দেশে আবারও বাড়ছে সিনথেটিক মাদক কুশের প্রবেশ। থাইল্যান্ড থেকে আকাশপথে কুশ এনে দেশে নতুন করে এর বাজার তৈরির চেষ্টা করছে একটি চক্র। তাদের ঠেকাতে নড়েচড়ে বসেছেন গোয়েন্দারা। গত দুই মাসে ঢাকার আকাশপথে আসা প্রায় ২৯ কেজি কুশ জব্দ করা হয়েছে। এসব চালান থাইল্যান্ডে উৎপাদনের পর বাংলাদেশে আনা হচ্ছে বলে ধারণা করছেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
জানা গেছে, বাংলাদেশে কুশ প্রথম ধরা পড়ে ২০২২ সালে। এরপর ২০২৪ ও ২০২৫ সালে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ২৪ কেজি ৫৪ গ্রাম কুশ জব্দ করা হয়। সেগুলোও এসেছিল বিদেশ থেকে। আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে পাঠানো এসব চালানের গন্তব্য সম্পর্কে তখন তথ্য পেয়েছিলেন গোয়েন্দারা। পরে জানা যায়, অস্ট্রেলিয়া ও জাপানসহ বিভিন্ন দেশে পাঠানোর জন্য বাংলাদেশকে ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা করা হয়েছিল।
তবে এবার বিদেশে পাচারের পাশাপাশি দেশেও কুশ তৈরি বা উৎপাদনের প্রমাণ পেয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর। কুশ মূলত এক ধরনের গাঁজা। এর উৎপত্তিস্থল প্রাক্-সোভিয়েত আফগানিস্তান, পাকিস্তান, উত্তর ভারত ও তাজিকিস্তান বলে জানা যায়। তবে বিদেশ থেকে আসা কুশ ভিন্ন জাতের। কুশ সাধারণত তিন প্রজাতির- ওজি কুশ, বাব্বা কুশ ও বেগুনি কুশ। এর মধ্যে ওজি কুশকে সবচেয়ে ভয়ংকর হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অতিরিক্ত সেবনে আফ্রিকার সিয়েরা লিওনে প্রতিদিনই বহু মানুষের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়।
জানা গেছে, বাংলাদেশের মাদকবাজারে নতুন করে জায়গা করে নেওয়ার চেষ্টা করছে ‘কুশ’ নামের মাদক। অনেকের কাছে এখনো অপরিচিত এই মাদকটি নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে আইনশৃঙ্খলা ও মাদক নিয়ন্ত্রণ সংস্থাগুলোকে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের কর্মকর্তারা বলছেন, গত ১৬ দিনে থাইল্যান্ড থেকে কুশের চারটি চালান দেশে এসেছে, যার সবই জব্দ করা হয়েছে। তবে আকাশপথে থাইল্যান্ড থেকেই দেশে আসছে কুশের অধিকাংশ চালান। গত দুই মাসে প্রায় ২৯ কেজি কুশ জব্দ হয়েছে।
ভারতীয় নাগরিকদের মাধ্যমে ঢুকছে কুশ!
চলতি মাসের কয়েকটি ঘটনা বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে, এসব কুশ আসছে ভারতীয় নাগরিকদের হাত ধরে। যদিও সবাই এখনো ধরা পড়েনি। কয়েকজন আটকের পর বিষয়টি জানা গেছে।
গত ১৮ আগস্ট একই বিমানবন্দরে ৪ কেজি ১৮০ গ্রাম কুশ উদ্ধার করা হয়। ভারতীয় নাগরিক আকাশ দুবে ও আকাশ পাণ্ডে এনেছিলেন এসব মাদক। কিন্তু তারা ধরা পড়তে যাচ্ছেন বিষয়টি বুঝতে পেরে ট্রলি ও পাসপোর্টের ফটোকপি রেখে পালিয়ে যান। তাদের বিরুদ্ধেও বিমানবন্দর থানায় মামলা হয়েছে। তারপর গত ২২ আগস্ট ব্যাংকক থেকে থাই এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইটে আসা ভারতের কর্ণাটকের বাসিন্দা হুসাইন আবদুল কাদের শেখকে ৩ কেজি কুশসহ গ্রেফতার করা হয়। এর দুই দিন পর ২৪ আগস্ট একই বিমানবন্দরে ৫ কেজি ৪০ গ্রাম কুশসহ পশ্চিমবঙ্গের দুই নাগরিক সানোয়ার আলী ও ইমতিয়াজ আহমেদ গ্রেফতার হন। এর আগে ৬ আগস্ট সাতক্ষীরায় সীমান্তে ১২ কেজি কুশ জব্দ করে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।
