সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ঢাকা

ঢাকা-৪: প্রার্থীদের নানা প্রতিশ্রুতি, মূল লড়াই ধানের শীষ-দাঁড়িপাল্লায়

মহিউদ্দিন রাব্বানি
প্রকাশিত: ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৩:৩৯ পিএম

শেয়ার করুন:

vote
আলোচিত তিন প্রার্থী। ছবি: সংগৃহীত
  • ভোট চাইছেন সবাই, প্রশ্ন উঠছে আচরণবিধি মানা নিয়ে
  • ২০ দফা ইশতেহারে উন্নয়নের রূপরেখা বিএনপি প্রার্থীর
  • সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজিমুক্ত এলাকার অঙ্গীকার জামায়াত প্রার্থীর
  • জোট ভেঙে যাওয়ায় বিপাকে হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থী 
  • আলোচনায় স্বতন্ত্র প্রার্থী মিজানের ভিন্নধর্মী ইশতেহার
  • নারী ও তরুণ ভোটারদের টানতে আলাদা বার্তা প্রার্থীদের

ঢাকা-৪ আসনে নির্বাচনি প্রচার যত এগোচ্ছে, ততই বাড়ছে প্রতিশ্রুতির বহর। জলাবদ্ধতা থেকে মাদক নির্মূল, কর্মসংস্থান থেকে নারী নিরাপত্তা—সবকিছুই আছে প্রার্থীদের ঘোষণায়। তবে এসব প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে আচরণবিধি লঙ্ঘন ও সহিংসতার অভিযোগও সামনে আসছে।


বিজ্ঞাপন


ঘড়ির কাঁটা তখন দুপুর ১টা। মুরাদপুর এলাকায় একটি টং দোকানে চা খাচ্ছিলেন কয়েকজন শ্রমিক। সেখানেই হাজির হন ফুটবল প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী মিজানুর রহমান। পরিচয় দেওয়ার আগেই স্থানীয়রা তাকে চিনে ফেলেন। তার দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রাম, বিশেষ করে ওয়াসার পানি নিয়ে প্রতিবাদ কর্মসূচির কথা তুলে ধরেন তারা।

ভোট চাওয়ার বদলে মিজানুর উল্টো প্রশ্ন ছুড়ে দেন—নির্বাচিত হয়ে অসৎ হলে কী করবেন ভোটাররা? নিজের প্রশ্নের উত্তর নিজেই দেন, তখন জনগণকেই তার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। ভোট দেওয়াকে তিনি নাগরিক ক্ষমতা ও অধিকার হিসেবে তুলে ধরেন।

শ্যামপুর-কদমতলী থানা নিয়ে গঠিত ঢাকা-৪ আসন দীর্ঘদিন ধরেই নাগরিক সমস্যায় জর্জরিত। ঘনবসতিপূর্ণ এই এলাকায় দারিদ্র্য, জলাবদ্ধতা, পরিবেশ দূষণ, মাদক, চাঁদাবাজি, গ্যাস ও পানি সংকট নিত্যদিনের বাস্তবতা। নতুন ভোটার বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। এবারে মোট ভোটার ৩ লাখ ৬২ হাজার ৫০৬ জন।

এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা সেলিম উদ্দিন বলেন, একটু বৃষ্টি হলেই রাস্তায় পানি জমে যায়। মাদক আর চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে কেউ কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি। তার মতে, যে প্রার্থী বাস্তব সমস্যার সমাধানে কাজ করবে, ভোট যাবে তার দিকেই।


বিজ্ঞাপন


এই বাস্তবতার মধ্যেই প্রার্থীরা দিচ্ছেন বড় বড় অঙ্গীকার। জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী সৈয়দ জয়নুল আবেদীন সন্ত্রাস, মাদক ও চাঁদাবাজিমুক্ত ঢাকা-৪ গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। নিয়মিত গণসংযোগ করছেন। দিনরাত এক করে মানুষের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছেন। এছাড়া ওলামা সমাবেশ, নারী ও যুব মহিলাদের সমাবেশ, সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়—দিনভর কর্মসূচিতে তিনি দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠনের কথা বলেন। নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া ন্যায়ভিত্তিক সমাজ সম্ভব নয় বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

RR1

তবে তার প্রচারণাকালে উত্তেজনার ঘটনাও ঘটে। কদমতলীর ৫২ নম্বর ওয়ার্ডে গণসংযোগ চলাকালে জামায়াতের নারী কর্মীদের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে। রামদা দিয়ে কোপ দেওয়ার ঘটনায় এক নারী নেত্রী গুরুতর আহত হন। হামলার পেছনে বিএনপি সংশ্লিষ্ট নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলে দলটি।

জামায়াত প্রার্থী বলেন, বঞ্চনা থেকে মুক্তির সনদ—আমাদের নির্বাচনি ইশতেহার! গত ১৭ বছরে যা হয়নি, ইনসাফ কায়েম হলে আমরা তা করে দেখাবো। মাদক ও সন্ত্রাসমুক্ত সমাজ গঠন এবং সাধারণ মানুষের নাগরিক অধিকার ফিরিয়ে দেওয়াই আমাদের মূল লক্ষ্য। আমাদের ইশতেহার কেবল এক টুকরো কাগজ নয়, এটি আপনাদের সাথে করা আমাদের পবিত্র আমানত। ইনশাআল্লাহ, জয় এবার দাঁড়িপাল্লার।

অন্যদিকে বিএনপি প্রার্থী তানভীর আহমেদ রবিন দনিয়া কলেজে আনুষ্ঠানিকভাবে তার নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেছেন। ২০ দফার এই ইশতেহারে জলাবদ্ধতা নিরসন, আইনশৃঙ্খলা উন্নয়ন, মাদক ও কিশোর গ্যাং নির্মূল, হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্থাপন, যুব কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও নারীর ক্ষমতায়নের প্রতিশ্রুতি রয়েছে।

রবিন বলেন, ঢাকা-৪ ঢাকার সবচেয়ে অবহেলিত আসনগুলোর একটি। নির্বাচিত হলে তিনি এলাকাতেই থাকবেন এবং জনগণের আমানতের খেয়ানত করবেন না বলে আশ্বাস দেন।

RR2

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী সৈয়দ মোসাদ্দেক বিল্লাহ মাদানী হাতপাখা প্রতীক নিয়ে ঢাকা-৪ আসনে নির্বাচন করছেন। শুরুতে দলটি জামায়াতে ইসলামীর জোটে থাকায় এই আসনে মাদানীকেই জোটের প্রার্থী করা হবে—এমন আলোচনা ছিল রাজনৈতিক অঙ্গনে। সে কারণে শুরুতে বেশ আত্মবিশ্বাসী ও ফুরফুরে মেজাজেই ছিলেন তিনি।

তবে শেষ পর্যন্ত জোট ভেঙে যাওয়ায় বদলে যায় পরিস্থিতি। জামায়াত আলাদা প্রার্থী দেওয়ায় নির্বাচনি সমীকরণে চাপের মুখে পড়েন ইসলামী আন্দোলনের এই প্রার্থী। জোটের সমর্থন না থাকায় ভোটের মাঠে এখন তাকে এককভাবেই লড়াই করতে হচ্ছে।

এরপরও থেমে নেই তার প্রচার। হাতপাখা প্রতীক সামনে রেখে তিনি নিয়মিতভাবে বিভিন্ন এলাকায় গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। অলিগলি ও গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে ব্যানার-পোস্টার লাগানোতেও সক্রিয় দেখা গেছে তাকে। স্থানীয়দের সঙ্গে মতবিনিময়ের মাধ্যমে নিজের অবস্থান তুলে ধরার চেষ্টা করছেন মাদানী।

এদিকে স্বতন্ত্র প্রার্থী মিজানুর রহমান ভিন্নধর্মী উদ্যোগ নিয়ে আলোচনায়। ময়লার ভাগাড়ে বসে ইশতেহার ঘোষণা করে তিনি প্রতীকীভাবে এলাকার দখল-দূষণ আর নাগরিক অবহেলার চিত্র তুলে ধরেন। ‘গলিসমাজ’ গঠন, এমপি হটলাইন চালু, টেকসই জলাবদ্ধতা সমাধান, ওয়াসা ও তিতাসকে জবাবদিহির আওতায় আনা, খেলাধুলা ও সংস্কৃতির জায়গা ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।

RR3

ঢাকা-৪ আসনে এবারে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিএনপি, জামায়াত, স্বতন্ত্রসহ আটজন প্রার্থী। অন্যরা হলেন জনতার দলের আবুল কালাম আজাদ কলম প্রতীক নিয়ে, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের সাহেল আহমেদ সোহেল ছড়ি প্রতীকে, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির মো. ফিরোজ আলম কাস্তে প্রতীকে, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল বাসুদের জাকির হোসেন মই প্রতীকে নির্বাচন করছেন।

নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে মাঠের উত্তপ্ত ততই বাড়ছে। বর্তমানে মাঠে যেমন প্রতিশ্রুতির ছড়াছড়ি, তেমনি আচরণবিধি মানা ও সহিংসতা ঠেকানো নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। ভোটারদের প্রত্যাশা একটাই—প্রতিশ্রুতি যেন শুধু প্রচারণায় না থাকে, বাস্তবেও যেন তার প্রতিফলন দেখা যায়।

এমআর/জেবি

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

টাইমলাইন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর