রোববার, ১০ মে, ২০২৬, ঢাকা

কর্মজীবী মা, অফিস আর সংসারের ‘দুই যুদ্ধ’!

মুহা. তারিক আবেদীন ইমন
প্রকাশিত: ১০ মে ২০২৬, ০১:৪৮ পিএম

শেয়ার করুন:

mother
একসঙ্গে অফিস ও সংসার সামলাতে হয় কর্মজীবী মায়েদের। ছবি: এআই

সকাল ছয়টার আগেই ঘুম ভেঙে যায় সাবিনা ইয়াসমিনের। রান্নাঘরে গিয়ে নাস্তা তৈরি, সন্তানের টিফিন গুছিয়ে দেওয়া, স্কুল ড্রেস প্রস্তুত করা—সব কাজ শেষ করেই ছুটতে হয় অফিসে। দিনভর ব্যস্ততায় কাটানোর পর বাসায় ফিরেও থামে না দায়িত্ব। সন্তানের পড়াশোনা, রান্না, সংসারের খুঁটিনাটি—সব মিলিয়ে রাত শেষ হয় গভীর ক্লান্তিতে।

ঢাকার একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সাবিহার এই জীবনচিত্র আসলে দেশের অসংখ্য কর্মজীবী মায়ের প্রতিদিনের বাস্তবতা। অফিস আর সংসারের দুই প্রান্ত সামলাতে গিয়ে প্রতিনিয়ত এক অদৃশ্য চাপের ভেতর দিয়ে যেতে হয় তাদের। বাইরে পেশাদার দায়িত্ব, ভেতরে পরিবারের প্রত্যাশা—দুইয়ের ভারসাম্য রাখতে গিয়ে অনেক সময় নিজের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার কথাই ভুলে যান তারা।


বিজ্ঞাপন


বাংলাদেশে নারীদের কর্মসংস্থান আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। সরকারি-বেসরকারি চাকরি, ব্যাংক, করপোরেট প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে উদ্যোক্তা খাতেও নারীদের অংশগ্রহণ দৃশ্যমান। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের পরও সংসারের দায়িত্ব খুব একটা কমেনি। অধিকাংশ পরিবারে এখনো রান্না, সন্তান লালন-পালন কিংবা পরিবারের প্রবীণ সদস্যদের দেখভালের প্রধান দায়িত্ব নারীর ওপরই থেকে গেছে।

রাজধানীর মিরপুরের বাসিন্দা তানজিয়া বলেন, ‘অফিসে সারাদিন টার্গেট আর চাপ সামলাতে হয়। কিন্তু বাসায় ফিরে কেউ ভাবে না আমি ক্লান্ত। তখন আবার সন্তানের পড়াশোনা, রান্না, সংসারের দায়িত্ব শুরু হয়।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কর্মজীবী নারীদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ‘ডাবল শিফট’। অফিস শেষে বাসায় ফিরে আবার গৃহস্থালির কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়তে হয়। ফলে বিশ্রাম বা নিজের জন্য আলাদা সময় খুব কমই পান তারা।

সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, সামাজিক মানসিকতার কারণেই এই চাপ তৈরি হচ্ছে। এখনো অনেক পরিবারে চাকরি করলেও সংসারের পুরো দায়িত্ব নারীর ওপর বর্তায়। একজন পুরুষ অফিস শেষে বিশ্রাম নিতে পারলেও একজন কর্মজীবী মায়ের জন্য বাসায় ফেরার পর শুরু হয় দ্বিতীয় কর্মদিবস।


বিজ্ঞাপন


রাজধানীর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সামিয়া রহমান ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘একদিকে ক্লাস, গবেষণা, মিটিং—অন্যদিকে সন্তানের দায়িত্ব। দুই জায়গাতেই শতভাগ দেওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে মানসিক চাপ তৈরি হয়।’

আরও পড়ুন

কম বয়সী মা বনাম বয়স্ক মায়ের প্রতি ভালোবাসার ভিন্নতা

মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কর্মজীবী মায়েদের একটি বড় অংশ অপরাধবোধে ভোগেন। অফিসে বেশি সময় দিলে মনে হয় সন্তানকে সময় দেওয়া হচ্ছে না, আবার সংসারে সময় দিলে মনে হয় ক্যারিয়ারে পিছিয়ে পড়ছেন। দীর্ঘদিন এই চাপ চলতে থাকলে উদ্বেগ, হতাশা, অনিদ্রা ও শারীরিক নানা জটিলতা তৈরি হতে পারে। তবে সব চ্যালেঞ্জের মধ্যেও অনেক নারী নিজেদের কর্মজীবন চালিয়ে যাচ্ছেন দৃঢ়ভাবে। তাদের মতে, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা শুধু ব্যক্তিগত পরিচয় নয়, পরিবারের নিরাপত্তা ও সন্তানের ভবিষ্যতের সঙ্গেও জড়িত।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কর্মজীবী নারীদের জন্য পরিবারে সহযোগিতামূলক পরিবেশ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। স্বামী, পরিবারের অন্য সদস্য কিংবা কর্মক্ষেত্রের সহকর্মীদের সহযোগিতা থাকলে চাপ অনেকটাই কমে আসে।

বর্তমানে কিছু প্রতিষ্ঠান মাতৃত্বকালীন ছুটি, নমনীয় কর্মঘণ্টা বা ডে-কেয়ার সুবিধা চালু করলেও অধিকাংশ নারী এখনো এসব সুবিধার বাইরে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের কর্মজীবী নারীদের পরিস্থিতি আরও কঠিন। শ্রম অধিকারকর্মীরা বলছেন, অনেক কর্মজীবী মা সন্তানকে প্রতিবেশী বা আত্মীয়ের কাছে রেখে কাজে যেতে বাধ্য হন। এতে সারাদিন মানসিক অস্থিরতায় থাকতে হয়। আবার সন্তান লালন-পালন, বাসা ভাড়া, চিকিৎসা ও শিক্ষার ব্যয় সামলাতে গিয়ে তাদের জীবন হয়ে ওঠে আরও কঠিন।

Mother2

বাংলাদেশ শ্রম আইন অনুযায়ী নির্দিষ্টসংখ্যক নারী কর্মী থাকলে প্রতিষ্ঠানে ডে-কেয়ার সুবিধা রাখার কথা থাকলেও বাস্তবে অনেক প্রতিষ্ঠান তা মানছে না। ফলে সন্তান সামলানোর বিষয়টি কর্মজীবী নারীদের জন্য বড় সংকটে পরিণত হচ্ছে।

অন্যদিকে প্রযুক্তির বিস্তার কাজের চাপ আরও বাড়িয়েছে। মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটের কারণে এখন অফিসের কাজ বাসা পর্যন্ত চলে আসে। অনেক কর্মজীবী মাকে রাতেও অফিসের মেইল, অনলাইন মিটিং বা জরুরি কাজ সামলাতে হয়।

আরও পড়ুন

আমার আম্মু: স্নেহের নীড় ও অমলিন স্মৃতি

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কর্মজীবী মায়েদের শুধু ‘সব সামলে নেওয়া নারী’ হিসেবে দেখলে হবে না, তাদের বাস্তব সমস্যাগুলোকেও গুরুত্ব দিতে হবে। শিশুসেবা কেন্দ্র বাড়ানো, নিরাপদ গণপরিবহন নিশ্চিত করা, নমনীয় কর্মঘণ্টা চালু করা এবং পিতৃত্বকালীন ছুটি কার্যকর করা গেলে কর্মজীবী মায়েদের চাপ অনেকটাই কমবে।

মা দিবসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মায়েদের নিয়ে আবেগঘন নানা পোস্ট দেখা যায়। কিন্তু বাস্তবে একজন কর্মজীবী মায়ের প্রতিদিনের জীবন অনেক বেশি কঠিন ও পরিশ্রমের। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত দায়িত্বের চক্রে ঘুরতে ঘুরতে তারা প্রায়ই নিজের ক্লান্তি ও ব্যক্তিগত চাওয়াগুলো আড়াল করে রাখেন।

তারপরও পরদিন ভোরে আবার ঘুম ভাঙে তাদের। সন্তানের স্কুল, অফিসের মিটিং, সংসারের হিসাব—সবকিছু গুছিয়ে নতুন দিনের লড়াই শুরু করেন তারা। কারণ, কর্মজীবী একজন মা শুধু পরিবারের আয় বাড়ান না, তিনি একই সঙ্গে একটি পরিবার, একটি ভবিষ্যৎ এবং একটি সমাজকেও এগিয়ে নেন।

টিএই/জেবি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger

টাইমলাইন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর