয়াশ (জাওয়া), বুপ্রেনরফিন (বনোজেসিক ইঞ্জেকশন), মরফিন, আইচ পিল, ভায়াগ্রা, সানাগ্রা, টলুইন, পটাশিয়াম পারম্যাংগানেট ও মিথাইল-ইথাইল কিটোন।

‎প্রচলিত মাদকের বাইরে এলএসডি, ডিএমটি, কেটামিন, এমডিএমএ ও সাইলোসাইবিনের মতো মাদকের উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এসব মাদক তুলনামূলক ছোট পরিসর এবং ভিন্ন সরবরাহ ব্যবস্থার মাধ্যমে ছড়াচ্ছে। এসব মাদক তুলনামূলক ছোট পরিসরে এবং প্রচলিত মাদকের চেয়ে ভিন্ন সরবরাহব্যবস্থার মাধ্যমে ছড়াচ্ছে।

ডিএনসির মাদক উদ্ধারের তথ্য বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, প্রচলিত মাদকের পাশাপাশি ফেনইথাইলামিন (কোকেনের মতো দেখতে), এলএসডি (লাইসার্জিক অ্যাসিড ডাইথ্যালামাইড), ডায়মিথাইলট্রিপ্টামাইন বা ডিএমটি, ম্যাজিক মাশরুম এবং খাত (ইথিওপিয়ার উঁচু ভূমিতে জন্মানো এক ধরনের উদ্ভিদের পাতা), ‘কুশ’, ‘এক্সট্যাসি’, ‘হেম্প’, ‘মলি’র মতো বিভিন্ন মাদকও দেশে পাওয়া গেছে।

দেশের ৩২টি সীমান্তবর্তী জেলার বিভিন্ন অরক্ষিত সীমান্ত এলাকা দিয়ে হেরোইন, ইয়াবা, ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন প্রচলিত ও নতুন ধরনের মাদক দেশে প্রবেশ করছে বলে সংশ্লিষ্টদের তথ্য।

যা বলছেন বিশেষজ্ঞ

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ উমর ফারুক ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘মাদকের বাজার দ্রুত পরিবর্তিত হয়। একটি মাদক সম্পর্কে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তথ্য সংগ্রহ ও নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার আগেই নতুন কোনো মাদক বাজারে প্রবেশ করতে পারে। নতুন ধরনের মাদকের ক্ষেত্রে চিত্রটি আরও জটিল। বিভিন্ন প্রতিবেদনে এনক্রিপ্টেড যোগাযোগমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক কুরিয়ার ব্যবস্থার মাধ্যমে সরবরাহ চেইন পরিচালনার আশঙ্কার কথা উঠে এসেছে। ফলে শুধু সীমান্তে নজরদারি বাড়িয়ে এই বাজার নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।’

উমর ফারুক আরও বলেন, ‎‘মাদকের ধরন বদলাচ্ছে। বদলাচ্ছে সরবরাহ কৌশলও। মাদক নিয়ন্ত্রণ সংশ্লিষ্টদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে সিনথেটিক মাদকের দ্রুত বিস্তার। প্রচলিত গাঁজা, হেরোইন বা ফেনসিডিলের পাশাপাশি এখন এমন কিছু মাদক বাজারে আসছে, যেগুলোর নাম সাধারণ মানুষের কাছেই অনেকটা অপরিচিত। ফলে শুধু মাদক উদ্ধার ও গ্রেফতার নয়, অনলাইনভিত্তিক সরবরাহ ব্যবস্থা, অর্থের লেনদেন, কুরিয়ার নেটওয়ার্ক এবং সীমান্তপথের সমন্বিত নজরদারির ওপর জোর দেওয়ার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।’

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের এই অধ্যাপকের মতে, ‘মাদক বাজারের পরিবর্তনকে শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখলেই চলবে না। এর সঙ্গে জনস্বাস্থ্য, তরুণ সমাজ, পরিবার এবং সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়ও সরাসরি জড়িত। নতুন মাদক বাজারে ছড়িয়ে পড়ার আগেই শনাক্ত করা এবং সরবরাহ চেইন ভেঙে দেওয়া এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।’

‎একেএস/এমআর

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger

টাইমলাইন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর