সোমবার (৯ মার্চ) বেলা সাড়ে বারোটা। যাত্রীদের আনাগোনা একেবারেই নেই। ফলে রাজধানী মহাখালী বাস টার্মিনালের সিয়াম এন্টারপ্রাইজের কাউন্টারে অলস সময় পার করছেন কর্মীরা। ঢাকা-রৌমারী-ঢাকা রুটে চলাচল করা সিয়ামের কাউন্টার মাস্টার মোজাফ্ফর জানালেন, জ্বালানি তেল সংগ্রহ করতে পারছেন না। তাই তাদের বাসও ছাড়তে পারছে না।
মহাখালী থেকে ‘সেবা লাইন’ নামের কোম্পানির গাড়িগুলো ঢাকা-সিরাজগঞ্জ-ঢাকা রুটে চলাচল করে। এদিন পৌনে ১টার দিকে পরিবহন কোম্পানিটির কাউন্টারে গিয়ে কোনো কর্মী পাওয়া যায়নি। খোঁজাখুঁজির পর কাউন্টার ম্যানেজার মো. রাশেদকে পাওয়া যায় কাউন্টারের বাইরে। জানালেন, কিছু গাড়ি চললেও জ্বালানি তেল না পাওয়ায় তাদেরও বেশকিছু গাড়ি চলাচল বন্ধ আছে।
বিজ্ঞাপন
‘আপ/ডাউন করতে গাড়ির তেল লাগে ৮০ লিটার। আর পাম্প থেকে পাওয়া যাচ্ছে ৩০/৩৫ লিটার। এই তেল দিয়ে বাস চলাচল করা সম্ভব হচ্ছে না। তাই বন্ধ আছে’, বলেন রাশেদ।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিকভাবে জ্বালানি তেলের সরবরাহে বিরূপ প্রভাব পড়েছে। যার রেশ পড়েছে বাংলাদেশেও। আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে জ্বালানি সংকটের। এ কারণে ফিলিং স্টেশন থেকে তেল সরবরাহের সীমা বেঁধে দিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।
যদিও রাষ্ট্রীয় মালিকাধীন সংস্থাটি যে পরিমাণ জ্বালানি তেলের সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে, তার থেকেও অনেক কম জ্বালানি পাচ্ছে বলে অভিযোগ পরিবহন কোম্পানিগুলোর। আর সেই জ্বালানি সংগ্রহেও জটিলতা পোহাতে হচ্ছে বলেও জানায় তারা। এ কারণেই বাস চলাচল বন্ধ করে দিচ্ছে। এমনকি স্থগিত করছে ঈদযাত্রার টিকিটও।
বিজ্ঞাপন
ঈদযাত্রা নিয়ে দুশ্চিন্তা
মহাখালী বাস টার্মিনালের বিভিন্ন কোম্পানির কাউন্টার থেকে জ্বালানি সংকটে বাস চলাচল বন্ধ রাখার কথা জানিয়েছেন। পাশাপাশি আসন্ন ঈদযাত্রা নিয়েও আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অনেকেই জানিয়েছেন, তাদের অল্প কিছু বাসের ঈদযাত্রার টিকিট ছেড়েছেন। তবে বাকিগুলোর টিকিট ছাড়তে ‘ভয়’ পাচ্ছেন। কারণ যাত্রার সময় তেল সংকট হলে যাত্রীদের সঙ্গে বিরূপ পরিস্থিতি সৃষ্টির আশঙ্কা করছেন।
মহাখালী টার্মিনাল থেকে ঢাকা-সিলেট এবং ঢাকা-হবিগঞ্জ রুটে চলাচল করে বিলাস পরিবহনের বাস। সিলেট রুটে ৬০টি ও হবিগঞ্জ রুটে ১০টি গাড়ি আছে। এরমধ্যে ৩০টি এসি, যার মধ্যে ১২টি মার্সিটিজ বেঞ্জের গাড়ি রয়েছে। আর বাকিগুলো নন এসি গাড়ি। কোম্পানিটির ঈদের আগাম টিকিট বিক্রি শুরু হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে টিকিট বিক্রি স্থগিত রাখা হয়েছে।
জানতে চাইলে কাউন্টার ম্যানেজার মো. শিবলু ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘ঈদের টিকিট ছাড়া হয়েছে। কিন্তু তেল সংকটের ভয়ে বিক্রি করছি না। যদি তখন (যাত্রার সময়) তেল না থাকে।’
বিলাসের মতো একই পরিস্থিতি ‘একতা’ পরিবহনেরও। কোম্পানির গাড়ি ঢাকা থেকে বগুড়া ও নওগাঁ রুটে চলাচল করে। এসি ও নন এসি মিলে কোম্পানিটির ৫০/৬০টি বাস রয়েছে।
কাউন্টার মাস্টার মো. আবদুল্লাহ ঢাকা মেইল বলেন, ‘তেলের সংকটে কিছু গাড়ির টিকিট ছাড়া হয়েছে। যেগুলো ছাড়া হয়েছে সেগুলো এখন শেষ। অনেকেই টিকিটের জন্য আসছেন, কিন্তু তেলের পরিস্থিতির কারণে টিকিট দিচ্ছি না।’
জ্বালানি তেলের চলমান পরিস্থিতিতে এনা পরিবহনও তাদের টিকিট বিক্রি বন্ধ রেখেছে। ঢাকা-সিলেট রুটের কাউন্টার মাস্টার জিয়াউদ্দিন ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘টিকেট আছে। কিন্তু দিচ্ছি না, তেলের সংকটের কারণে।’
একই কথা জানান ঢাকা-রংপুর-কুড়িগ্রাম-ঠাকুরগাঁও-পঞ্চগড় রুটের কাউন্টার মাস্টার তুষারও। তিনি বলেন, ‘যদি সংকট নিরসন হয় তবে নতুন করে টিকিট ছাড়া হবে।’
ঢাকা থেকে গাইবান্ধা, রংপর, সৈয়দপুর, নীলফামারী, দিনাজপুর, লালমনিরহাট ও বুড়িমারী রুটের এসআর ট্রাভেলসের কাউন্টার মাস্টার মুকুল বলেন, ‘যেসব টিকেট ছাড়া হয়েছে, সেগুলোর সবই বিক্রি হয়ে গেছে।’
পরিবহন কোম্পানিগুলোর সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, জ্বালানি তেল নিয়ে প্রায় সবাই দুশ্চিন্তার মধ্যে রয়েছেন।
সেবা লাইনের কাউন্টার ম্যানেজার মো. রাশেদ বলেন, ‘আমাদের একটি গাড়ি এক জায়গা থেকে ৩০ লিটার ও অন্য জায়গা থেকে ৩৫ লিটার তেল নিয়ে চলাচল করছে। এই তেল সংগ্রহ করতে অনেক ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। যাত্রাপথে অনেক সময় চলে যাচ্ছে। এমন হলে কীভাবে বাস চলাচল করবে?’
কাউন্টার ম্যানেজার বলেন, ‘এখনই বাস ছাড়তে পারছি না। আর ঈদে কী হবে কে জানে। আমাদের ঈদের আগাম টিকিট অনলাইনে ছাড়া হয়েছিল। কাউন্টারেও বিক্রি করছিলাম। কিন্তু তেলের পরিস্থিতির কারণে বন্ধ রাখছি। এখন টিকিট বিক্রি করবো। পরে যাওয়ার সময় তেল থাকবে না। তখন যাত্রীদের সাথে ঝামেলা বাঁধবে। এতে কোম্পানির প্রতি খারাপ ধারণা হবে। তাই আমরা টিকিট বিক্রি স্থগিত রাখছি। অনলাইনেও স্থগিত আাছে।’
এএম/জেবি







