রোববার, ১০ মে, ২০২৬, ঢাকা

সব ফুলের ‘সেরা’ ফুল ‘‌মা’

কাশেম বিন হুসাইন
প্রকাশিত: ১০ মে ২০২৬, ০৩:৪৮ পিএম

শেয়ার করুন:

সব ফুলের ‘সেরা’ ফুল ‘‌মা’

যুগ পাল্টেছে। স্মার্টফোন সবার হাতে হাতে। প্রায় প্রত্যেকেই মোবাইলে তাদের পছন্দের ভিডিও দেখে। আমিও দেখি। সাগরে জাহাজ চলা, ঢেউয়ের মোকাবেলা করে উত্তাল জলরাশিতে ডিঙি নৌকার টিকে থাকা দেখতে ভালো লাগে। একটা ভিডিওর পর আবার একই রকম আরেকটা ভিডিও আসলেও দেখি। এই স্রোতের মোকাবেলা করে জাহাজের এগিয়ে যাওয়ার সূত্র আমাদের জীবনের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

বিশাল ঢেউকে এসব নৌযানগুলো সরাসরি মোকাবেলা করে অথবা ঢেউয়ের সঙ্গে নিজেকে মিলিয়ে দেয়। এতে ঢেউ যত বড়ই হোক না কেন নৌকার কোনো ক্ষতি হয় না। বেঁচে যায় এর ওপর থাকা মানুষগুলোও। কিন্তু হাজার হাজার ঢেউয়ের কোনো একটা ঢেউও যদি সঠিকভাবে মোকাবেলা করা না যায়, তাহলে এর পরিণতি সহজেই অনুমেয়। তা হলো নৌকা ও এর সওয়ারীদের সলিল সমাধি।


বিজ্ঞাপন


আজকে বিশ্ব মা দিবস। কিন্তু আব্বু-আম্মুকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। একজনের কথা বলতে গেলেই আরেকজনের উপস্থিতি একেবারেই স্বাভাবিক।

আব্বু। স্বল্পশিক্ষিত কৃষক। কিশোর বয়স থেকেই ধরেছেন সংসারের হাল। ভাই-বোনদের সঙ্গে নিয়ে ও পরে নিজের সংসারের হাল ঠিক করতে কখনো নিজের আবার কখনো পরের জমিতে শ্রম দিয়ে পেরিয়েছেন এতটা পথ। পৃথিবীটা যদি সমুদ্র হয়, গোটা জীবনটা তাহলে একটি ডিঙি নৌকা। আর সেই নৌকার অত্যন্ত দক্ষ মাঝি আমার আব্বু, আমার আম্মু। তারা এতটাই দক্ষ যে, জীবনের একটি ঢেউও পরাজিত করতে পারেনি তাদেরকে। 

তারা যে পরাজিত হননি তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ আমরা। একবারের জন্যও পরাজিত হলে আমাদের সলিল সমাধি হতো নিশ্চিত। হয়তো বখাটে হতাম, না হয় মাদকের জালে আটকা পড়তাম বা কোনোরকমে শ্বাস প্রশ্বাস নিয়ে বেঁচে থাকতাম। গ্রামের অনেক মানুষের ক্ষেত্রেই এমন ঘটে।

নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার অনেকটা তীব্র ভাটা বা জোয়ারে উল্টো দিকে বওয়া নৌকার মতো। যেখানে সমস্ত শক্তি দিয়ে বৈঠা চালালেও তিন হাত সামনে গিয়ে দুই হাত পিছিয়ে আসে। তারপরও শক্তির সর্বোচ্চ দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছানোর চেষ্টা থাকে। এই গন্তব্য খুবই সামান্য। হয়তো তিন বেলা মোটামুটি খাবার, পরার মতো একটু কাপড় আর টিকে থাকা।


বিজ্ঞাপন


অবস্থা যাই থাকুক আব্বু-আম্মু আমাদের কখনো অভাবে রাখেননি। আমার পেট কখনো খালি থাকেনি। ক্ষুধার তীব্র যন্ত্রণা কখনও অনুভব করিনি। জীবনে যখন যেটুকু দরকার সেটুকু করতে কখনও পিছপা হননি। সাধ্যের মধ্যে নয়, সাধ্যের অনেক বাইরে গিয়েও তিনি করেছেন, এখনও করেন।

একেবারে অজপাড়া গাঁয়ে থাকার পরও আম্মু-আব্বু আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন সততার, দায়িত্বশীলতার, মানুষ হওয়ার। গ্রামের আর দশজনের মতো না হয়ে সন্তানকে সর্বোচ্চ শিক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। এটুকু জীবনে অনেক শিক্ষক ও মহান মানুষদের কথা শুনেছি। কিন্তু মানুষ হওয়ার শিক্ষা আমার স্বল্পশিক্ষিত আব্বু-আম্মু যেভাবে দিয়েছেন সেটিই গেঁথে আছে মনে।

প্রচণ্ড ব্যস্ততা আর সুযোগের অভাবে এখন প্রতিদিন কথাও হয়না আম্মু-আব্বুর সাথে। বিদেশ-বিভুইয়ে অনেকের মতো বাবা-মায়ের কথা প্রায় সারাক্ষণ মনে পড়ে। সামান্য কোনো ভিডিও দেখলেও চোখে জ্বল নেমে আসে। আমার যতটুকু তার সবটুকুই আমার আম্মু-আব্বু।

অন্য অনেকের মতো আমারও আম্মুকে বা আব্বুকে কখনও বলা হয়নি যে তাদের কত ভালোবাসি। হয়তো কখনও বলাও হবে না। তবে সৎ সন্তান হিসেবে পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে চাই। যতদিন আল্লাহ তৌফিক দেন জীবনের সর্বোচ্চটুকু দিয়ে আব্বুর জন্য করতে চাই। আম্মুর জন্য করতে চাই। আমার কাজ চেষ্টা করা। সেটিই করছি। নিশ্চয় চেষ্টা করলে মহামহিম রব নিরাশ করবেন না।

লেখক: শিক্ষার্থী, জাপান প্রবাসী

এনএম

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger

টাইমলাইন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর