রোববার, ২৪ মে, ২০২৬, ঢাকা

ঢাকা-৫: বিএনপির প্রত্যাবর্তন নাকি জামায়াতের ইতিহাস?

মহিউদ্দিন রাব্বানি
প্রকাশিত: ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৫:৩৯ পিএম

শেয়ার করুন:

dhaka
ঢাকা-৫ আসনে আলোচনায় তিন প্রার্থী। ছবি: সংগৃহীত
  • ভোটের মাঠে ফিরেছে উত্তাপ-অস্থিরতা
  • হারানো দুর্গ উদ্ধারের চেষ্টা বিএনপির
  • জামায়াতের শক্তি নারী ও সাংগঠনিক শক্তি
  • ইসলামী আন্দোলন নীরব, তবে প্রভাবশালী

ঢাকা-৫ আসনের ডেমরা সারুলিয়া এলাকায় অটোরিকশা চালান রবিউল হুসাইন। রাজনীতির বড় বড় হিসাব তার জানা নেই। তবে প্রতিদিন রাস্তায় ঘুরে মানুষের কথা শোনেন, এলাকার বাস্তবতা দেখেন। নতুন বাংলাদেশে তিনি চান সুশাসন আর জবাবদিহিমূলক শাসন। তাই এবার তিনি গতানুগতিকের বাইরে গিয়ে বিকল্প কাউকে খুঁজবেন বলে জানান।


বিজ্ঞাপন


কৌশলে জানতে চাইলে তিনি জানান, এবার দাঁড়িপাল্লায় ভোট দেবেন। কেন এই সিদ্ধান্ত জানতে চাইলে রবিউল বলেন, জামায়াতের লোকজন চাঁদাবাজি করে না, মানুষকে ঠকায় না। একসময় আমরা অন্য রাজনীতি করতাম। এবার আমাদের মতো অনেকেই জামায়াতকে ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

রবিউলের এই বক্তব্য একক কোনো ঘটনা নয়। ডেমরা, যাত্রাবাড়ী, কাজলার পাড়, মাতুয়াইল কিংবা সারুলিয়ার এলাকায় সরেজমিনে ঘুরে এমন কথাই চাউর হচ্ছে যে, এবার দাঁড়িপাল্লায় ভোট দেবে সাধারণ মানুষ। এসব গল্পই ইঙ্গিত দিচ্ছে, ঢাকা-৫ এ এবারের ভোট আর আগের মতো সহজ কোনো সমীকরণে বাঁধা নেই।

তবে বিএনপির দীর্ঘদিনের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ঢাকা-৫ আসনটি। প্রায় ২০ বছর ধরে হাতছাড়া আসনটি পুনরুদ্ধারে মরিয়া চেষ্টা করছে বিএনপি। অন্যদিকে ইসলামী আন্দোলনের হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থীও এলাকায় বেশ সরব। প্রতিযোগিতার দৌড়ে তিনিও পিছিয়ে নেই।  

ভোটের মাঠে ফিরেছে উত্তাপ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ক্ষণগণনা শুরু হতেই রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এই আসনে ফিরেছে চেনা নির্বাচনি আমেজ। যাত্রাবাড়ী, ডেমরা ও কদমতলীর আংশিক এলাকা নিয়ে গঠিত ঢাকা-৫ এখন ব্যানার, ফেস্টুন, লিফলেট আর গণসংযোগে সরগরম।

NN1

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে সক্রিয় এলাকাগুলোর একটি ছিল এই আসন। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই এবার ভোটাররা আগের চেয়ে বেশি সচেতন, প্রশ্নমুখর এবং হিসাবি বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

১১ প্রার্থী, মূল লড়াই তিন প্রতীকে

আসন্ন নির্বাচনে ঢাকা-৫ আসনে মোট ১১ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তবে সরেজমিনে ঘুরে এবং ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে বোঝা যায়, ভোটের বাস্তব লড়াই ঘুরপাক খাচ্ছে মূলত তিন প্রতীকের মধ্যে—ধানের শীষ, দাঁড়িপাল্লা ও হাতপাখা।

বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থীরাই মাঠে সবচেয়ে সক্রিয়। সংগঠন, কর্মী উপস্থিতি এবং ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতায় তারাই এগিয়ে বলে মনে করছেন স্থানীয় ভোটারদের বড় একটি অংশ।

সোয়া ৪ লাখ ভোটারের এলাকা, ক্ষোভের পাহাড়

৪ লাখ ২০ হাজারের ভোটারের এই আসনে নাগরিক সমস্যার তালিকা দীর্ঘদিনের। জলাবদ্ধতা, গ্যাস সংকট, সরকারি হাসপাতালের অভাব, মানসম্মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও খেলার মাঠ না থাকা—সব মিলিয়ে ক্ষোভ জমেছে বছরের পর বছর।

মাতুয়াইল এলাকার সাইফুল ইসলাম ঢাকা মেইলকে বলেন, ভোটের সময় সবাই আসে, প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু পরে আর খোঁজ থাকে না। এবার মানুষ কাজের হিসাব দেখতে চায়। পয়ঃনিষ্কাশনব্যবস্থা উন্নয়ন, মশক নিধন, জলাবদ্ধতা নিরসন, সড়ক পুরস্কার মেরামতসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ করার বাকি রয়েছে। আমরা সিটি করপোরেশন আওতাধীন হলেও অনেক ক্ষেত্রেই নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত। আশা করি নতুন নেতৃত্ব এলে আমাদের দিকে এবার চোখ খুলে তাকাবেন।

হারানো দুর্গ উদ্ধারের চেষ্টা বিএনপির

স্বাধীনতার পর থেকে ঢাকা-৫ আসনে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে দফায় দফায় জয়-পরাজয় হয়েছে। সর্বশেষ ২০০১ সালে বিএনপির প্রার্থী কামরুল ইসলাম এই আসনে জয় পান। এরপর প্রায় দুই দশক ধরে এই আসনে জয়ের মুখ দেখেনি দলটি।

এই দীর্ঘ বিরতি কাটাতে এবার মাঠে আছেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক নবী উল্লাহ নবী। পুরোনো ভোটব্যাংক এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার ওপর ভর করেই তিনি এগোচ্ছেন বলে জানান দলীয় নেতাকর্মীরা।

স্থানীয় বিএনপি নেতা মোর্শেদ মাহবুব বলেন, যাত্রাবাড়ী-ডেমরা এলাকা আগে থেকেই বিএনপির দুর্গ হিসেবে পরিচিত। বিগত সময়ে সুষ্ঠু নির্বাচন না হওয়ায় আওয়ামী লীগের লোকেরাই বারবার নির্বাচিত হয়েছে। ফলে বিএনপিরা সে সুযোগ পায়নি। এবার শুরু এসেছে। পুরাতন আসন উদ্ধারে আমরা একাট্টা হয়ে কাজ করছি।

NN2

নবী উল্লাহ নবী বলেন, নির্বাচিত হলে হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, খেলার মাঠ নির্মাণ এবং জলাবদ্ধতা ও গ্যাস সংকট নিরসনে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

বর্তমানে তিনি দিনরাত এক করে ঘরে ঘরে গিয়ে গণসংযোগ ও প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন। সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলছেন।

তিনি জানান, বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষর ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। মানুষ একটি বড় পরিবর্তন চেয়েছিল, তাই আমি যতটা প্রত্যাশা করেছি, তার চেয়েও বেশি সমর্থন পাচ্ছি।

ধানের শীষের প্রার্থী প্রচারণায় গিয়ে নির্বাচিত হলে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, খেলার মাঠ ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি গ্যাস সংকট ও জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। এছাড়া হাসপাতাল, খেলার মাঠ, ওয়ার্ডভিত্তিক কমিউনিটি সেন্টার তৈরি করবেন বলে জানান।

জামায়াতের শক্ত ভিত নারী ভোটার ও সাংগঠনিক কাঠামো

ঢাকা-৫ আসনে জামায়াতে ইসলামীর অবস্থান এবার আলাদা গুরুত্ব পাচ্ছে। স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের মতে, দলটির অন্যতম বড় শক্তি তাদের রিজার্ভ নারী ভোটার। জামায়াতের নারী সংগঠনের কর্মীরা নিয়মিত বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট সংগ্রহ করছেন, যা মাঠে স্পষ্ট প্রভাব ফেলছে।

সাংগঠনিকভাবেও জামায়াত এই আসনে শক্ত অবস্থানে রয়েছে বলে জানা গেছে। বিশেষ করে তামিরুল মিল্লাত মহিলা কামিল মাদরাসাকে কেন্দ্র করে নারী ভোটারদের সঙ্গে ধারাবাহিক যোগাযোগ এবং সংগঠিত প্রচারণা চালানো হচ্ছে।

এছাড়া শিক্ষা, সমাজসেবা ও ধর্মীয় ঘরানার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে দীর্ঘদিন ধরেই এলাকায় উপস্থিতি ধরে রেখেছে দলটি। অনেকেই মনে করছেন, এই সংগঠিত কাঠামোই শেষ পর্যন্ত দাঁড়িপাল্লাকে বাজিমাত করতে পারে।

যাত্রাবাড়ীর কাজলার পাড় এলাকার বেসরকারি চাকরিজীবী তামান্না আক্তার ঢাকা মেইলকে বলেন, জামায়াতের নারী কর্মীরা ঘরে এসে কথা বলে। কোনো চাপ দেয় না, চাঁদাও চায় না। এই আচরণটাই আমাদের ভালো লেগেছে।

রওশন আরা ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থী নাবিল হোসেনের ভাষায়, আমরা চাঁদাবাজি আর দখলদারির রাজনীতি দেখতে চাই না। শৃঙ্খলা আর নিরাপত্তাই এখন বেশি জরুরি। রাজনীতির নামে বহু বছর চাঁদা দিতে হয়েছে। জামায়াতের লোকজন কখনো এমন করেনি। তাই এবার সিদ্ধান্ত বদলেছি।

ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের মজলিসে শূরার সদস্য অ্যাডভোকেট একে আজাদ বলেন, ঢাকার ভালো আসন আসনগুলো মধ্যে ঢাকা-৫ অন্যতম। যদি নির্বাচন অবাধ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয় তাহলে জামায়াত বিপুল ভোটে জয় লাভ করবে বলে প্রত্যাশা। ক্যাম্পেইনে যেখানে যাচ্ছি ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি আলহামদুলিল্লাহ। আমাদের এখানে বড় একটা রিজার্ভ ভোট ব্যাংক আছে।

নিবাচনি প্রচারে কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা আছে কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত প্রতিপক্ষ কোনো প্রার্থীর বাধার সম্মুখীন হইনি আমরা। নির্বাচনের দিন কোনো অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে মোকাবেলা করতে আমরা প্রস্তুত আছি।

NN3

যাত্রাবাড়ী পূর্ব থানা সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট শাফিউল আলম ঢাকা মেইলকে বলেন, আমাদের প্রার্থী বিপরীতে থাকা অনেকের বিরুদ্ধেই যাত্রাবাড়ী-সায়েদাবাদ এলাকায় চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে। সাধারণ মানুষ চায় না চাঁদাবাজ কেউ জনপ্রতিনিধি হয়ে উঠুক। সাধারণ মানুষ চায় সৎযোগ্য মানুষ তাদের কথা জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করুক।

এলাকায় প্রভাবশালী ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী

তিনমুখী লড়াইয়ে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী হাজী মো. ইবরাহীমকে অনেকেই ‘নীরব শক্তি’ হিসেবে দেখছেন। দুইবারের নির্বাচিত কাউন্সিলর হিসেবে তার ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা এবং ধর্মীয় ভোটব্যাংক তাকে প্রতিযোগিতায় টিকিয়ে রেখেছে।

ঢাকায় ইসলামী আন্দোলন এই আসনটিকে বিশেষ টার্গেট করেছে। দলটির সাংগঠনিক শক্তি অনেকটা এই আসনে ব্যয় করছে। ফলে হাতপাখাও মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকবে বলে জানিয়েছে এলাকাবাসী।

ঢাকা-৫ সংসদীয় আসনটি মূলত ডেমরা ও যাত্রাবাড়ী ও কদমতলী থানা নিয়ে গঠিত। এটি ডিএসসিসি ওয়ার্ড নম্বর ৪৮, ৪৯, ৫০ এবং ৬০ থেকে ৭০ পর্যন্ত এলাকা নিয়ে বিস্তৃত। এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৪,১৯,৯৯৬ জন। এর মধ্যে—পুরুষ ভোটার: ২,১৪,৫৯৪ জন, নারী ভোটার: ২,০৫,৩৯৭ জন, তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার: ৫ জন।

নারী ও পুরুষ ভোটারের সংখ্যা প্রায় সমান হওয়ায় এই আসনে নারী ভোটারদের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

ভোটের মাঠে ১১ প্রার্থী

ঢাকা-৫ আসনে ভোটের মাঠে রয়েছেন ১১ জন প্রার্থী। তারা হলেন- বিএনপির মো. নবী উল্লা, জামায়াতে ইসলামীর মোহাম্মদ কামাল হোসেন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হাজী মো. ইবরাহীম, গণঅধিকার পরিষদের সৈয়দ মোহাম্মদ ইব্রাহিম, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির তোফাজ্জল হোসেন মোস্তফা, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের মো. তাইফুর রহমান রাহী, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (মার্কসবাদী) শাহিনুর আক্তার সুমি, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি-এলডিপির মো. হুমায়ূন কবির, জাতীয় পার্টি-জেপির মীর আব্দুস সবুর, বাংলাদেশ লেবার পার্টির মো. গোলাম আযম এবং বাংলাদেশ কংগ্রেসের মো. সাইফুল আলম।

সব মিলিয়ে ঢাকা-৫ এ এবারের নির্বাচন শুধু দলীয় প্রতিযোগিতা নয়। এটি অভিজ্ঞতা, সংগঠন, আচরণ এবং ভোটারদের বাস্তব অভিজ্ঞতার লড়াই। ধানের শীষ কি ২০ বছর পর ফিরবে, দাঁড়িপাল্লা কি নারী ভোটার ও সাংগঠনিক শক্তিতে ইতিহাস গড়বে, নাকি হাতপাখা দেখাবে নীরব চমক—এই প্রশ্নের উত্তর মিলবে ভোটের দিন।

এমআর/জেবি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger

টাইমলাইন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর