চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায় মাদকাসক্ত একমাত্র ছেলের এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাতে বৃদ্ধ বাবা স্বপন দাশ গুপ্ত (৬৫) ও মা কল্পনা দাশ (৫৫) নিহত হন। ঘটনার পর অভিযুক্ত ছেলে রিমন দাশ গুপ্তকে আটক করে পুলিশ। গত ২৫ জুলাই দুপুরে উপজেলার হাইলধর ইউনিয়নের পূর্ব গুজরা এলাকার চৈতন্য মহাজন বাড়িতে মর্মান্তিক এই ঘটনা ঘটে। এর আগে চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায় গভীর রাতে ঘরে ঢুকতে না দেওয়ায় ৭০ বছরের বৃদ্ধ পিতা মোহন ধরকে কুপিয়ে হত্যা করে মাদকাসক্ত পুত্র রিটন ধর।
নগরীর নন্দনকাননেও মাত্র একশ টাকার জন্য শিশুর গলায় ব্লেড দিয়ে পোচ মেরে হত্যাচেষ্টা করেন মো. হেলাল নামে এক মাদকাসক্ত কিশোর। কাজির দেউড়িতে রঞ্জন বড়ুয়ার প্রাণ যায় পুত্র রবিন বড়ুয়ার ছুরিকাঘাতে। কাট্টলীতে প্রতিবেশী সন্ধ্যা রাণীকে কুপিয়ে হত্যা করে মাদকাসক্ত সত্যজিৎ ঘোষ। চান্দগাঁও এলাকায় বড় ভাই সাজুর কাছে ১০টি ইয়াবা রেখে তা ফেরত না পেয়ে কুপিয়ে খুন করেন ছোট ভাই মুন্না।
সর্বনাশা নেশার ছোবলে ঘরে ঘরে তৈরি হচ্ছে রিটন ধর, মো. হেলাল, রবিন বড়ুয়া, সত্যজিৎ ঘোষ, মুন্নারা। তারা প্রিয়জনদের খুন করছে। সর্বনাশা মাদক এভাবে মা-বাবা-ভাই-স্ত্রীসহ পারিবারিক বন্ধন ছিন্ন করছে। নেশার ঘোরে বেঘোরে মানুষ মারছে মাদকাসক্তরা। পুড়িয়ে দিচ্ছে নিজের ঘরবাড়ি। পরিবার-সমাজে বাড়ছে অস্থিরতা। ছাড়খার হচ্ছে সংসার ও পরিবার।
বাড়ছে চুরি-ছিনতাই খুন-ধর্ষণসহ নানা অপরাধ
সিএমপির তথ্যমতে, চট্টগ্রামে চুরি-ছিনতাই, ডাকাতি, খুন-ধর্ষণের মতো যেসব অপরাধ প্রতিনিয়ত সংঘটিত হচ্ছে সেগুলোর বেশির ভাগই মাদকাসক্তের কারণে। মাদক কেনার জন্য কিশোর-যুবক থেকে পথশিশুরা পর্যন্ত চুরি-ছিনতাইয়ে লিপ্ত হচ্ছে।
সিএমপির সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে চট্টগ্রাম বিভাগে চুরি-ছিনতাই, ডাকাতি, খুন-ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধের সংখ্যা ছিল ৩৮৬টি। তবে মে ২০২৬-এ কিছুটা হ্রাস পেয়ে ৩৮০টি-তে নেমে আসে। বিগত ১৭ মাসে সিএমপিতে মাদকসংক্রান্ত মামলা দায়েরের হার প্রায় ৩৭.৪৮ শতাংশ কমেছে। কঠোর প্রশাসনিক নজরদারির কারণে এই প্রবণতা কমতির দিকে। সাম্প্রতিক অপরাধ পর্যালোচনাসংক্রান্ত এক বৈঠকে সিএমপি এই তথ্য প্রকাশ করেছে।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী এ প্রসঙ্গে বলেন, মহানগরী এবং জেলায় প্রতিনিয়তই মাদকাসক্তের হাতে স্বজন খুনের ঘটনা ঘটছে। ছিনতাই, ডাকাতি, দস্যুতার ঘটনায় জড়িতদের বিরাট অংশ মাদকাসক্ত। নেশার সাথে অপরাধের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। নেশাগ্রস্তরা নেশার টাকা জোগাতে খুন, ছিনতাইসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। মাদক ব্যবসার আধিপত্য বিস্তারেও চলছে খুনোখুনি, দাঙ্গা-হাঙ্গামা। নিয়মিত মাদকবিরোধী অভিযান চলছে। মাদক বহনকারীদের পাশাপাশি এর পেছনে যারা তাদেরও চিহ্নিত করার চেষ্টা করছে পুলিশ। তবে মাদকের ভয়াল আগ্রাসন প্রতিরোধ পুলিশের একার পক্ষে সম্ভব নয়।
সূত্র মতে, দেশে মাদকের শীর্ষে রয়েছে ইয়াবা ও ফেনসিডিল। ইয়াবার ট্রানজিট রুট এখন চট্টগ্রাম। বাংলাদেশকে টার্গেট করে মিয়ানমার সীমান্তে গড়ে উঠেছে ছোট বড় অসংখ্য কারখানা। সেখানে উৎপাদিত ইয়াবা ঠেলে দেওয়া হচ্ছে এদেশে। সাগর, সড়ক আর পাহাড়ি পথে ইয়াবার চালান আসছে। সরকারি তরফে ভারতীয় ফেনসিডিল কারখানা বন্ধ করা হয়েছে দাবি করা হলেও পরিস্থিতি তার উল্টো। কুমিল্লা ও ফেনী সীমান্ত হয়ে প্রতিদিনই ফেনসিডিলের চালান ঢুকছে চট্টগ্রামে।
