- লাগামহীন ভাড়া, অনেক ক্ষেত্রে দ্বিগুণ পর্যন্ত আদায়
- বাড়তি খরচের যুক্তি দিচ্ছেন পরিবহন মালিকরা
- বরিশাল রুটে ৫০০ টাকার ভাড়া বেড়ে ৯০০ টাকা
- কুমিল্লা, লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালী রুটেও অতিরিক্ত ভাড়া
- নির্ধারিত ভাড়াই নেওয়া হচ্ছে: দাবি সংশ্লিষ্টদের
পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে রাজধানীর সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ী ও ধোলাইরপাড় এলাকা এখন যেন বিশাল জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছে। নাড়ির টানে প্রিয়জনদের কাছে ফিরতে হাজারো মানুষ ছুটে আসছেন এই টার্মিনালগুলোতে। তবে ঘরমুখো এই মানুষের ঢল আনন্দের চেয়ে ভোগান্তিই বেশি বয়ে আনছে। অতিরিক্ত ভাড়া, তীব্র যানজট, বৃষ্টির কারণে কর্দমাক্ত পরিবেশ—সব মিলিয়ে দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ যাত্রীরা।
বিজ্ঞাপন
বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ) সকালে সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল, রেলক্রসিং, জনপথ মোড়, যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তা ও ধোলাইরপাড় এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিটি সড়কে যাত্রীদের উপচেপড়া ভিড়। বাস কাউন্টারের সামনে দীর্ঘ সারি, কেউ বসে আছেন ফুটপাতে, কেউ দাঁড়িয়ে আছেন ব্যাগ-লাগেজ নিয়ে। নির্দিষ্ট সময়েও বাস না আসায় অনেকেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন।
লাগামহীন ভাড়া, যাত্রীদের ক্ষোভ
ঈদকে কেন্দ্র করে দূরপাল্লার বাসগুলোতে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ এবারও স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। যাত্রীদের দাবি, অনেক ক্ষেত্রে নির্ধারিত ভাড়ার দ্বিগুণ পর্যন্ত টাকা নেওয়া হচ্ছে।
কুমিল্লাগামী যাত্রী রাহাতুল বলেন, স্বাভাবিক সময়ে ১০০-১৫০ টাকায় যাওয়া যায়। এখন ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা চাচ্ছে। বাধ্য হয়ে দিতে হচ্ছে, কারণ বিকল্প নেই।
বিজ্ঞাপন
মেডিকেল শিক্ষার্থী মুজাহিদুল ইসলাম বলেন, ৫৫০ টাকার টিকিট ৭০০ টাকায় কিনতে হয়েছে। আগের দামে কোনো টিকিটই পাওয়া যাচ্ছে না।
চাঁদপুরগামী কয়েকজন যাত্রী জানান, ২০০ টাকার ভাড়া বেড়ে ২৫০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। তাদের ভাষায়, ঈদ এলেই যেন ভাড়া বাড়ানো একটা নিয়ম হয়ে গেছে।
মালিকদের ব্যাখ্যা, বাস্তবে ভিন্ন চিত্র
অতিরিক্ত ভাড়ার অভিযোগ অস্বীকার করে পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা বলছেন, তারা সারা বছর নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে কম নেন। এখন কেবল সরকারি নির্ধারিত ভাড়াই নেওয়া হচ্ছে।

পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তারা অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগের বিষয় এড়িয়ে গেছেন। তারা বলছেন, সারা বছর নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে কম নেওয়া হয়, এখন নির্ধারিত ভাড়াই নেওয়া হচ্ছে।
এক পরিবহন কর্মী নাম প্রকাশ না করে বলেন, সরকারি ভাড়া ২৯০ টাকা। আমরা তার কাছাকাছিই নিচ্ছি। ঈদের সময় অনেক গাড়ি খালি ফিরে আসে, সেই খরচও ধরতে হয়।
তবে যাত্রীদের অভিযোগ, এই ব্যাখ্যার আড়ালে বাস্তবে অতিরিক্ত ভাড়াই আদায় করা হচ্ছে, যা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়ছে না।
জনপথ মোড়ে টিকিট বিক্রেতা জসিম উদ্দিন ঢাকা মেইলকে বলেন, যাত্রীচাপ অনেক বেশি। তবে গাড়িও আছে। আমরা চেষ্টা করছি পরিস্থিতি সামাল দিতে।
বরিশাল রুটে ভাড়া প্রায় দ্বিগুণ বৃদ্ধি
দক্ষিণাঞ্চলগামী যাত্রীদের দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি। বরিশাল রুটে বাস সংকটের সুযোগে লোকাল বাসগুলোই দূরপাল্লার যাত্রী বহন করছে বাড়তি ভাড়ায়।
ধোলাইরপাড়-পোস্তগোলা রুটের কিছু বাসে বরিশাল যেতে ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা নেওয়া হচ্ছে, যেখানে স্বাভাবিক সময়ে ভাড়া থাকে প্রায় ৫০০ টাকা।
বরিশালগামী যাত্রী আহমেদ সৈকত বলেন, ৬৫০ টাকার টিকিট এক হাজার টাকা পর্যন্ত চাচ্ছে। ঈদের বোনাস পাই, কিন্তু সেটা রাস্তাতেই শেষ হয়ে যাচ্ছে।
অন্যান্য রুটেও একই চিত্র। লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী ও কুমিল্লা রুটেও বাড়তি ভাড়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। লক্ষ্মীপুরগামী যাত্রী ওমর ফারুক বলেন, আগে ৫০০-৫৫০ টাকায় যাওয়া যেত, এখন ৭০০ টাকা দিতে হচ্ছে।
নোয়াখালীগামী রাব্বি হোসেন বলেন, পরিবার নিয়ে এসেছি। কাদা-পানি পেরিয়ে আসতেই কষ্ট হয়েছে, এখন আবার বেশি ভাড়া দিতে হচ্ছে। কিছু বলারও সুযোগ নেই।
শুধু দূরপাল্লার বাস নয়, স্থানীয় পরিবহনেও বেড়েছে ভাড়া। যাত্রী তাসলিমা আক্তার বলেন, অটোরিকশার ভাড়া ২০ টাকা থেকে ৩০ টাকা হয়ে গেছে। সব জায়গাতেই বাড়তি টাকা দিতে হচ্ছে।
বৃষ্টি-কাদা ও যানজটে বাড়ছে দুর্ভোগ
বুধবার রাতের ভারী বৃষ্টিতে সায়েদাবাদ ও আশপাশের টার্মিনাল এলাকায় পানি জমে কর্দমাক্ত অবস্থা তৈরি হয়েছে। এতে যাত্রীদের চলাচল আরও কষ্টকর হয়ে পড়েছে।

অনেককে মালপত্র কাঁধে নিয়ে কাদা এড়িয়ে চলতে দেখা গেছে। বাসে ওঠানামার সময়ও পা পিছলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
সায়েদাবাদ থেকে যাত্রাবাড়ী পর্যন্ত সড়কে দীর্ঘ যানজট দেখা গেছে। যাত্রীবাহী বাস, ব্যক্তিগত গাড়ি ও পণ্যবাহী ট্রাকের চাপে সড়ক প্রায় স্থবির হয়ে পড়ে। এতে নির্ধারিত সময়েও বাস চলাচল ব্যাহত হচ্ছে, ফলে যাত্রীদের অপেক্ষার সময় আরও দীর্ঘ হচ্ছে।
এদিকে শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখাসাপেক্ষে ঈদের দিন নির্ধারণ হবে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় চাঁদ দেখা গেলে শুক্রবার, না হলে শনিবার ঈদ উদযাপিত হবে। ফলে শেষ মুহূর্তে যাত্রীচাপ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কার্যকর নজরদারির দাবি
প্রতি বছর ঈদ এলেই একই চিত্রের পুনরাবৃত্তি ঘটছে বলে অভিযোগ যাত্রীদের। অতিরিক্ত ভাড়া, টিকিট সংকট ও অব্যবস্থাপনার কারণে তাদের ভোগান্তি চরমে পৌঁছায়।
যাত্রীরা বলছেন, শুধু কাগজে-কলমে নয়, মাঠপর্যায়ে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। ভাড়া নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ঈদযাত্রা সাধারণ মানুষের জন্য আরও কষ্টকর হয়ে উঠবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তারা।
এমআর/জেবি



