সবশেষ গত ২৯ আগস্ট ৫ কেজি ১২০ গ্রাম কুশসহ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দুই বাসিন্দা ধরা পড়েন। তারা হলেন- আবদুল রহমান (৪৬) ও মোহাম্মদ ইকবাল আনসারি (৪৫)। তারা সেদিন ব্যাংকক থেকে থাই এয়ারওয়েজের টিজি-৩২১ ফ্লাইটে ঢাকায় আসেন। তারা দুজনই ট্রাভেল ব্যাগের ভেতরে এসব মাদক নিয়ে ঢাকায় ঢুকছিলেন। কিন্তু গ্রিন চ্যানেলে তারা আটক হয়ে যান। পরে তাদের নামে বিমানবন্দর থানায় একটি মামলা দায়ের করে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর।
গোয়েন্দারা বলছেন, চক্রটি থাইল্যান্ড থেকে এসব কুশ এনেছে। তারা আকাশপথে আনার পর তা সড়কপথে ভারতে নেওয়া কথা ছিল। কিন্তু এর আগেই ধরা পড়ে যায়। যারা আটক হয়েছেন তারা সবাই বাহক। তবে তারা আন্তর্জাতিক চোরাচালান চক্রের সদস্য।
কী বলছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর
গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, কুশের চালান শুরুর দিকে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে বাংলাদেশে আসত। তবে সম্প্রতি থাইল্যান্ড হয়ে এসব চালান দেশে ঢুকছে। এসব চালানের বাহক হিসেবে ভারতীয় নাগরিকদের ব্যবহার করছে আন্তর্জাতিক মাদক পাচার চক্র। সম্প্রতি কুশসহ দুই ভারতীয় নাগরিককে আটকের পর এমন তথ্য পাওয়া গেছে। এখন বাংলাদেশে এসব কুশ কেন আনা হচ্ছে, কারা এর পেছনে রয়েছে এবং এর সঙ্গে আর কারা জড়িত তা খতিয়ে দেখছেন গোয়েন্দারা।
এ বিষয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের ঢাকা মেট্রো (উত্তর)-এর সহকারী পরিচালক ড. মো. আবু সাঈদ মিয়া ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘সম্প্রতি আমরা যেসব কুশ জব্দ করেছি, সেগুলো থাইল্যান্ড থেকে এসেছে। এসব চালান যারা এনেছে, তারা ভারতীয় নাগরিক।’
হঠাৎ করে দেশে কুশের চালান বেড়ে যাওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সম্ভবত মাদক পাচারকারী কোনো চক্র বাংলাদেশে নতুন করে কুশের বাজার তৈরির চেষ্টা করছে। তবে তাদের মাধ্যমে বাংলাদেশে কারা এসব কুশ আনছে, তা জানার চেষ্টা চলছে। বিষয়টি তদন্তাধীন।’
দেশেও কুশ উৎপাদনের চেষ্টা!
চলতি বছরের জানুয়ারিতে ঢাকার ওয়ারীর একটি বাসায় অভিযান চালায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর (ডিএনসি)। অভিযানে ওই বাসায় কুশ চাষের জন্য তৈরি নিয়ন্ত্রিত পরিবেশের একটি ল্যাবের সন্ধান পান কর্মকর্তারা। এ ঘটনায় তৌসিফ হাসান (২২) নামে এক যুবককে গ্রেফতার করা হয়। পরে জিজ্ঞাসাবাদে তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় কুশ চাষের কৌশল শিখেছেন তিনি। দেশে ফিরে ওই বাসায় ল্যাব তৈরি করে কুশ উৎপাদন করছিলেন। সেখান থেকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আনা কুশের বীজ, গাছ ও সদ্য তোলা কুশ জব্দ করা হয়।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এসব কুশ মূলত তরুণ-তরুণীদের লক্ষ্য করে দেশে আনা হচ্ছে। তারাই এর সম্ভাব্য ক্রেতা ও সেবনকারী। কুশ অত্যন্ত শক্তিশালী ও ক্ষতিকর এক ধরনের সিনথেটিক বা কৃত্রিম মাদক, যা সাধারণ গাঁজা বা মারিজুয়ানার তুলনায় অনেক বেশি ক্ষতিকর বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
এমআইকে/জেবি






