র্যাব-পুলিশের অভিযানে প্রতিদিনই ধরা পড়ছে ইয়াবা, ফেনসিডিলের চালান। তবে উদ্ধার মাদকের অন্তত ১০ গুণ নিরাপদে চলে যাচ্ছে গন্তব্যে। নিত্যনতুন কৌশলে হচ্ছে মাদক পাচার। বিক্রি হচ্ছে চট্টগ্রাম মহানগরী এবং জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে। হাত বাড়ালেই মিলছে নেশা। আর তাতে বেড়েই চলেছে আসক্তের সংখ্যা। মাদকাসক্তির সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে অপরাধ। নিকট অতীতেও মহানগরীর বস্তি এলাকায় মাদকাসক্তদের উৎপাত দেখা যেত। এখন পল্লীগাঁয়েও মাদকাসক্তদের দাপট।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর চট্টগ্রাম জেলা কার্যালয় সহকারী পরিচালক রামেশ্বর দাস ঢাকা মেইলকে বলেন, চট্টগ্রাম মহানগরীর বিভিন্ন এলাকায় প্রকাশ্যে মাদকের হাট বসছে। মাদকাসক্তের সংখ্যা কয়েক লাখ। ইয়াবা ফেনসিডিল দুটোই সীমান্ত হয়ে আসছে। মাদকের উৎস বন্ধ করা না গেলে সর্বনাশ বন্ধ করা যাবে না। আর এজন্য সব সংস্থাকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর এবং র্যাব-পুলিশ মাঝে মধ্যে ওইসব এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানে কিছু মাদকসেবীকে জরিমানা করা হলেও সবকিছু চলে আগের মত। মাদকাসক্তদের সুপথে ফিরিয়ে আনারও তেমন উদ্যোগ নেই। মাদকাসক্তদের নিরাময়ে সরকারি একটি এবং বেসরকারি ১৬টি নিরাময় কেন্দ্র রয়েছে।
ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা কর্মসংস্থানের ওপর গুরুত্বারোপ
বিশিষ্ট সমাজ বিজ্ঞানী প্রফেসর ড. গাজী সালেহ উদ্দিন ঢাকা মেইলকে বলেন, হতদরিদ্রের বস্তি থেকে শুরু করে উচ্চবিত্তের সংসারে অশান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে সর্বনাশা ইয়াবা, ফেনসিডিল-ফেয়ারডিলসহ নানা ধরণের মাদক। মাদকের আগ্রাসন রোধে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান চলছে। কথিত বন্দুকযুদ্ধ, ক্রসফায়ারে মারা গেছে অসংখ্য মাদকের কারবারি। তবু ঠেকানো যাচ্ছে না মাদকের ভয়াল আগ্রাসন। বাড়ছে মাদকাসক্তের সংখ্যা।
এই সমাজ বিজ্ঞানী বলেন, পারিবারিক বন্ধন শিথিল, ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার অভাবে শিশু-কিশোরেরা বিপথে যাচ্ছে। দুর্নীতি এখন প্রকাশ্যে হচ্ছে। চাকরি পেতেও ঘুষ দিতে হচ্ছে। এতে যুবসমাজের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে। এ হতাশা থেকে অনেকে মাদকাসক্ত হচ্ছে। কিশোর গ্যাং কালচারের সাথে মাদক যুক্ত হওয়ায় কম বয়সে অনেকে আসক্ত হয়ে পড়ছে। আগামী প্রজন্মকে নেশার নীল ছোবল থেকে বাঁচাতে হলে পারিবারিক বন্ধন, নৈতিক মূল্যবোধের শিক্ষা এবং সামাজিক প্রতিরোধ আন্দোলনের কোনো বিকল্প নেই।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ইন্দ্রজিৎ কুন্ডু মাদকের বিস্তার সম্পর্কে বলেন, মাদকের সঙ্গে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় রাজনীতি ও অর্থনীতির গভীর সম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশে উন্নয়ন হলেও কর্মসংস্থান কম। এ কারণে বেকার যুবকেরা হতাশা ও বিচ্ছিন্নতা থেকে মাদকের প্রতি ঝুঁকছেন। ফলে বাংলাদেশ এখন মাদকের রমরমা বাজার। তাই কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে মাদকের লাগাম টেনে ধরতে হবে।
আইকে/জেবি

















