রাজধানীর মিরপুর, পল্লবী, রূপনগর ও কালশীর একাংশ নিয়ে গঠিত ঢাকা-১৬। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসন থেকে ১১ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তবে আলোচনায় বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থী। তারা উভয়েই হেভিওয়েট হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন।
এই আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৪৯৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ১ হাজার ১৬৮, নারী ভোটার ১ লাখ ৯৯ হাজার ৩২৩ এবং হিজড়া ভোটার ৮ জন। এ আসনে ৫০ হাজারের বেশি ভোটারের বাস বিহারি ক্যাম্পে।
বিজ্ঞাপন
এই আসনে ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচন করছেন বিএনপি নেতা এবং বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক আমিনুল হক। দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছেন সাবেক সেনা কর্মকর্তা এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতা কর্নেল (অব.) মো. আব্দুল বাতেন। দুজনই ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন আর নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।
এই আসনে অন্য প্রার্থীদের তেমন প্রচার–প্রচারণা নেই। হাতপাখা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী সাইফুল ইসলাম, ট্রাক প্রতীকে গণঅধিকার পরিষদের মামুন হোসেন, আনারস প্রতীকে বাংলাদেশ লেবার পার্টির এ কে এম মোয়াজ্জেম হোসেন ও আম প্রতীকে নির্বাচন করছেন ন্যাশনাল পিপলস পার্টির প্রার্থী তারিকুল ইসলাম।
এ আসনের অন্য প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মোহাম্মদ তৌহিদুজ্জামান (বটগাছ প্রতীক), বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) নাজমুল হক (গরুর গাড়ি প্রতীক), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (মার্কসবাদী) রাশিদুল ইসলাম (কাঁচি প্রতীক) এবং জাতীয় পার্টির সুলতান আহম্মেদ সেলিম (লাঙ্গল প্রতীক)।
ঢাকা-১৬ আসনে জলাবদ্ধতা, পানি কিংবা গ্যাস সংকট নিত্যদিনের চিত্র। তবে এসবের বাইরে নিরাপত্তাই যেন সবচেয়ে বড় চাওয়া ভোটারদের কাছে। প্রার্থীরা নিরাপত্তাসহ নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।
বিজ্ঞাপন

বিহারি ক্যাম্পের বাসিন্দা নাজমুল ইসলাম। নানা সংকট আর আতঙ্ক নিয়ে সময় কাটান তিনি। জনাকীর্ণ ক্যাম্পে ছোট থেকে তিনি দেখছেন পানি আর গ্যাসের সংকট। সার্বক্ষণিক স্বাস্থ্যঝুঁকি ও সংঘাতময় পরিস্থিতির মধ্যে বেড়ে ওঠা নাজমুল ইসলাম এখন ভোটার। তার চাওয়া সব ধরনের নাগরিক সুবিধা এবং স্থায়ী আবাসন।
জানতে চাইলে তিনি ঢাকা মেইলকে বলেন, এই আসনের পুরো এলাকাজুড়ে সমস্যার শেষ নেই। মাদক ও ছিনতাই এখানকার প্রধান সমস্যা। পর্যাপ্ত ড্রেনেজব্যবস্থা না থাকায় সামান্য বৃষ্টিতেই অনেক এলাকার রাস্তাঘাট তলিয়ে যায়। খালগুলো পরিণত হয় নর্দমায়। পোশাক কারখানাগুলোকে কেন্দ্র করে নিয়মিতই ঘটে সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির ঘটনা। বছরে কয়েক দফা আগুন লাগে এলাকার বিভিন্ন বস্তিতে।
এই বাসিন্দা বলেন, এই এলাকায় পর্যাপ্ত খেলার মাঠ নেই। প্রার্থীদের এটিও দেখতে হবে গুরুত্ব সহকারে। শিশু-কিশোর ও তরুণ সমাজের সুস্থ বিকাশের জন্য খেলার মাঠের ব্যবস্থা করে দিতে হবে।
বেসরকারি কর্মজীবী শামীম রহমান। ২০০৮ সাল থেকে বসবাস করেন পল্লবীতে। দেশকে নিয়ে তিনি যে স্বপ্ন দেখিয়েছিল, তা এখন দুঃস্বপ্ন। দেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে তিনি কিছুটা হতাশও বটে।
শামীম রহমান বলেন, ‘আপনার-আমার ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটবে বলে মনে হচ্ছে না। আমাদের দেশের রাজনৈতিক পদ্ধতিটা পুরোই ভিন্ন। আমরা আবেগপ্রবণও বেশি। আমাদের আগে যেটা হয়েছে, এখনো সেটাই হবে।’
এই আসনের আরেক বাসিন্দা আহসান হাবিব জানান, ঢাকার এক প্রান্তে হওয়ায় আমাদের সমস্যাগুলো সেভাবে সামনে আসে না। এখানে সার্বিকভাবে নিরাপত্তার সমস্যা আছে। প্রকাশ্যে মাদক ব্যবসা চলে, চুরি-ছিনতাই বাড়ছে। অথচ রাষ্ট্রীয়ভাবে এসব সমস্যা দেখা হচ্ছে না।
নির্বাচনের পর এসব সমস্যা কিছুটা কমবে বলে আশা করছেন জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা বসবাসের জন্য সুন্দর পরিবেশ ও নিরাপত্তা চাই। নির্বাচিত সরকার এলে অস্থিতিশীলতা হয়ত কিছুটা কাটবে। আমি চাই সুস্থ রাজনীতির মাধ্যমে আমাদের দৈনন্দিন জীবন শান্তিপূর্ণ হোক।
এদিকে জেতার জন্য জোরালো তৎপরতা চালাচ্ছেন ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী আমিনুল হক ও দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী মো. আব্দুল বাতেন। প্রচারণায়ও নানা কৌশল অবলম্বন করছেন তারা। নির্বাচনি প্রচারের শুরুর আগে আমিনুল হক মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে যান এবং সেখানে তার বাবা-মায়ের কবর জিয়ারত ও মোনাজাত করেন। এরপর নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে নির্বাচনি এলাকায় প্রবেশ করেন। গণসংযোগকালে তিনি সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন এবং আগামী নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীকে দোয়া ও সমর্থন চেয়ে ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনার লিফলেট বিতরণ করেন।
গণসংযোগকালে আমিনুল হক বলেন, ‘আমি এই এলাকায় বড় হয়েছি। দীর্ঘদিন ধরে পথসভা ও উঠান বৈঠকের মাধ্যমে জনগণের যে প্রত্যাশা ও সমস্যার কথা শুনেছি, তা নথিভুক্ত করে আমি আগামী দিনের পরিকল্পনা সাজিয়েছি। জনগণের ভোটে নির্বাচিত হলে প্রতিটি পরিকল্পনা অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করা হবে।’
আমিনুল হক বলেন, ‘এখানকার মানুষ বহু বছর ধরে আমাকে চেনেন, ভালোবাসেন। খেলাধুলার কারণে আলাদাভাবে তারা আমাকে পছন্দ করেন, রাজনীতিতে আসার পরও তাদের সমর্থন পেয়েছি। আমি ভ্রাতৃত্ববোধ, আন্তরিকতা ও ভালোবাসার রাজনীতি করতে চাই। সব মতের সবাই মিলেমিশে থাকবে। সবাই ঐক্যবদ্ধ থাকলে অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। আমি মনে করি, এলাকার মানুষ আমাকে ভোট দিয়ে তাদের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করার সুযোগ দেবেন।’

সকাল থেকে রাত অবধি প্রচার ও প্রচারণায় ব্যস্ত থাকেন আব্দুল বাতেন। নির্বাচনে জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী তিনি। আবদুল বাতেন বলেন, ‘প্রায় মানুষের কাছে যে অনুভূতি পাচ্ছি, তারা পরিবর্তন চায়। দীর্ঘদিন ধরে যে শাসনব্যবস্থা চলে আসছে দেশে, সেখান থেকে তারা পরিবর্তন চায়। তাঁরা নানাভাবে চাঁদাবাজি ও দখলদারির কারণে অতিষ্ঠ হয়ে গেছেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ভালো চলেনি। উন্নয়ন বাজেটের নামে প্রচুর অর্থ লুটপাট হয়েছে, দেশের বাইরে পাচার হয়েছে। দেশের মানুষ চায় এই অবস্থার পরিবর্তন হোক।’
নির্বাচিত হলে এলাকা থেকে চাঁদাবাজি, মাদকের ব্যবসা ও কিশোর গ্যাংয়ের মতো সমস্যা দূর করার প্রতিশ্রুতি দেন আবদুল বাতেন। তিনি বলেন, ‘এসব সমস্যা দূর করতে পারব। কারণ, আমরা চাঁদাবাজির পৃষ্ঠপোষকতা করব না। চাঁদাবাজদের যদি রাজনৈতিক দল বা শাসক দলের পক্ষ থেকে পৃষ্ঠপোষকতা করা না হয়, তাহলে এগুলো বন্ধ হয়ে যাবে।’
এদিকে দুই প্রার্থী পাল্টাপাল্টি অভিযোগও দিচ্ছেন আর ছাড়ছেন কথার ফুলঝুড়ি। অভিযোগ করে আমিনুল হক বলেন, একটি নিরপেক্ষ নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করতে প্রতিপক্ষ দল নানামুখী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার, সাধারণ মানুষের এনআইডি নম্বর সংগ্রহ এবং অর্থের বিনিময়ে ভোট কেনার অপচেষ্টা চলছে।’
ধানের শীষের প্রার্থী বলেন, ‘গত ১৭ বছর দেশের মানুষ ভোট দেওয়ার সুযোগ পায়নি। অপতৎপরতা রুখে দেওয়া গেলে ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেশে একটি ‘ভোট বিপ্লব’ ঘটবে।’
অপরদিকে আব্দুল বাতেন বলেন, ‘প্রতিপক্ষ মরিয়া হয়ে ফলাফল নিজেদের দিকে নেওয়ার চেষ্টা করবে। অতীতে আমরা ভোটের দিন প্রার্থীদের কেন্দ্রে যেতে বাধা দেওয়া, কেন্দ্রে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা, এজেন্টদের বের করে দিয়ে সিল মারার চেষ্টাসহ নানা অনৈতিক কার্যক্রম দেখেছি। তবে ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রতি আমার আস্থা আছে। আশা করব, ভোটকেন্দ্রে আসার পথে যাতে প্রার্থীদের বাধা না দেওয়া হয়, সে ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সজাগ দৃষ্টি রাখবে।’
এসএইচ/জেবি




















