রোববার, ১০ মে, ২০২৬, ঢাকা

মা দিবস: যে মানুষটির অনুপস্থিতি আজও পুরো ঘরজুড়ে রয়ে গেছে

মহিউদ্দিন রাব্বানি
প্রকাশিত: ১০ মে ২০২৬, ০৭:২৭ পিএম

শেয়ার করুন:

মা দিবস: যে মানুষটির অনুপস্থিতি আজও পুরো ঘরজুড়ে রয়ে গেছে

আজ মা দিবস।  পৃথিবীর অনেক মানুষ আজ মায়ের হাত ধরে ছবি তুলবে, মাকে ফুল দেবে, একসঙ্গে সময় কাটাবে। আর আমি বসে আছি স্মৃতির ভেতর। এমন এক মানুষকে নিয়ে লিখতে, যাকে নিয়ে লিখতে গেলে শব্দ কম পড়ে যায়। কারণ মা শুধু একজন মানুষ ছিলেন না, তিনি ছিলেন পুরো একটা পৃথিবী।

আমার মা পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন ২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি, লিপ ইয়ারের সেই বিরল দিনে। কী অদ্ভুত নিয়তি! এমন এক দিনে তিনি চলে গেলেন, যে দিনটি প্রতিবছর ক্যালেন্ডারেও ফিরে আসে না। চার বছর পর পর আসে ২৯ ফেব্রুয়ারি, কিন্তু মায়ের শূন্যতা প্রতিদিনই ফিরে আসে। দিনের শেষে বুঝি, মানুষ হয়তো মৃত্যুর দিন ভুলে যেতে পারে, কিন্তু মায়ের অনুপস্থিতি ভুলে থাকা যায় না।


বিজ্ঞাপন


ছোট মেয়েটি একদিন হয়ে উঠেছিলেন বড় এক সংসারের কেন্দ্র: 
আমার মা ছিলেন তাঁর বাবার সংসারের সবচেয়ে ছোট সন্তান। ভাই-বোনদের খুব আদরের ছিলেন। ছোট মেয়েদের প্রতি বাবাদের আলাদা এক মায়া থাকে, আমার নানারও ছিল। তিনি অন্য মেয়েদের দূর-দূরান্তে বিয়ে দিলেও ছোট মেয়েকে গ্রামের কাছেই বিয়ে দিয়েছিলেন, যেন চোখের সামনে রাখতে পারেন, খোঁজ নিতে পারেন, দরকারে পাশে দাঁড়াতে পারেন। কিন্তু সময় কারও জন্য থেমে থাকে না।

একদিন নানা চলে গেলেন। তারপর নানিও। এরপর একে একে ভাই-বোনদের হারিয়ে আমার মা পৈতৃক দিক থেকে একেবারে একা হয়ে গেলেন। তখন তাঁর পৃথিবী হয়ে ওঠে তাঁর আট সন্তান—ছয় ছেলে, দুই মেয়ে। আর আমি সবার ছোট। আসলে মা শুধু সন্তান জন্ম দেন না, সন্তানদের মাঝেই নিজের ভাঙা পৃথিবীটাকে নতুন করে গড়ে তোলেন।

অল্প বয়সে বিয়ে, তারপর দায়িত্বের পাহাড়:
আম্মার যখন বিয়ে হয়, তখন তাঁর বয়স খুব বেশি ছিল না। কিন্তু বিয়ের পর তিনি যে সংসারে আসেন, সেটি ছিল বড় একান্নবর্তী পরিবার। আমার দাদা তখন আর বেঁচে ছিলেন না। ফলে পুরো পরিবারের দায়িত্ব এসে পড়ে আব্বার ওপর। আর আব্বার সেই দায়িত্বের বড় অংশ নিঃশব্দে নিজের কাঁধে তুলে নেন আমার মা। দাদী, কাকা, তিন ফুফুসহ বড় সংসার সামলানো সহজ ছিল না। আব্বা বাইরের দায়িত্ব পালন করতেন, আর আম্মা সামলাতেন ঘর, রান্না, আত্মীয়তা, অতিথি আপ্যায়ন, ধান-চালের কাজ, সংসারের অগণিত হিসাব।

পরে একে একে কাকা-ফুফুদের বিয়ে হয়ে আলাদা সংসার হয়েছে। কিন্তু ততদিনে আমাদের আট ভাইবোনের সংসার বড় হয়ে উঠেছে। সেই সংসারের চাপও তাঁকেই বহন করতে হয়েছে। এখন মনে হয়, আমাদের মায়েরা কখনও আলাদা করে “সংগ্রাম” শব্দটি উচ্চারণ করেন না। কিন্তু তাঁদের পুরো জীবনটাই আসলে সংগ্রামের আরেক নাম।


বিজ্ঞাপন


নিজের জন্য নয়, সবার জন্য বেঁচে থাকা এক নারী:
আমার মা নিজের জন্য খুব কমই ভাবতেন। এত কাজের ভিড়ে নিজের শরীরের প্রতিও যত্ন নেওয়ার সময় পাননি। আমরা যখন বড় হতে শুরু করেছি, তখন মনে হয়েছিল এবার হয়তো তিনি একটু বিশ্রাম নেবেন। কিন্তু ততদিনে শরীরে বাসা বেঁধেছে নানা রোগ। চিকিৎসকের নিষেধ, ওষুধ, নিয়ম-কানুন—সবকিছুর মাঝেও তাঁর ভাবনা ছিল পরিবারকে ঘিরে।

আমাদের কে কী করছে, কার কী প্রয়োজন, সংসারের কোথায় কী ঘাটতি, কার মন খারাপ, কার সমস্যা—সব তাঁর নখদর্পণে ছিল। আমাদের একে একে সবার বিয়ে হয়ে গেল। শুধু আমার বিয়েটাই বাকি ছিল। শেষ সময়টায় আমার ক্যারিয়ার আর বিয়ে নিয়ে তিনি খুব চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন। এখন মনে হয়, হয়তো তিনি ভেতরে ভেতরে বুঝতে পেরেছিলেন, তাঁর সময় ফুরিয়ে আসছে। তাই নিজের শেষ দায়িত্বটুকু শেষ করে যেতে চেয়েছিলেন।
অবশেষে আমার বিয়ে হলো। আম্মা খুব খুশি হয়েছিলেন। সেই হাসি এখনও চোখে ভাসে। কিন্তু সেই সুখ বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। বিয়ের ঠিক চল্লিশ দিনের মাথায় তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন।

জ্ঞানে তিনি ছিলেন অনেক বড় মানুষ:
আমার মা হয়তো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় খুব বেশি দূর এগোতে পারেননি, কিন্তু তাঁর জ্ঞানের গভীরতা ছিল বিস্ময়কর। একাডেমিক পড়াশোনা সীমিত হলেও শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল আজীবন। নিয়মিত পত্রিকা পড়তেন, ম্যাগাজিন পড়তেন, তাফসির-হাদিস অধ্যয়ন করতেন। ধর্ম, ইতিহাস, সাহিত্য ও রাজনীতি নিয়ে তাঁর জানাশোনা ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ।

আমার জীবনের প্রথম শিক্ষাগুরু ছিলেন আমার মা। আমার প্রাথমিক শিক্ষার হাতেখড়িও তাঁর হাত ধরেই। শুধু সাধারণ শিক্ষা নয়, তিনি আমাকে কুরআন পড়াও শিখিয়েছেন। ছোটবেলায় তাঁর পাশে বসে কুরআনের অক্ষর শেখার সেই মুহূর্তগুলো আজও স্পষ্ট মনে পড়ে। এখন বুঝি, একজন সন্তানের জীবনে এর চেয়ে বড় সৌভাগ্য খুব কমই আছে, যখন তার প্রথম শিক্ষক হন তার মা।

ছোটবেলায় তিনি আমাদের কুরআনের বিভিন্ন ঘটনা, নবীদের জীবনী, ইতিহাসের গল্প শুনাতেন। তাঁর গল্প বলার ভঙ্গিটা ছিল অসাধারণ। আমরা মুগ্ধ হয়ে শুনতাম।

আমি আমার দাদা-দাদী কিংবা নানা-নানিকে দেখিনি। কিন্তু তাঁদের অনেক স্মৃতি আমি চিনেছি আমার মায়ের গল্পের মধ্য দিয়ে। বিশেষ করে দাদীর গল্প তিনি খুব আবেগ নিয়ে বলতেন। ছোটবেলায় তিনি আমাকে এক সৎ বালকের গল্প শুনাতেন, যা আমি বারবার শুনেও ক্লান্ত হতাম না।

আজকের উপলব্ধি—গল্পগুলো শুধু গল্প ছিল না। ওগুলো ছিল চরিত্র গঠনের শিক্ষা।

ধর্মভীরুতা ছিল তাঁর জীবনের সৌন্দর্য:
আমার মা ছিলেন অত্যন্ত পরহেজগার একজন মানুষ। ফরজ-ওয়াজিবের পাশাপাশি নফল ইবাদতে তিনি ডুবে থাকতেন। তাহাজ্জুদ, নফল নামাজ, রোজা, দান-সাদাকা ছিল তাঁর নিত্যদিনের অভ্যাস। নামাজের ব্যাপারে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সচেতন। সুস্থ থাকাকালে আজানের অপেক্ষায় থাকতেন। যেন আজান শুনলেই তাঁর ভেতরে প্রশান্তি নেমে আসত। তিনি আমাদের সবসময় ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলার তাগিদ দিতেন। বিশেষ করে আমাকে বলতেন, মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়তে, অর্থসহ কুরআন বুঝে পড়তে, সৎভাবে জীবনযাপন করতে।

আজ বুঝি, একজন মা সন্তানের জন্য সবচেয়ে বড় সম্পদ হিসেবে রেখে যান তাঁর দোয়া আর শিক্ষা। 

মানুষের উপকার করাই ছিল তাঁর স্বভাব:
আমার মা ছিলেন অসাধারণ পরোপকারী একজন মানুষ। কোনো অভাবী মানুষকে কখনও খালি হাতে ফেরত দিতে দেখিনি। নিজের সামর্থ্য যতটুকুই থাকুক, কিছু না কিছু তিনি দিতেনই। আত্মীয়-স্বজন কিংবা প্রতিবেশীদের কেউ তাঁর আচরণে কষ্ট পেয়েছেন, এমন কথা কখনও শুনিনি। বরং তিনি সবসময় ভাবতেন, কার বিপদে কীভাবে পাশে দাঁড়ানো যায়। তিনি কম কথা বলতেন, কিন্তু খুব বুদ্ধি খাটিয়ে কথা বলতেন। সত্য কথা বলতে ভয় পেতেন না। অসত্য, গোঁজামিল, হিংসা, বিদ্বেষ কিংবা বদনাম তাঁর চরিত্রে ছিল না। এক কথায় তিনি ছিলেন এক সরল, মার্জিত, আত্মমর্যাদাসম্পন্ন বাঙালি মুসলিম নারী।

আব্বা-আম্মা: এক সংসারের দুই স্তম্ভ:
আমার মা সবসময় আব্বাকে যথেষ্ট সম্মান করতেন। অনুমতি ছাড়া কখনও বাড়ির সীমানা অতিক্রম করতেন না। আব্বাও সবসময় তাঁকে সহযোগিতা করেছেন, পাশে থেকেছেন। প্রায় পঞ্চাশ বছরের সংসারজীবনে দু’জন মানুষ একসঙ্গে অসংখ্য ঝড়-ঝাপটা সামলেছেন। সুখ-দুঃখ, অভাব-অনটন, বড় সংসারের দায়দায়িত্ব, সন্তানদের মানুষ করা, আত্মীয়তা রক্ষা—সবকিছু তাঁরা একসঙ্গে বহন করেছেন।

এত বড় সংসার আগলে রাখতে দু’জন মানুষ সমান তালে পরিশ্রম করেছেন। একজন বাইরে, আরেকজন ভেতরে। সংসার নামের এই বিশাল কাঠামো আসলে দু’জনের ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ আর ত্যাগের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল।  তখন বারবার মনে পড়ে কাজী নজরুল ইসলামের সেই চিরন্তন লাইন— “বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চিরকল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।”

হাসপাতালের সেই শেষ সাত দিন:
আমার মা এতটাই স্বাভাবিক ও সচল ছিলেন যে, তিনি এত দ্রুত চলে যাবেন, আমরা কেউ কল্পনাও করিনি। যদিও মৃত্যু কখনও সময় বলে আসে না। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শেষ এক সপ্তাহ যেন আজও চোখের সামনে ভাসে। ধীরে ধীরে তিনি মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, আর আমরা অসহায়ের মতো তাকিয়ে ছিলাম। আমাদের সৌভাগ্য হয়েছিল শেষ সময়ে তাঁর পাশে থাকার।

জীবনে তিনি অনেক কষ্ট করেছেন। কিন্তু আল্লাহ তাঁকে একটি সুন্দর মৃত্যু দিয়েছেন। মৃত্যুর আগে দীর্ঘদিন কাউকে কষ্ট দিতে হয়নি। ঘরে পড়ে থাকতে হয়নি। যতদিন বেঁচে ছিলেন, নিজের চলাফেরা নিজেই করতে পেরেছেন। ২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি, বৃহস্পতিবার রাত ১০টা ২০ মিনিটে তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন।

মা হারানো মানে কী, তা ভাষায় বলা যায় না:
মা চলে যাওয়ার পর বুঝেছি, পৃথিবীতে কিছু শূন্যতা আছে, যেগুলো কখনও পূরণ হয় না। মা হারানো মানে শুধু একজন মানুষকে হারানো নয়। মা হারানো মানে নিজের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় হারানো। একজন নির্ভেজাল শুভাকাঙ্ক্ষী হারানো। একজন নিঃস্বার্থ দোয়ার মানুষ হারানো। আল্লাহ আমার মাকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করুন। আমিন।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী 

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger

টাইমলাইন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর