প্রতি বছর মে মাসের দ্বিতীয় রোববার বিশ্বজুড়ে পালিত হয় Mother’s Day—মায়ের প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানানোর দিন। কিন্তু ফুল, শুভেচ্ছা আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আবেগঘন পোস্টের আড়ালে একটি কঠিন বাস্তবতা লুকিয়ে থাকে—অসংখ্য মা আজও নির্যাতন, অবহেলা ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে জীবনযাপন করছেন।
অসহায় ও নির্যাতিত মায়েদের বাস্তবতা:
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা একটি গুরুতর সমস্যা। United Nations-এর বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যায়, জীবনের কোনো না কোনো সময়ে প্রতি ৩ জন নারীর মধ্যে ১ জন শারীরিক বা যৌন সহিংসতার শিকার হন। এদের বড় একটি অংশই মা।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে:
পারিবারিক সহিংসতা (স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির নির্যাতন) এখনো অন্যতম প্রধান সমস্যা।
অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা মায়েদের অনেক সময় নির্যাতনের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে বাধা দেয়।
তালাক, পরিত্যাগ বা স্বামীর মৃত্যু হলে বহু মা সন্তানসহ মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হন।
গ্রামাঞ্চলে সামাজিক লজ্জা ও আইনি জটিলতার কারণে অনেক নির্যাতনের ঘটনা প্রকাশই পায় না।
শিশুদের নিরাপত্তা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি একজন মায়ের নিরাপত্তাও সমান জরুরি—কারণ একজন মা নিরাপদ না হলে পরিবারও নিরাপদ নয়।
নির্যাতনের ধরন:
বিজ্ঞাপন
মায়েদের ওপর নির্যাতন কেবল শারীরিক নয়, বরং বহুমাত্রিক:
শারীরিক নির্যাতন
মানসিক ও মৌখিক নির্যাতন
অর্থনৈতিক বঞ্চনা
যৌন সহিংসতা
সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে রাখা
কেন এই পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে?
পিতৃতান্ত্রিক সামাজিক কাঠামো, নারীর আর্থিক স্বাধীনতার অভাব, আইনের যথাযথ প্রয়োগের ঘাটতি,
সামাজিক সচেতনতার অভাব, বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা।
মায়েদের নিরাপত্তায় সরকারের করণীয়:
মায়েদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিছু কার্যকর পদক্ষেপ হতে পারে—
১. আইনের কঠোর প্রয়োগ
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন বাস্তবায়নে কঠোরতা বাড়াতে হবে। দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে বিশেষ ট্রাইব্যুনালের কার্যকারিতা বাড়ানো জরুরি।
২. আশ্রয়কেন্দ্র ও সহায়তা সেবা বৃদ্ধি
প্রতিটি জেলায় নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র (Safe Shelter) স্থাপন এবং ২৪/৭ হেল্পলাইন কার্যকর করতে হবে।
৩. অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন
অসহায় মায়েদের জন্য ভাতা, কর্মসংস্থান ও ক্ষুদ্রঋণ সুবিধা বাড়াতে হবে, যাতে তারা নির্যাতনের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারেন।
৪. আইনি সহায়তা সহজীকরণ
বিনামূল্যে আইনি সহায়তা প্রদান ও আইনি প্রক্রিয়া সহজ করা জরুরি।
৫. সচেতনতা কার্যক্রম
স্কুল, কলেজ ও গণমাধ্যমে নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে সচেতনতামূলক কর্মসূচি জোরদার করতে হবে।
৬. স্থানীয় প্রশাসনের জবাবদিহিতা
ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে নারী নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটি সক্রিয় করতে হবে।
সমাজের ভূমিকা:
শুধু সরকারের ওপর দায় চাপিয়ে দিলে চলবে না। পরিবার, সমাজ ও নাগরিকদেরও এগিয়ে আসতে হবে।
নির্যাতনের ঘটনা দেখেও নীরব থাকা নয়, প্রতিবাদ করতে হবে। মায়েদের প্রতি সম্মান ও সহমর্মিতা গড়ে তুলতে হবে। নারীকে বোঝা নয়, সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
শেষ কথা, বিশ্ব মা দিবসে আমরা যদি শুধু শুভেচ্ছা জানিয়েই দায়িত্ব শেষ করি, তাহলে এই দিনটির প্রকৃত অর্থ হারিয়ে যাবে। একজন মা যেন নিরাপদে, সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে পারেন—এই নিশ্চয়তা দেওয়াই হওয়া উচিত আমাদের অঙ্গীকার।
মায়ের প্রতি ভালোবাসা শুধু একদিনের আবেগ নয়—এটি হওয়া উচিত প্রতিদিনের দায়িত্ব, প্রতিটি নীতির ভিত্তি এবং প্রতিটি রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার।
লেখক: সভাপতি, বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশন



















