রাজধানীর আলোচিত আসন ঢাকা-১৭। বরাবরই অভিজাত এলাকার এই আসনটির দিকে নজর থাকে দেশবাসীর। তবে এবারের নির্বাচনে এখান থেকে প্রার্থী হয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর আলোচনায় শীর্ষে থাকা বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ফলে আসনটি অন্য যেকোনো বারের তুলনায় বেশি আলোচিত হচ্ছে। এই আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ডা. এস এম খালিদুজ্জামান। তার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার কথা ছিল বিজেপির আন্দালিব রহমান পার্থের সঙ্গে। তবে শেষ মুহূর্তে এখানে প্রার্থী হন তারেক রহমান। তার প্রার্থিতা পাল্টে দেয় অনেক হিসাব-নিকাশ।
রাজধানীর গুলশান, বনানী, নিকেতন, মহাখালী, বারিধারা, শাহজাদপুর এবং ঢাকা সেনানিবাসের একাংশ নিয়ে এই আসনটি গঠিত। একদিকে ঢাকা সবচেয়ে অভিজাত এলাকা এখানে অবস্থিত। অন্যদিকে রাজধানীর বৃহৎ বস্তিগুলোর একটি কড়াইল বস্তি এই সংসদীয় আসনে। আশপাশের এলাকায় রয়েছে ছোট-বড় আরও ১৫টি বস্তি।
বিজ্ঞাপন
নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, এ আসনে মোট ভোটার তিন লাখ ২৫ হাজার ১৮ জন। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ১৫ নম্বর ওয়ার্ডে ৯১ হাজার ১৭৫ ও ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় ভোটার রয়েছেন ৬০ হাজার ৮২৫ জন। এ ছাড়া, ১৮ নম্বর ওয়ার্ডে ৩৯ হাজার ৫৬২ জন, ১৯ নম্বর ওয়ার্ডে ৬৯ হাজার ৩২ এবং ২০ নম্বর ওয়ার্ডে ৬৪ হাজার ৪২৪ ভোটার। এসব ভোটারের বড় একটি অংশই প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বা বস্তিবাসী।
এই আসনে মোট প্রার্থী ১২ জন। বিএনপি ও জামায়াতের বাইরে বাকি প্রার্থীরা হলেন বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (কাঁঠাল) কামরুল হাসান নাসিম, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের মনজুর হুমায়ুন, আনোয়ার হোসেন মনজুর দল জাতীয় পার্টি-জেপি থেকে তপু রায়হান, জাতীয় পার্টির (লাঙ্গল) আতিক আহমেদ, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মোহাম্মদ উল্যাহ, বাংলাদেশ কংগ্রেসের মো. শামীম আহমদ, জামায়াত জোটের বাংলাদেশ লেবার পার্টির মুহাম্মদ রাশেদুল হক, বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্টের (বিএনএফ) এস এম আবুল কালাম আজাদ, স্বতন্ত্র মো. আনিসুজ্জামান খোকন ও কাজী এনায়েত উল্লাহ।

গুলশান-২ এর চত্বরে দাঁড়িয়ে ঢাকা মেইলের সঙ্গে কথা হয় ঢাকা-১৭ আসনের ভোটার কড়াইল বস্তির বাসিন্দা রিকশাচালক ফরহাদ হোসেনের। নির্বাচনি হাওয়া নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘গরিব মানুষ, দিন এনে দিন খাই। বস্তিবাসীর উন্নয়ন ও যারা পাশে থাকবে তাদেরকেই আমরা ভোট দেব। এই আসনে আমরা বস্তিবাসীরাই সবচেয়ে বেশি অবহেলিত, আমাদের জন্য অর্থাৎ গরিব মানুষদের জন্য যিনি কাজ করার প্রতিশ্রুতি দেবেন তাকে ভোট দেব। এখনো ভোটের সময় বাকি আছে, সবকিছু দেখে ভোট দেব।’
বিজ্ঞাপন
কড়াইল বস্তির আরেক বাসিন্দা নাজমুল হাসান। পেশায় তিনি দিনমজুর। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এখানে উৎসবমুখর ভোট হবে। কারণ তারেক রহমান এই এলাকায় এমপি প্রার্থী হওয়ায় ভোটের আমেজ বেড়েছে। আগে জামায়াতের প্রার্থী বেশি ভোটে জেতার সম্ভাবনা থাকলেও এখন অনেক হিসাব মিলিয়ে দেখার আছে।’
এই বাসিন্দা বলেন, ‘প্রতিশ্রুতিশীল কাউকে ভোট দেব। সেই সঙ্গে যিনি এলাকার সার্বিক উন্নয়নের কথা ভাববেন। ঢাকা-১৭ আসনের বেশকিছু উন্নয়ন এবং গুলশানের যানজটের নিরসন যিনি করতে পারবেন, তাকেই আমরা বেছে নেব।’
ঢাকা-১৭ আসনের ভাসানটেকের বিআরবি মাঠে সম্প্রতি জনসভা করেছেন তারেক রহমান। এসময় এলাকার নানা সমস্যা শুনেছেন তিনি। সেইসঙ্গে তিনি বস্তিবাসীদের পুনর্বাসন, কর্মসংস্থান ও নিরাপত্তাসহ সামগ্রিক উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি ধানের শীষ প্রতীকে ভোট চেয়ে বলেন, ধানের শীষেই উন্নয়ন।
তারেক রহমান বলেন, ‘আমি আপনাদেরই সন্তান। এই এলাকায় বড় হয়েছি। তাই এই এলাকার মানুষের দুঃখ-কষ্ট, প্রত্যাশা ও সমস্যার দায় আমি নিতেই চাই। সুযোগ পেলে ইনশাআল্লাহ এসব সমস্যার সমাধান করব।’
ভাসানটেকের ভ্যানচালক মো. জুয়েলকে সামনে এনে তারেক রহমান জানতে চান, এলাকার সবচেয়ে বড় সমস্যা কী? জুয়েল বলেন, ‘আমাদের থাকার জায়গা নাই। পুনর্বাসনের ব্যবস্থা চাই।’
এরপর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হেনা আক্তার বলেন, ‘আমাদের পাশেই ক্যান্টনমেন্ট এলাকা—সুশৃঙ্খল ও সুন্দর। কিন্তু ভাসানটেক খুব অনুন্নত। আমরা চাই, এই এলাকার উন্নয়ন হোক।’
লিলি নামের এক বস্তিবাসী নারী বলেন, ‘আমাদের কিছুই নাই। পুনর্বাসন চাই, ফ্যামিলি কার্ড চাই।’
সমস্যা ও প্রত্যাশাগুলো শুনে তারেক রহমান বলেন, ‘আপনারা যেসব সমস্যার কথা বলেছেন—পুনর্বাসন, ফ্যামিলি কার্ড, কর্মসংস্থান—ইনশাআল্লাহ, বিএনপি সরকার গঠন করলে এগুলো আমরা অগ্রাধিকার দিয়ে সমাধান করব।’
এদিকে ডা. এসএম খালিদুজ্জামানও প্রতিদিনই চালাচ্ছেন নির্বাচনি প্রচার-প্রচারণা, দিচ্ছেন নানা প্রতিশ্রুতি। গত ৯ নভেম্বর বস্তিতে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘ঢাকা-১৭ আসনের ভেতর মহাখালী এলাকাকে বলা হয় হেল্থ ভিলেজ। কিন্তু এ অঞ্চলের মানুষ স্বাস্থ্য খাতে সব থেকে বেশি অবহেলিত। কড়াইল, ৭ তলা ও ভাসানটেক বস্তি এলাকার মানুষ অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস করে। এলাকার মানুষকে নিয়ে বিগত কোনো সরকার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করেনি। সব রাজনৈতিক দল এই এলাকার মানুষকে ব্যবহার করে ক্ষমতায় গিয়েছে। কিন্তু মানুষের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি। জামায়াত যদি আগামীতে এ আসনে নির্বাচিত হয়, তাহলে মানুষের মৌলিক অধিকার খাদ্য, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থান নিশ্চিত করা হবে। বিশেষ করে এলাকায় স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের জন্য পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন নগরী গঠন করা হবে। নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করা হবে। প্রাথমিক চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপন করা হবে।’

ডা. খালিদুজ্জামান বলেন, ‘জামায়াত এ দেশের মানুষের জন্য রাজনীতি করে। আগামী দিনে জামায়াত সরকার গঠন করলে দেশের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে এ দেশকে একটি উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করা হবে ইনশাআল্লাহ।’
তারেক রহমানের প্রার্থী হওয়া প্রসঙ্গে তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রার্থী হলেও কোনো চিন্তা নেই। আমার সঙ্গে সাধারণ ভোটাররা রয়েছেন। এই এলাকায় আমি দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছি। মানুষের বিপদে-আপদে পাশে দাঁড়াচ্ছি। নির্বাচিত হলে বস্তিবাসীর জন্য আবাসন সমস্যা দূর করাসহ চাঁদাবাজ ও মাদকমুক্ত মানবিক গুলশান বনানী গড়ে তুলতে চাই।’
তারেক রহমান সারাদেশে প্রচারে ব্যস্ত সময় পার করায় আসনটিতে বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটি তারেক রহমানের নির্বাচনের সমস্ত কার্যক্রম পরিচালনা করছে। দলীয় প্রধান প্রার্থী হওয়ায় আসনটিতে দ্বিগুণ উৎসাহ নিয়ে কাজ করছেন বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা।
তবে আশা ছাড়ছেন না জামায়াত নেতাকর্মীরাও। প্রচার-প্রচারণাও ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা। বাড়ি-বাড়ি গিয়ে ভোট চাচ্ছেন নারী-পুরুষ উভয়ের কাছে। এছাড়া দলটি বলছে, সারাদেশে জামায়াতের পক্ষে ভোটারদের ইতিবাচক মনোভাব রয়েছে, যার প্রভাব ঢাকা-১৭ আসনেও দেখা যাবে।
কালাচাঁদপুর এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা মনির হোসেন বলেন, ‘আমরা চাই এই এলাকার কোনো আদি বাসিন্দা নির্বাচন করে বিজয়ী হয়ে আসুন।’ তিনি জানান, পরিবেশ অনুকূলে থাকলে তারা ভোট দিতে যেতে চান। তাই সুষ্ঠু ভোটের পরিবেশ চান।
প্রথমে ঢাকা-১৭ আসনে নির্বাচনের ঘোষণা দেন তরুণ রাজনীতিবিদ বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ। তিনি নিজের দলের প্রতীক গরুর গাড়ি মার্কা নিয়ে প্রচারও শুরু করেন। শেষ পর্যন্ত ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে তারেক রহমান দেশে ফেরার পর বদলে যায় সব সমীকরণ। এখানে এখন বিএনপির প্রার্থী হন দলের চেয়ারম্যান নিজে। এই খবরে ভোটের মাঠের দৃশ্যপট অনেকটা পাল্টে যায়।
এসএইচ/জেবি




















