সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

মাদকে সয়লাব কুমিল্লা, সীমান্তপথে ঢুকে ছড়াচ্ছে দেশজুড়ে

সাকলাইন যোবায়ের, কুমিল্লা 
প্রকাশিত: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৪০ পিএম

শেয়ার করুন:

মাদকে সয়লাব কুমিল্লা, সীমান্তপথে ঢুকে ছড়াচ্ছে দেশজুড়ে
কুমিল্লায় যেন হাত বাড়ালেই মিলছে মাদক। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

কুমিল্লায় যেন হাত বাড়ালেই মিলছে মাদক। সীমান্তবর্তী জেলা হওয়ায় ভারতের বিভিন্ন সীমান্তপথ দিয়ে সহজেই ঢুকছে ইয়াবা, গাঁজা, ট্যাপেনটাডল, ফেনাড্রিল ও স্কার্ফ সিরাপ, মদ-বিয়ারসহ নানা ধরনের মাদক। পরে এসব মাদক ছড়িয়ে পড়ছে কুমিল্লা শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত, এমনকি দেশের বিভিন্ন জেলায়। মাদকের সহজলভ্যতা ও আধিপত্যকে ঘিরে বাড়ছে অপরাধও

সম্প্রতি মাদকের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে নগরের কাটাবিল এলাকায় সংঘর্ষের ঘটনায় ষষ্ঠ শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর গায়ে গুলি লাগার ঘটনাও ঘটেছে। কুমিল্লার পাঁচ উপজেলার প্রায় অর্ধশত সীমান্ত পয়েন্ট এখন মাদক পাচারের করিডরে পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। সীমান্তবর্তী এলাকার সচেতন বাসিন্দাদের দাবি, এসব পয়েন্ট ব্যবহার করে প্রতিদিনই ভারত থেকে বিভিন্ন ধরনের মাদকের চালান দেশে প্রবেশ করছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়মিত অভিযান ও মাদক উদ্ধারের পরও বন্ধ হচ্ছে না এই প্রবেশ ও বিস্তার। ফলে মাদকের হটস্পট হিসেবে পরিচিতি পাওয়া কুমিল্লায় মাদক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন উদ্বেগ।

সম্প্রতি সরেজমিনে কুমিল্লার চকবাজার মদিনা বাসস্ট্যান্ড থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় গোলাবাড়ী সীমান্তবর্তী বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়ার কাছে গেলে মাদক কারবারের ভয়াবহ চিত্র পাওয়া যায়।

মাদকের ক্রেতা সেজে সিএনজিচালক সাকিব মিয়ার সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, ‘এই এলাকার যত দালানকোঠা দেখতাছেন, সবাই গুটি (ইয়াবা), ফেনসিডিল ব্যবসা কইরা করছে। এইহানকার (এখানের) বেশির ভাগ মাইনসে এই ব্যবসা করে। আপনেরা চাইলে আমি মাল দিতে পারমু। এক নম্বর ফেরেশ গুটি (ইয়াবা) মাল, ভাঙা ছাড়া নিলে দাম একটু বেশি পড়বো। আমনেরা যদি নেন, আগে অর্ধেক মালের টাকা দিতে হইব। আমনের মাল কই ফৌসাইয়া দিতে হইব।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা বললাম, আমাদের মাল ঢাকায় পৌঁছে দিতে হবে। জবাবে সে বললো, ঢাকা শহরে মাল ফৌসাইয়া দেওয়া যাইব। আগে অর্ধেক টাকা, পরে মাল ফৌসলে বাকি টাকা দিবেন। এইহানে মাল খাওয়েরও ব্যবস্থা আছে।’

শাহাপুর এলাকার একজন স্থানীয় বাসিন্দা নাম না করার শর্তে ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘বিজিবি, পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ম্যানেজ করে কুমিল্লার বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে মাদক সারাদেশে পৌঁছে যাচ্ছে। কুমিল্লার সব দিক দিয়ে ভারতের বর্ডার, তাই এখানে মাদক এতটা সহজলভ্য। প্রতি শুক্রবার কুমিল্লা শহর থেকে বাইক দিয়ে তরুণদের অনেকে বিয়ার ও মদ খেতে আসে।’   

অনুসন্ধানে জানা যায়, সীমান্তের একটি সংঘবদ্ধ চক্র নিখুঁত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এসব মাদকের চালান রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় পৌঁছে দিচ্ছে। কুমিল্লা সীমান্তের অদূরে ভারতের বিভিন্ন এলাকায় বাংলাদেশে পাচারের উদ্দেশ্যে মাদক উৎপাদনের একাধিক কারখানা গড়ে উঠেছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। এসব কারখানায় উৎপাদিত মাদক সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে কৌশলে বাংলাদেশে প্রবেশ করানো হচ্ছে বলে দাবি তাদের। মাদকের পাশাপাশি যৌন উত্তেজক বিভিন্ন পণ্য, ভারতীয় শাড়ি, থ্রি-পিস ও কসমেটিকসও সীমান্তপথে দেশে ঢুকছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, সীমান্তে ‘লাইনম্যান’ পরিচয়ে একটি চক্র সক্রিয় রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, সীমান্তের দুই পাশের কিছু অসাধু ব্যক্তিকে প্রভাবিত করে কাঁটাতারের বেড়া না থাকা বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে তারা মাদকের চালান বাংলাদেশে প্রবেশ করায়। পরে জেলার বিভিন্ন সিন্ডিকেটের চাহিদা অনুযায়ী এসব মাদক দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়।

অভিযোগ থাকা সীমান্ত পয়েন্টগুলোর মধ্যে ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার সালদানদী, শশীদল, আশাবাড়ি, নয়নপুর, তেতাভূমি, বাগরা, মধুপুর, আন্দিকোট, বিষ্ণুপুর, শারেংগাঁও ও গঙ্গানগর; বুড়িচং উপজেলার চড়নল, বাকশিমুল, মিরপুর, বারেশ্বর, শঙ্কুচাইল, রাজাপুর, হায়দ্রাবাদ নগর, শিবেরবাজার ও জামতলা; আদর্শ সদর উপজেলার বিবিরবাজার, বৌয়ারা, গোলাবাড়ি, শাহাপুর, অরণ্যপুর ও নিশ্চিন্তপুর এবং সদর দক্ষিণ উপজেলার একবালিয়া, তালপট্টি, সুবর্ণপুর, চৌয়ারা, যশপুর, শ্রীপুর, কনেশতলা, দড়িবটগ্রাম ও রাজেশপুর উল্লেখযোগ্য।

এ ছাড়া চৌদ্দগ্রাম উপজেলার গোমারবাড়ি, আমানগন্ডা, ছুপুয়া, জগন্নাথদীঘি, গোলপাশা, বসন্তপুর, সাতবাড়িয়া, পানপট্টি, তারাপুর, কাইচ্ছুটি, কোমারডোগা ও পদুয়া সীমান্ত পয়েন্টেও মাদক পাচারের অভিযোগ রয়েছে।

সদর উপজেলার সীমান্ত এলাকার সুবর্ণপুরের বাসিন্দা আবদুল কাইয়ুম ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘সীমান্ত দিয়ে নিয়মিত মাদক পারাপার হচ্ছে। সরকার আন্তরিক হলেও সীমান্তে কঠোর নজরদারি না থাকলে মাদকের প্রবাহ বন্ধ করা কঠিন হবে। কুমিল্লা সীমান্তজুড়ে মাদক কারবারিদের একটি বড় নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। মাদকের নতুন আইন অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।’

সম্প্রতি জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) গোপন সংবাদের ভিত্তিতে লবণের বস্তা বোঝাইকৃত একটি কাভার্ডভ্যানে অভিযান চালিয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করে। যার বাজার মূল্য আনুমানিক ৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা।

গত ১৭ আগস্ট গোপন সংবাদের ভিত্তিতে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা সদর উপজেলার জাগুরজুলি এলাকায় একটি প্রাডো গাড়িতে অভিযান চালিয়ে ৩ লাখ পিস ইয়াবাসহ ইয়াবাসহ দুজনকে আটক করে। যার বাজার মূল্য ১৫ কোটি টাকা বলে পুলিশ জানায়। 

তখন ওই এলাকার পৌঁছে জেলা পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান সাংবাদিকদের জানান, এত বড় ইয়াবার চালান কোথায় থেকে আনা হয়েছে তা রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের পর এ সম্পর্কে আপনাদের জানাতে পারব। আমরা এ চালানটির রুট লেভেল পর্যন্ত পৌঁছাতে চাই। 

গত ৩ সেপ্টেম্বর কুমিল্লা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শামসুল আলম শাহের কাছে ডিবির তিন মাসের মাদকের তথ্য জানতে চাইলে তিনি ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘আপনি আমাদের ক্রাইম বিভাগের সাথে আলোচনা করেন।’ 

মাদকের বিষয়ে জানতে চাইলে বিজিবি কুমিল্লা-১০ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মীর আলী এজাজ গত বৃহস্পতিবার ঢাকা মেইলকে জানান, গত তিন মাসে মাদকবিরোধী বিভিন্ন অভিযান পরিচালনা করে বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য জব্দ করেছে বিজিবি।

তিনি জানান, এ সময়ে ৬৩৪ বোতল বিদেশি মদ জব্দ করা হয়েছে, যার আনুমানিক বাজারমূল্য ৯ লাখ ৫১ হাজার টাকা। এ ছাড়া ১ হাজার ২৪৩ বোতল বিয়ার, যার বাজারমূল্য প্রায় ৩ লাখ ১০ হাজার ৭৫০ টাকা; ৬৬৩ দশমিক ২ কেজি গাঁজা, যার বাজারমূল্য প্রায় ২৩ লাখ ২১ হাজার ২০০ টাকা; ১০৮ বোতল স্কাফ সিরাপ, যার বাজারমূল্য প্রায় ৪৩ হাজার ২০০ টাকা; ৮ হাজার ৮৪ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট, যার বাজারমূল্য প্রায় ২৪ লাখ ২৫ হাজার ২০০ টাকা এবং ১ হাজার ২৬ পিস টাপেন্টাডল ট্যাবলেট, যার বাজারমূল্য প্রায় ২ লাখ ৫২ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে গত তিন মাসে বিজিবি কুমিল্লা-১০ ব্যাটালিয়ন আনুমানিক ৬২ লাখ ৫৬ হাজার ৫৫০ টাকা মূল্যের মাদকদ্রব্য জব্দ করেছে বলে জানান ব্যাটালিয়ন অধিনায়ক।

এদিকে মাদকবিরোধী অভিযানে র‍্যাবও তৎপর রয়েছে বলে জানিয়েছেন র‍্যাব-১১, সিপিসি কুমিল্লা-২-এর কোম্পানি অধিনায়ক মেজর সাদমান ইবনে আলম। বৃহস্পতিবার ঢাকা মেইলকে তিনি বলেন, ‘মাদকের ব্যাপারে র‍্যাব কুমিল্লায় অধিক তৎপর রয়েছে।’

তিনি জানান, গত তিন মাসে র‍্যাবের অভিযানে ৭০৫ কেজি গাঁজা, ২৬ হাজার ২৫৮ পিস ইয়াবা, ১৫০ বোতল স্কাফ, ১৬১ বোতল বা ১০৪ দশমিক ১ লিটার বিদেশি মদ, ২৬ লিটার দেশি মদ, ২৩২ বোতল বা ১১৬ লিটার বিয়ার এবং ৫ হাজার পিস টাপেন্টাডল ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়েছে।

তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত অভিযান ও বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধারের পরও কুমিল্লায় মাদকের সহজলভ্যতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) কুমিল্লার সভাপতি শাহ মোহাম্মদ আলমগীর খাঁন বলেন, ‘কুমিল্লায় মাদক হাতের নাগালে পাওয়া যাচ্ছে। শহর থেকে মাত্র ২৫ থেকে ৩০ টাকা ভাড়ায় সিএনজি অটোরিকশায় করে পাশের দেশ ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকায় যাওয়া যায়। তাই এখানে মাদকের সহজলভ্যতা বেশি।’

তিনি আরও বলেন, ‘তরুণ প্রজন্ম মাদকের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হচ্ছে। মাদকের সহজলভ্যতা বন্ধে সীমান্ত এলাকায় নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি তরুণদের সচেতন করার উদ্যোগও জোরদার করা প্রয়োজন।’

প্রতিনিধি/জেবি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger

টাইমলাইন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর