মাকে নিয়ে লিখতে গিয়ে আবিষ্কার করলাম কী লিখব তা যেন খুঁজেই পাচ্ছি না। আসলে আমার জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে মা এত গভীরভাবে জড়িয়ে আছে যে, তাকে নিয়ে আলাদা করে কিছু বলা কঠিন। আমার মা আমার জীবনের প্রথম শিক্ষক এবং পেশায়ও একজন শিক্ষক।
ছোটবেলায় মায়ের সাথে আমার সম্পর্কটা আজকের মতো এতটা সহজ ছিল না, বরং আমি আম্মুকে ভীষণ ভয় পেতাম। আম্মু অনেকটাই রাগী ছিল। পরীক্ষায় এক-দুই নম্বর কম পাওয়ার জন্যও যে একসময় কত বকা আর মার খেয়েছি, তার হিসাব নেই।
বিজ্ঞাপন
আম্মু সবসময় চাইত আমি যেন সবকিছুতে সমান পারদর্শী হয়ে উঠি, হোক তা পড়ালেখায়, কবিতা আবৃত্তি বা আঁকাআঁকিতে। ছোটবেলায় হয়তো সবকিছু ভালো লাগত না, কিন্তু আম্মুর আগ্রহেই আমি এসব শিখেছি, চর্চা করেছি, বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছি এবং অনেক পুরস্কারও পেয়েছি।
এখন বড় হওয়ার পর বুঝতে পারি, আম্মুর সেই কঠোরতাই আমার জীবনে ওষুধের মতো কাজ করেছে। হয়তো সেই কারণেই আজ আমি জীবনের এই অবস্থানে এসে দাঁড়াতে পেরেছি।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের সম্পর্কটাও বদলেছে। ছোটবেলার সেই ভয় বা দ্বিধা এখন আর কাজ করে না, এখন আম্মুর সাথে আমার সম্পর্ক অনেকটা বন্ধুর মতো। জীবনের ভালো-মন্দ, আনন্দ-কষ্ট সবকিছুই আমি তার সাথে নির্দ্বিধায় ভাগ করে নিতে পারি।
বিজ্ঞাপন

বড় হওয়ার পরে বুঝতে শিখেছি, আমার সেই রাগী আম্মুর জীবনের অনেকটা জুড়েই আছি শুধু আমি। আমার কী প্রয়োজন, কী খেতে ইচ্ছা করছে, কী ভালো লাগছে বা কী খারাপ লাগছে, মুখে বলার আগেই আম্মু বুঝে যায় সবসময়।
এলোমেলো স্বভাবের আমি ভার্সিটিতে যাওয়ার আগে তাড়াহুড়ো করে সব অগোছালো করে রেখে গেলেও, ফিরে এসে দেখি সব আগের মতো পরিপাটি করে সাজানো। খাবার টেবিলে ঠিকই আমার পছন্দের খাবার বা পিঠাটা তৈরি করে রাখা।
সংসার আর কর্মজীবনের এত ব্যস্ততার মাঝেও আম্মু কেমন করে যেন এই সবকিছুর জন্য সময় বের করে ফেলে! আর আমি যদি কোনো কাজে সাহায্য করতে যাই, তখনই আম্মুর কড়া নির্দেশ, “আমি এগুলো সব দেখছি, তুমি শুধু পড়াশোনা করো।”

এখনো গভীর রাতে দুঃস্বপ্ন দেখে ভয় পেয়ে জেগে উঠলে বা কারও কথায় খুব মন খারাপ হয়ে গেলে, আম্মুর কাছে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে বসে থাকি কিছুক্ষণ। তখন মনে হয় যেন জাদুর মতো সব ভয় আর মন খারাপ নিমেষেই উড়ে যায়।
পৃথিবীতে অনেকেই ভালোবাসতে পারে, কিন্তু আম্মুর মতো করে কেউ বুঝতে পারে কি? তাই দিনের শেষে আমার আম্মুর মুখে একটুখানি হাসি দেখলে মনটা অদ্ভুত শান্তিতে ভরে যায়। মনে হয়, জীবনটা সত্যিই সুন্দর।
লেখক: শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
এনএম





















