ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের দিনক্ষণ যত ঘনিয়ে আসছে ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনি এলাকা ঢাকা-১১ আসনে ভোটের লড়াই ঘিরে বাড়ছে উত্তাপ। রামপুরা, বাড্ডা ও ভাটারা- এই তিনটি ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা নিয়ে গঠিত আসনে ভোটযুদ্ধে মুখোমুখি হচ্ছেন দুই প্রজন্মের দুই প্রতিনিধি। একদিকে বিএনপির প্রবীণ ও অভিজ্ঞ নেতা ড. এম এ কাইয়ুম, অন্যদিকে জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে উঠে আসা জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) তরুণ নেতা নাহিদ ইসলাম।
তবে কাইয়ুমের অভিজ্ঞতা ও নাহিদের তারুণ্যের মাঝে ভোটের সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হাতপাখা প্রতীক। প্রার্থী শেখ মো. ফজলে বারী মাসউদ আগের নির্বাচনে ভালো ভোট পেয়েছেন। তিনি ঢাকা উত্তর সিটি নির্বাচনেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। এবারও বেশ জোরেশোরে প্রচার চালাচ্ছেন তিনি। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে অতীতের চেয়ে ভালো ফলাফলের প্রত্যাশা করছেন ফজলে বারী মাসউদ।
বিজ্ঞাপন
এই আসনে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত টানা আওয়ামী লীগের দখলে থাকলেও গণঅভ্যুত্থানে পতিত দলটি এবার নির্বাচনে নেই। তবে তাদের কর্মী-সমর্থকরা এলাকায় আছেন। ভোটের মাঠে তারা কোনদিকে যাবেন তাও ব্যবধান তৈরিতে ভূমিকা রাখবে বলে মনে করা হচ্ছে।

ঢাকা-১১ আসনে বিএনপি, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জাতীয় পার্টি, গণঅধিকার পরিষদ, গণফোরাম, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি), বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টি (বিআরপি), বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট এবং একজন স্বতন্ত্র প্রার্থীসহ মোট ১০ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তবে তিন দলের বাইরে বাকিদের অনেকেই এলাকায় অপরিচিত। প্রচার-প্রচারণাও সেইভাবে নেই তাদের।
বড় ভোটার এলাকা, বড় হিসাব
ঢাকা-১১ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৩৯ হাজার ৭৮ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ২২ হাজার ৮৭৭ জন, নারী ভোটার ২ লাখ ১৬ হাজার ১৯৮ জন এবং হিজড়া ভোটার রয়েছেন ৩ জন।
এই আসনের অন্তর্ভুক্ত এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে বাড্ডা থানা এলাকা, রামপুরা থানার টিভি সেন্টার, আফতাবনগর আবাসিক এলাকা, বনশ্রীর একাংশ, মহানগর প্রজেক্ট ও মালিবাগ-চৌধুরীপাড়া। এছাড়া ভাটারা থানার নতুন বাজার, বারিধারা সংলগ্ন এলাকা, নুরের চালা ও ছোলমাইদ এলাকাও এই আসনের অন্তর্ভুক্ত।
এলাকা এবং ভোটার বেশি হওয়ার কারণে প্রার্থী ও তাদের সমর্থকরা দিনভর ছুটছেন দ্বারে দ্বারে। দিচ্ছেন নানা প্রতিশ্রুতি। তবে অনেক দিন পর নির্বিঘ্নে ভোট দেওয়ার সুযোগ আসায় তারাও ভেবেচিন্তে ভোট দেওয়ার কথা বলছেন।
বনশ্রীর সি ব্লকের বাসিন্দা কাজল হায়দার ঢাকা মেইলকে বলেন, পুরো এলাকায় গ্যাসের সমস্যা থাকে বছরজুড়ে। নড়াই নদী এখন ময়লার খাল, মশার উপদ্রব চরম। এসব সমস্যা ছিল, ভবিষ্যতেও থাকবে। কিন্তু এর থেকে মুক্তির জন্য প্রার্থীদের তেমন নজর দেখি না।
সমস্যা ও প্রতিশ্রুতি
এলাকাবাসীর প্রধান অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে- গ্যাস সংকট, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা, যানজট, ছিনতাই, কিশোর গ্যাং ও চাঁদাবাজি। বিশেষ করে দক্ষিণ বনশ্রী ও মেরাদিয়া এলাকা অপরাধপ্রবণ বলেও অভিযোগ করেন স্থানীয়রা। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর গুলির ঘটনাও আছে এই এলাকায়।

অবশ্য এসব বিষয় চিন্তায় রেখে প্রার্থীরাও প্রচারণার সময় নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। প্রচারে অংশ নিয়ে বিএনপির প্রার্থী ড. কাইয়ুম প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন প্রতিটি এলাকায় সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, নাইটগার্ড নিয়োগ ও কমিউনিটি পর্যায়ে নজরদারি জোরদার করার।
অন্যদিকে, এনসিপির প্রার্থী নাহিদ ইসলাম জানিয়েছেন, গ্যাস সমস্যা, নারী নিরাপত্তা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়ন তার অগ্রাধিকার।
লড়াই হবে কাইয়ুম বনাম নাহিদের
এই আসনে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিএনপির প্রবীণ নেতা ড. এম এ কাইয়ুম। দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় সক্রিয় এই নেতা গত দেড় দশকের রাজনৈতিক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে নিজেকে শক্ত অবস্থানে নিয়ে এসেছেন। এলাকায় তার সংগঠনিক ভিত্তি ও পরিচিতি তুলনামূলকভাবে দৃঢ় বলে মনে করছেন বিএনপির নেতাকর্মীরা।
যদিও তিনি আওয়ামী লীগের আমলে দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে অবস্থান করায় এলাকায় প্রভাব কিছুটা কমলেও গণঅভ্যুত্থানের পর আগের অবস্থায় ফিরেছেন বলে নেতাকর্মীরা দাবি করছেন।
ড. কাইয়ুম বলেন, ‘দীর্ঘদিন পর মানুষ প্রকৃত অর্থে ভোটের অধিকার ফিরে পেয়েছে। দলের প্রতি আমার ত্যাগ ও সংগ্রামের ইতিহাস রয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা ও মানুষের ভালোবাসার ওপর ভর করেই আমি আশাবাদী যে জয় আমাদেরই হবে।’
অন্যদিকে, গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে নতুন রাজনীতির বার্তা নিয়ে মাঠে নেমেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির তরুণ প্রার্থী নাহিদ ইসলাম। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম সংগঠক হিসেবে পরিচিত নাহিদ ইসলাম এবারের নির্বাচনে শাপলা কলি প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। জামায়াতে ইসলামীসহ ১১ দলীয় ঐক্য জোটের সমর্থনও পেয়েছেন তিনি। ফলে আশা রাখছেন নির্বাচনের ভালো কিছু করার।

প্রচারণায় অংশ নিয়ে নাহিদ ইসলাম বলছেন, এই এলাকার প্রধান সমস্যা গ্যাস, বিদ্যুৎ, যানজট ও চাঁদাবাজি। এসব সমস্যার স্থায়ী সমাধানে আমরা কাজ করতে চাই। আমাদের রাজনীতি প্রতিশ্রুতির নয়, বাস্তব পরিবর্তনের।
হাতপাখার শক্তি কতটা?
এদিকে ভোটের মাঠে তৃতীয় শক্তি হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী শেখ মো. ফজলে বারী মাসউদ। রামপুরা, ভাটারা ও আফতাবনগর এলাকায় তার একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকায় ব্যক্তিগত পরিচিতি ও সামাজিক প্রভাব রয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
২০২০ সালের ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশ নিয়ে তিনি ২৮ হাজারের বেশি ভোট পেয়েছিলেন। ফলে এবার তার প্রাপ্ত ভোট বিএনপি ও এনসিপির ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ফজলে বারী মাসউদের দাবি, ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং না হলে আমার জয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। ভোটারদের ওপর আমার আস্থা আছে। ভাটারা, বাড্ডা ও রামপুরা এলাকায় আমার দীর্ঘদিনের কাজ ও পরিচিতি রয়েছে।
বিইউ/জেবি




















