ঈদ মানেই খুশি, ঈদ মানেই আনন্দ। ঈদকে সামনে রেখে ঘুরতে পারেন নোয়াখালীর বিভিন্ন পর্যটন স্পটে। এতে ঈদের ছুটির আনন্দকে বাড়িয়ে তুলতে পারেন আরও বেশি। তাই হয়ত ভাবছেন কীভাবে ঘুরবেন, কোথায় ঘুরবেন, এ নিয়ে ভাবনার শেষ নেই। এই সময়টায় একটু আরাম করে ঘুরে বেড়ানোর মতো জায়গা খুঁজে পাওয়া একটু কঠিন। তাই তো বেছে নিতে পারেন এমন কিছু দর্শনীয় স্থান, যাতে নেই ভিড়ের আনাগোনা— তবে সৌন্দর্য আর উপভোগের উপাদানের কমতি নেই এক বিন্দু। ভিড়কে ফাঁকি দিয়ে ঈদের ছুটি কাটাতে বেছে নিতে পারেন নোয়াখালীর এই দর্শনীয় স্থানগুলো।
বিজ্ঞাপন
লালচর
নোয়াখালীর একমাত্র বিচ্ছিন্ন দ্বীপ হাতিয়া উপজেলার বুড়িরচর ইউনিয়নে বঙ্গোপসাগরের কূল ঘেষে জেগে উঠেছে একটি চর। গত দুই বছর আগেও এ চরটি ছিল জনমানব শূন্য। কেওড়া বাগান আর নানান রকমের গাছ গাছালিতে ভরা ছিল এ চরটি। ২০২১ সালের শীত মৌসুমে এ চরটিতে সৃষ্টি হয় বিশাল এক সমুদ্র সৈকত, স্থানীয়দের মতে, মূলত লাল কাঁকড়া থেকে লাল চর নামকরণ। এই সৈকতের (বিচ) আয়তন প্রায় ১০কিলোমিটারেরও বেশি। গত বছরের প্রথম থেকে এ দীর্ঘ সৈকতটি দেখতে হাতিয়াসহ জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে আসে পর্যটক ও ভ্রমণ প্রিপাসু। বর্তমানে এ সৈকত ঘিরে তৈরি হয়েছে পর্যটনের এক অপার সম্ভবনা।
নিমতলী সি-বিচ
বিজ্ঞাপন
জনবসতির পরই বিস্তীর্ণ খোলা মাঠ। মাঠের মাঝখান দিয়ে সরু রাস্তা। গাড়িতে ২০ মিনিট যাওয়ার পর মিলবে সবুজ কেওড়া বাগান। বাগানের পরই নদীর কোল ঘেঁষে বিশাল সমুদ্র সৈকত। নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার জাহাজমারা ইউনিয়নের বিরিবিরি গ্রামের পূর্বপাশে বেড়িবাঁধের বাইরে এর অবস্থান।স্থানীয়দের কাছে এটি নিমতলী সি-বিচ নামে পরিচিত। তিন বছর আগে জায়গাটি ছিল জনমানবহীন। তবে এখন দর্শনার্থীদের পদচারণে থাকে মুখর। প্রতিদিনই দর্শনার্থীরা ছুটে আসেন এখানে। ২০১৯ সাল থেকে এ সমুদ্রসৈকতে দর্শনার্থীদের পদচারণ শুরু হয়।
যেভাবে যাওয়া যাবে- ওছখালী বাজার থেকে জাহাজমারা বাজার পর্যন্ত সিএনজি অটোরিকশা দিয়ে গিয়ে এরপর জাহাজমারা বাজার থেকে শুধু মোটরসাইকেল করে যেতে হবে। তবে ইদানীং সিএনজিতেও যাওয়া যায়।
কমলা দিঘী
হাতিয়ার চরঈশ্বর ইউনিয়নের পূর্ব পাশে বেড়িবাঁধের বাইরে এই সমুদ্রসৈকতের অবস্থান। উপজেলা সদর থেকে পাকা রাস্তায় পাঁচ-ছয় কিলোমিটারের দূরত্ব হওয়ায় অনেকে আসছেন এখানে। গণপরিবহন চলাচল না করায় সবাই ব্যক্তিগত গাড়ি আর স্থানীয় সিএনজিতে এই সমুদ্রসৈকতে যাতায়াত করেন। দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে এই স্থানে দর্শনার্থীদের পদচারণা। এখানে মানুষের তৈরি বিনোদনের কোনো ব্যবস্থা নেই। সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক পরিবেশ বিরাজমান। একদিকে তিন কিলোমিটার বিশাল সি বিচ অন্যদিকে আছে বিশাল কেওড়াবাগান। রুপকথার কমলা দিঘী নাম যারা শুনে আসছেন তারা চাইলে এখানে যেতে পারেন।
এখানে জোয়ারের সময় উপভোগ করা যাবে সমুদ্রের গর্জন, আর ভাটার সময় বিস্তীর্ণ বালিরাশি ও সমুদ্রের সৌন্দর্য। সূর্যাস্তের সময় কমলার দীঘির চোখ ধাঁধানো প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং শরীর ও মন জুড়ানো শীতল বাতাসে আপনার মন জুড়াবে।
নিঝুম দ্বীপ
উত্তাল সাগরের কোলে সবুজ প্রকৃতির এক মায়াবী ভূখণ্ড নিঝুম দ্বীপ। দ্বীপের সৈকতে সূর্যোদয় বা সূর্যাস্ত, চিত্রল হরিণের ছোটাছুটি আর কেওড়া, বাইন, গেওয়া বন বারবার ডাকে নিরল-নিঝুম দ্বীপটিতে ছুটে যেতে। বাংলাদেশ যে কয়েকটি পর্যটন কেন্দ্র আছে তার মধ্যে নিঝুম দ্বীপ অন্যতম। নিঝুম দ্বীপের পূর্ব নাম ছিল ভাওলারচর। ২০০১ সালে সরকার পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে ঘোষণা করে এরপর থেকে দেশে ও দেশের বাইরে অল্প কয়েক বছরের মধ্যে ভ্রমণপিপাসুদের মনের মধ্যে জায়গা করে নেই।
এর অবস্থান হলো নোয়াখালী জেলা বিচ্ছিন্ন দ্বীপ হাতিয়ার একটি ছোট্ট ইউনিয়ন। বাংলাদেশের দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের উপকূলে এর অবস্থান। বছরের অন্যান্য মৌসুমের চেয়ে শীতকালে পর্যটকদের আনাগোনা বেশি দেখা যায় নিঝুম দ্বীপে। সবুজ প্রাকৃতিক লোকারণ্য হওয়ায় অল্পতেই মন ছুঁয়ে যায় পর্যটকদের।
নিঝুম দ্বীপের হরিণ সবাইকে আকর্ষণ করে। মজার বিষয় হলো, হরিণ আপনার হাতের কাছেই এসে চিপস, বিস্কুট ইত্যাদি শুকনো খাবার নিয়ে খাবে। এছাড়া বিকেলে পশ্চিম দিকের সি বিচে গেলে আপনার মন খারাপ থাকলে ভালো হয়ে যাবে। কারণ সামনে অথৈ সাগর আর সাগর। যা আপনার মনের জায়গা করে নিবে দারুন প্রশান্তি।
মূসাপুর
কর্মব্যস্ত জীবনে একটু ফুরসত মিলতেই অবসর কাটানোর জন্য নিরিবিলি স্থানের খোঁজ করেন সবাই। এজন্য আশপাশের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে একদিনের ভ্রমণে যাওয়ার সুযোগ খোঁজেন অনেকেই। তাদের জন্য সেরা এক গন্তব্য হলো ‘মুছাপুর ক্লোজার’। মুছাপুর ক্লোজা নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার মুছাপুর ইউনিয়নে অবস্থিত। প্রথম দেখাতে মনে হবে এটি একটি সৈকত। আসলে সেখানে গেলেই আপনি উপভোগ করতে পারবেন নদীপাড়ে সাগরের আবহ। এর আশপাশের সবুজ প্রকৃতি, গ্রামীণ পরিবেশ, পাখির কোলাহল ও মৎস্যজীবীদের জীবনাচরণ সবাইকে মুগ্ধ করবে। এছাড়া ট্রলারে কিংবা স্পিডবোটে করে ঘুরতেও পারবেন। সেখানে এখনও নিরাপত্তার তেমন কোনো ব্যবস্থা না থাকায়, দর্শনার্থীদের দিনে দিনেই ফিরে আসতে হয়।
গান্ধী আশ্রম
গান্ধী আশ্রম নোয়াখালীর একটি দর্শনীয় স্থান ও ঐতিহাসিক নিদর্শন। নোয়াখালী জেলা সদর মাইজদী কোর্ট হতে প্রায় ২৫ কিলোমিটার উত্তরে সোনামুড়ী উপজেলার জয়াগ বাজার সংলগ্ন সড়কের পাশে এর অবস্থান। তৎকালীন জমিদার প্রয়াত ব্যারিস্টার হেমন্ত কুমার ঘোষের বাড়িতে উক্ত গান্ধী আশ্রম স্থাপিত হয়। বর্তমানে গান্ধী আশ্রম নোয়াখালীর একটি সেবামূলক সংগঠন হিসেবে দেশব্যাপী খ্যাতি লাভ করেছে। বর্তমানে এটি দেখতে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ এসে এখানে পরিদর্শন করছেন এবং দেশের বাইরে থেকে ও বিভিন্ন পর্যটক আসেন এই ঐতিহাসিক স্থানটি দেখতে। নোয়াখালী জেলা সদর মাইজদী হতে সোনাইমুড়ীগামী যেকোনো লোকাল বাস সার্ভিস/ সিএনজি অটোরিকশাযোগে সম্মুখে জয়াগ বাজার নেমে রিকশা বা পায়ে হেঁটে আধা কিলোমিটার পূর্বে গেলে গান্ধী আশ্রমে পৌঁছানো যাবে।
এ ছাড়া রয়েছে সোনাইমুড়ী উপজেলার বজরা ইউনিয়নের বজরা শাহী জামে মসজিদ, সেনবাগ উপজেলা মোহাম্মদপুর গ্রামে কল্যাণ্দি জমিদার বাড়ি এক ঐতিহাসিক স্থান, গোপালপুর চৌধুরী বাড়ি মসজিদ। নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জ উপজেলার গোপালপুর বাজার থেকে একটু এগুলেই রাস্তার পাশে শান বাঁধানো পুকুর। পাশ দিয়ে সরু রাস্তা সামনে চলে গেছে। রাস্তার মাথায় এক পাশে প্রায় ২০০ বছর প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী এ মসজিদ আর অপর পাশে বিখ্যাত চৌধুরী বাড়ি। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)। শুরুতে তৈল, ডাল ও বীজ ফসল নিয়ে ২০১৪ সালে নোয়াখালীর সুবর্ণচরে যাত্রা শুরু করে। বর্তমানে সহস্রাধিক পণ্য নিয়ে কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে, সবকিছু ছাড়িয়ে সুবর্ণচরের বিএডিসি বর্তমানে একটি পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে পরিণত হচ্ছে।
প্রতিনিধি/এসএস