রোববার, ১০ মে, ২০২৬, ঢাকা

বৃদ্ধাশ্রমে রেখে যাওয়া খোকার কি বিবেক নাড়া দেয় না?

মিরাজুল ইসলাম
প্রকাশিত: ১০ মে ২০২৬, ০২:১১ পিএম

শেয়ার করুন:

বৃদ্ধাশ্রমে রেখে যাওয়া খোকার কি বিবেক নাড়া দেয় না?

মা দিবস এলেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ভরে যায় মাকে নিয়ে আবেগঘন স্ট্যাটাস, ছবি আর ভালোবাসার কথায়। কেউ মায়ের হাত ধরে তোলা ছবি পোস্ট করেন, কেউ লেখেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষটির কথা। শহরের রেস্তোরাঁগুলোতে থাকে ‘মাদার্স ডে অফার’, টেলিভিশনে প্রচার হয় বিশেষ অনুষ্ঠান। সব মিলিয়ে একদিনের জন্য মায়েরা যেন বিশেষ সম্মান পান। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বছরের বাকি দিনগুলোতে সেই মায়েরা কেমন আছেন?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে চোখের সামনে ভেসে ওঠে বৃদ্ধাশ্রমের কোনো নিঃশব্দ বারান্দা। সেখানে হয়তো সাদা শাড়ি পরা এক মা চুপচাপ বসে আছেন। বিকেলের আলো ফুরিয়ে এলে তিনি গেটের দিকে তাকান। হয়তো ভাবেন, আজ ছেলে আসবে। হয়তো নাতির মুখটা দেখতে পাবেন। কিন্তু অপেক্ষা দীর্ঘ হয়, সন্ধ্যা নামে, তারপর রাত। কেউ আসে না।


বিজ্ঞাপন


একসময় আমাদের সমাজে বৃদ্ধাশ্রমের ধারণা খুব কম ছিল। বাবা-মা ছিলেন পরিবারের কেন্দ্রবিন্দু। সংসারের সিদ্ধান্ত থেকে শুরু করে সন্তানদের জীবনের প্রতিটি ধাপে তাদের উপস্থিতি ছিল দৃশ্যমান। কিন্তু সময় বদলেছে। নগরজীবনের ব্যস্ততা, অর্থনৈতিক চাপ, ছোট পরিবার এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক জীবনব্যবস্থা পারিবারিক সম্পর্কগুলোকে অনেকটাই দূরে সরিয়ে দিয়েছে। এখন অনেকের কাছে বাবা-মা দায়িত্বের চেয়ে বোঝা হয়ে উঠছেন।

সব সন্তান যে ইচ্ছা করে মাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠান, তা নয়। অনেক সময় বাস্তবতারও চাপ থাকে। কেউ বিদেশে থাকেন, কেউ চাকরির কারণে সারাদিন বাইরে থাকেন, কেউ অসুস্থ মায়ের প্রয়োজনীয় সেবা দিতে পারেন না। কিন্তু বাস্তবতার এই যুক্তিগুলোও একজন মায়ের নিঃসঙ্গতা কমাতে পারে না। কারণ মা শুধু খাবার বা ওষুধ চান না, তিনি চান সন্তানের সান্নিধ্য, একটু কথা, একটু সময়।

আরও পড়ুন

‘খুব অবাক লাগে, এই সভ্য সমাজে বৃদ্ধাশ্রম কীভাবে তৈরি হয়!’

সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, মা দিবসে যাদের নিয়ে এত আবেগ প্রকাশ করা হয়, তাদের অনেকেই বছরের অন্য সময়টাতে অবহেলার শিকার হন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘লাভ ইউ মা’ লিখে ছবি পোস্ট করা সহজ, কিন্তু মায়ের পাশে বসে তার একাকীত্বের গল্প শোনা অনেক কঠিন। আমরা দিন দিন প্রযুক্তির কাছে যতটা এগিয়ে যাচ্ছি, সম্পর্কের জায়গায় ততটাই পিছিয়ে পড়ছি।


বিজ্ঞাপন


একজন মা তার সন্তানের জন্য কী করেন, তার হিসাব কখনও শেষ করা যায় না। সন্তানের অসুখে নির্ঘুম রাত, নিজের স্বপ্ন বিসর্জন, শত কষ্ট লুকিয়ে মুখে হাসি রাখা, প্রতিদিনের অসংখ্য ত্যাগ—সবকিছুর পেছনেই থাকে নিঃস্বার্থ ভালোবাসা। সেই মা যখন বয়সের ভারে নুয়ে পড়েন, তখন তার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয় নিজের মানুষের কাছে থাকার। কিন্তু অনেক সময় তিনি হয়ে যান অপ্রয়োজনীয়।

Mother33
এখনো হাজারও মায়ের অবস্থান বৃদ্ধাশ্রমে। ছবি: সংগৃহীত

বৃদ্ধাশ্রম মানেই যে খারাপ জায়গা, তা নয়। অনেক বৃদ্ধাশ্রমে বয়স্ক মানুষদের যত্ন নেওয়া হয়, চিকিৎসা দেওয়া হয়, নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা হয়। কিন্তু কোনো বৃদ্ধাশ্রমই সন্তানের ভালোবাসার বিকল্প হতে পারে না। একজন মা হয়তো ভালো বিছানায় ঘুমাতে পারেন, নিয়মিত খাবারও পান, কিন্তু সন্তানের একটি ফোনকল বা পাশে বসে পাঁচ মিনিট কথা বলার যে শান্তি, তা কোনো প্রতিষ্ঠান দিতে পারে না।

সমাজ হিসেবে এখানেই আমাদের বড় সংকট। আমরা সাফল্যের পেছনে ছুটতে গিয়ে সম্পর্কের মূল্য ভুলে যাচ্ছি। বড় বাড়ি, দামি গাড়ি কিংবা উচ্চ পদ সবই অর্জন করা যায়, কিন্তু মা হারিয়ে গেলে সেই শূন্যতা আর কখনও পূরণ হয় না। পৃথিবীতে অনেক সম্পর্ক স্বার্থের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, কিন্তু মায়ের ভালোবাসা নিঃশর্ত। তাই এই মানুষটির প্রতি দায়িত্বও হওয়া উচিত নিঃস্বার্থ।

আরও পড়ুন

ভোলায় ৯০ বছর বয়সে পাঁচ সন্তানের মায়ের আশ্রয় গোয়াল ঘরে

মা দিবস শুধু ফুল দেওয়ার দিন নয়, এটি আত্মসমালোচনারও দিন। আমরা কি সত্যিই আমাদের মায়ের পাশে আছি? তার সঙ্গে নিয়মিত কথা বলি? তার নিঃসঙ্গতা বোঝার চেষ্টা করি? নাকি বছরে একদিন আবেগ দেখিয়ে দায়িত্ব শেষ মনে করি?

একজন মা সন্তানের ছোট্ট হাসির জন্য নিজের পুরো জীবন উৎসর্গ করতে পারেন। সেই মায়ের শেষ বয়স যেন অপেক্ষা আর নিঃসঙ্গতায় না কাটে, সেটি নিশ্চিত করা সন্তানের নৈতিক দায়িত্ব। কারণ বৃদ্ধাশ্রমের একটি ঘরে বসে থাকা প্রতিটি মায়ের চোখে হয়তো একই প্রশ্ন ঘুরে ফিরে আসে—‘যার জন্য সারাজীবন কাটালাম, সে আজ কোথায়?’

মা দিবসের প্রকৃত অর্থ তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন মায়েরা শুধু একটি দিনের ভালোবাসা নয়, সারা বছরের সম্মান, যত্ন ও সান্নিধ্য পাবেন।

লেখক: সহ সম্পাদক, ঢাকা মেইল

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger

টাইমলাইন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর