- মাদকাসক্ত চালকের হাতে যাত্রীদের জীবন
- চালক নেশাগ্রস্ত কি না, জানেন না যাত্রী
- বেপরোয়া গতি, অসংলগ্ন আচরণের অভিযোগ
- রাতেই নেশাগ্রস্ত চালকের দৌরাত্ম্য বেশি
- দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ও বিশ্রামহীনতায় বাড়ছে ঝুঁকি
রাজধানীর ব্যস্ত সড়কে প্রতিদিন হাজারো অটোরিকশা বা ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল করছে। এসব যানবাহনের ওপর নির্ভর করে কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা গন্তব্যে ছুটছেন নগরবাসী। কিন্তু চালকের শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে তা যাচাইয়ের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই। ফলে মাদকাসক্ত বা নেশাগ্রস্ত অবস্থায় চালকের হাতে যাত্রীদের জীবন ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক ঘুরে দেখা গেছে, অটোরিকশা ও ব্যাটারিচালিত রিকশার চালকদের বড় একটি অংশ দীর্ঘ সময় যানজটে বসে থেকে ক্লান্ত অবস্থায় গাড়ি চালাচ্ছেন। এর মধ্যে কেউ কেউ মাদক সেবনের পরও গাড়ি চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে রাতের দিকে রাজধানীর বিভিন্ন আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকার আশপাশে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় চালকদের চলাচলের অভিযোগ বেশি শোনা যায়।
যাত্রীদের অভিযোগ, চালক নেশাগ্রস্ত কি না, তা বোঝার কোনো ব্যবস্থা নেই। অনেক সময় চালকের কথাবার্তা অসংলগ্ন হওয়া, অস্বাভাবিক দ্রুতগতিতে গাড়ি চালানো কিংবা বারবার নিয়ন্ত্রণ হারানোর মতো আচরণ দেখেও যাত্রীরা বাধ্য হয়ে গাড়িতে ওঠেন। কারণ, জরুরি প্রয়োজনে বিকল্প পরিবহন না থাকায় ঝুঁকি নিয়েই তাদের গন্তব্যে যেতে হয়।
রাজধানীর মুগদা এলাকার যাত্রী কামাল বলেন, ‘রিকশায় ওঠার পর অনেক সময় চালকের আচরণ দেখে অস্বাভাবিক মনে হয়। কিন্তু তখন মাঝপথে নেমে যাওয়াও সম্ভব হয় না। যাত্রী হিসেবে আমরা চালক মাদক নিয়েছেন কি না, সেটা বোঝার কোনো উপায়ও থাকে না।’
মতিঝিলে নিয়মিত যাতায়াতকারী আরেক যাত্রী বলেন, ‘কিছু চালক খুব দ্রুত গাড়ি চালান, আবার হঠাৎ ব্রেক করেন। চালক যদি নেশাগ্রস্ত থাকেন, তাহলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। চালকদের নিয়মিত পরীক্ষা করা দরকার।’
জানা গেছে, রাজধানীর বিভিন্ন রিকশা গ্যারেজের আশপাশেই বসে মাদকের আসর। চালকদের একটি অংশের দাবি, দীর্ঘ সময় গাড়ি চালানো, অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা, বিশ্রামের সুযোগের অভাব এবং আয় কমে যাওয়ার চাপ অনেক চালককে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে। আবার অনেক অটোরিকশা চালকের আয়ের বেশির ভাগই চলে যায় মাদকের পেছনে।
আরও পড়ুন: ঘরে বসেই অর্ডার, দরজায় পৌঁছে যাচ্ছে মাদক
তবে সবাইকে মাদকাসক্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে দাবি করছেন চালকদের অনেকে। রাজধানীর কমলাপুর এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে অটোরিকশা চালানো মানিক ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘আমরা সারাদিন পরিশ্রম করে গাড়ি চালাই। মাদক সেবন করে গাড়ি চালালে নিজের জীবনও ঝুঁকিতে পড়ে, যাত্রীদেরও বিপদ হয়। যারা নেশা করে গাড়ি চালায়, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। তবে সবাইকে একভাবে দেখা ঠিক নয়।’
নগরীতে দুর্ঘটনার অন্যতম বড় কারণ চালকের অসতর্কতা ও বেপরোয়া গাড়ি চালানো। এর সঙ্গে মাদকাসক্ত অবস্থায় গাড়ি চালানো যুক্ত হলে ঝুঁকি আরও বাড়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদক গ্রহণের পর চালকের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, মনোযোগ, প্রতিক্রিয়ার গতি ও গাড়ির নিয়ন্ত্রণ-সবকিছুই ব্যাহত হতে পারে। ব্যস্ত রাজধানীর সড়কে এমন অবস্থায় যান চালানো পথচারী ও যাত্রী উভয়ের জন্যই বিপজ্জনক।
এ বিষয়ে যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘মাদকের বিস্তার সারাদেশেই দেখা যাচ্ছে। পরিবহন সেক্টরকেও মাদক গিলে খাচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় অটোরিকশার চালকরাও মাদক গ্রহণ করছেন। এতে দুর্ঘটনা বাড়ছে। এক্ষেত্রে সরকারের কৌশল খুব একটা সবল না। যার কারণে এই সেক্টরটাকে মাদকমুক্ত করা যাচ্ছে। সরকার এই বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে দিন দিন দুর্ঘটনা বেড়েই চলবে।’
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অটোরিকশা ও ব্যাটারিচালিত রিকশার সংখ্যা বাড়লেও চালকদের স্বাস্থ্য ও সক্ষমতা যাচাইয়ের বিষয়টি ততটা গুরুত্ব পায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। চালকের লাইসেন্স, প্রশিক্ষণ ও মাদক গ্রহণের বিষয়টি নিয়মিত যাচাই করা না হলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমানো কঠিন। নগরবাসীর দাবি, যাত্রী পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত চালকদের নির্দিষ্ট সময় পরপর স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও মাদক পরীক্ষা করা দরকার। পাশাপাশি মাদকাসক্ত অবস্থায় গাড়ি চালানোর প্রমাণ মিললে চালকের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি পুনর্বাসনের উদ্যোগও প্রয়োজন।
রাজধানীর সড়কে প্রতিদিন লাখো মানুষ গণপরিবহন ও ছোট যানবাহনে চলাচল করেন। তাদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে শুধু যানবাহনের ফিটনেস নয়, চালকের শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতার বিষয়টিও সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখা জরুরি। কারণ, একটি অটোরিকশার হ্যান্ডেলে থাকা চালকের সামান্য ভুলই মুহূর্তে কেড়ে নিতে পারে যাত্রী কিংবা পথচারীর জীবন।
টিএই/জেবি











