রাজধানীর সংসদীয় আসনগুলোর মধ্যে এবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ঢাকা-৮ আসনটি। এই আসনে ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচন করছেন দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং সাবেক এমপি ও মন্ত্রী মির্জা আব্বাস। প্রবীণ এই রাজনীতিকের সঙ্গে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন তরুণদের দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। ভোটের মাঠে নবীন-প্রবীণের এই লড়াই তীব্র বাগযুদ্ধে রূপ নিচ্ছে এবং প্রতিদিনই উত্তাপ ছড়াচ্ছে।
রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এই আসনটিতে ব্যবসা–বাণিজ্য ও সরকারি দফতরের প্রাণকেন্দ্র মতিঝিল অবস্থিত। এছাড়া পল্টন-গুলিস্তান-শাহবাগসহ রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকা এই আসনেই পড়েছে। নাগরিক জীবনের নিত্য-সমস্যা আর রাজনৈতিক সংঘাত—এই দুয়ের মাঝখানেই ভোটের মাঠে সিদ্ধান্ত নিতে প্রস্তুত এখানকার ভোটাররা।
বিজ্ঞাপন
ঢাকা–৮ আসনের বাসিন্দারা দীর্ঘদিন ধরেই যানজট, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট, মাদক ব্যবসা এবং চাঁদাবাজির মতো সমস্যায় জর্জরিত। প্রতিদিন অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়ীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা সড়কে আটকে থাকছেন। মতিঝিল ও পল্টনের মতো এলাকায় সড়ক ও ফুটপাতের সংকীর্ণতা এবং অপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার কারণে যানজট এখন নিত্যদিনের ভোগান্তি। শাহজাহানপুর ও মালিবাগ এলাকায় গ্যাসের চাপ কমে যাওয়া এবং ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট নাগরিক জীবনে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।

মতিঝিলের এক বাসিন্দা ও ব্যাংক কর্মকর্তা মিজান বলেন, তার সন্তানের স্কুল যাতায়াত আর নিজের অফিসে পৌঁছানো—দুটোই প্রতিদিন চরম দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে করতে হয়। তার ভাষায়, ‘আমরা আর প্রতিশ্রুতি শুনতে চাই না, বাস্তব সমাধান চাই।’ এমন ক্ষোভ শুধু তার একার নয়, পুরো আসনজুড়েই একই সুর শোনা যাচ্ছে।
এই আসনের আরেক বড় উদ্বেগের জায়গা মাদক। রেলওয়ে কলোনি ও শান্তিনগর এলাকায় প্রকাশ্যে মাদক বেচাকেনা ও সেবনের অভিযোগ করছেন স্থানীয়রা। তাদের আশঙ্কা, এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে। একই সঙ্গে ফুটপাতের দোকানি ও ছোট ব্যবসায়ীরা চাঁদাবাজির শিকার হওয়ার অভিযোগ তুলেছেন। তাদের দাবি, ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে নিয়মিত চাঁদা দিতে বাধ্য করা হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
এই বাস্তবতার মধ্যেই ঢাকা–৮ আসনে নির্বাচনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। মির্জা আব্বাস ও নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী দুজনেই নাগরিক সমস্যার সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে মাঠে নেমেছেন। প্রচারণার পাশাপাশি চলছে তাদের তীব্র বাগবিতণ্ডা।
মির্জা আব্বাস অভিযোগ করেছেন, নির্বাচনে সমান সুযোগের পরিবেশ নেই। তার দাবি, সরকারের একটি অংশ নির্দিষ্ট কিছু প্রার্থীকে এগিয়ে নিতে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। তিনি বলেন, ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড থাকলে আমাদের বিরুদ্ধে এভাবে কটূক্তি করা যেত না।’ তিনি তাঁর নেতাকর্মীদের ধৈর্য ধরার নির্দেশ দিয়েছেন এবং কোনো ধরনের প্রতিক্রিয়ায় না জড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন।

অন্যদিকে, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী অভিযোগ করেছেন, তার ওপর হামলা চালানো হয়েছে এবং প্রচারণার সময় ডিম নিক্ষেপ করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা এমন বাংলাদেশ চাই না। আমরা সুষ্ঠু নির্বাচন চাই।’
তিনি প্রশাসনের কাছে হামলাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান এবং ভোটারদের পরিবর্তনের পক্ষে রায় দেওয়ার আহ্বান জানান।
এদিকে, এই আসনে ছোট কয়েকটি দলও প্রার্থী দিয়েছে। তবে তাদের প্রচারণা তুলনামূলকভাবে দুর্বল এবং বড় দুই প্রার্থীর দ্বন্দ্বের আড়ালেই থেকে যাচ্ছে।
সব মিলিয়ে ঢাকা–৮ আসনের নির্বাচন এখন শুধু ভোটের লড়াই নয়, বরং নাগরিক সমস্যা, রাজনৈতিক অভিযোগ আর পাল্টা বক্তব্যের এক জটিল সমীকরণে পরিণত হয়েছে। ভোটারদের একটাই প্রত্যাশা—যে প্রার্থী বাস্তবে তাদের জীবনযাত্রা সহজ করতে পারবেন এবং নাগরিক সমস্যার সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখবেন, তার পক্ষেই তারা রায় দেবেন। বাগযুদ্ধের উত্তাপ পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত ব্যালট বাক্সই ঠিক করবে, ঢাকা–৮ আসনে সত্যিকারের পরিবর্তন আসে কি না।
টিএই/জেবি








