আশ্রয়কেন্দ্রেও মিলছে না খাবার, ত্রাণের জন্য হাহাকার

মো. মুন্না মিয়া সিলেট
প্রকাশিত: ২০ জুন ২০২২, ০১:১২ পিএম
আশ্রয়কেন্দ্রেও মিলছে না খাবার, ত্রাণের জন্য হাহাকার

উজান থেকে নেমে আসা ঢল ও ভারি বর্ষণে সিলেটে আকস্মিক বন্যায় জনদুর্ভোগ মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে খাদ্য ও সুপেয় পানি সংকট তীব্র হয়েছে। কিছু নিত্যপণ্য পাওয়া গেলেও দাম লাগামহীন। মানুষের একটি অংশ আশ্রয়কেন্দ্র ও নিরাপদ আশ্রয়ে ঠাঁই পেলেও সেখানেও খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে কিছু ত্রাণসামগ্রী দেওয়া হলেও তা পর্যাপ্ত নয়। যার কারণে দাবি-চাহিদা অনুযায়ী খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি পাচ্ছেন না বন্যা দুর্গতরা।

সিলেট সদর উপজেলার মানসিনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আশ্রয় নিয়েছেন শরিফা বেগম। গেল ২ দিনে আগে সেখানে আশ্রয় নিলেও এখন পর্যন্ত কোনো ত্রাণ পাননি বলে জানান তিনি।

শরিফা বেগম বলেন, ‘বাড়ি থেকে হাঁড়ি-পাতিল কিছুই আনতে পারিনি। খাবারও আনিনি। এখানে এখন পর্যন্ত কেউ ত্রাণ নিয়েও আসিনি। তাই খুব কষ্টে আছি।’ আশপাশের বাসিন্দারা মাঝে মাঝে খাবার নিয়ে আসেন বলেও জানান শরিফা।

নগরের ছড়ারপাড় এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ আলী আশ্রয় নিয়েছেন দুর্গাকুমার পাঠশালায়। তিনি জানালেন, তিন দিনে কোনো সরকারি ত্রাণ পাননি। ব্যক্তি-উদ্যোগে কয়েকজন রান্না করা খাবার দিয়েছেন।

আলী বলেন, ‘রান্না করা খাবার তো রাখা যায় না। একবেলায় খেয়ে ফেলতে হয়। তাই একবেলা খেলে পরের বেলা উপোস থাকতে হচ্ছে।’

sylet

বন্যায় সিলেটের দুর্গকুমার পাঠশালায় আশ্রয় নিয়েছেন ছড়ারপাড় এলাকার বাসিন্দা লিটন মিয়া। শুক্রবার এ আশ্রয়কেন্দ্রে ওঠেন তিনি। বৃহস্পতিবার কিছু লোক এসে রান্না করা খাবার দিয়ে যান। এরপর আর কোনো সহায়তা পাননি লিটন।

তিনি বলেন, ‘এক দিন কেবল খাবার পেয়েছিলাম। এরপর আর কিছু পাইনি। এখানে রান্নার সুযোগ নেই। তাই খুব কষ্টে আছি। তবু তো উপোস থাকা যায় না। আমরা না হয় যেকোনো কিছু খেয়ে ফেললাম। বাচ্চারা তো বুঝতে চায় না। তাই পানি ডিঙিয়ে বাসায় গিয়ে রান্না করে এখানে খাবার নিয়ে আসি।’ বাসায় পানি উঠলেও চুলা ডুবেনি বলে জানান তিনি।

শুধু এ দুটি আশ্রয়কেন্দ্র নয়, সিলেটের সব আশ্রয়কেন্দ্রের চিত্রই এমন। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে ঠাঁই নেওয়া বানভাসী মানুষেরা ভুগছেন খাবারের তীব্র সংকটে। নগরে এখন পর্যন্ত সরকারি কোনো উদ্যোগে ত্রাণ তৎপরতা শুরু হয়নি।

নগরের বাইরে সেনাবাহিনী ও প্রশাসন ত্রাণ বিতরণ করলেও তা পর্যাপ্ত নয় বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

এদিকে, নগরীর ভেতরে ব্যক্তি ও বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান খাবার বিতরণ করলেও দুর্গম এলাকাগুলোতে আশ্রয় নেওয়া মানুষেরা রয়েছেন তীব্র সংকটে।

sylet

নৌযানের অভাবে দুর্গম এলাকায় ত্রাণ তৎপরতা ব্যাহত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক মো. মজিবর রহমান।

তিনি জানান, ‘আমরা বন্যাকবলিত মানুষদের উদ্ধার ও সহায়তায় সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছি। সেনাবাহিনীও এ ক্ষেত্রে সহায়তা করছে। তবে নৌকা সংকট ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে অনেক দুর্গম এলাকায় পৌঁছানো যাচ্ছে না। তবে আমাদের আন্তরিকতা ও চেষ্টার ঘাটতি নেই। এ পর্যন্ত জেলায় ৬১২ টন চাল, প্রায় আট হাজার প্যাকেট খাবার ও ৩৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা বিতরণ করা হয়েছে।’

তবে জেলা প্রশাসনের হিসেবে, জেলায় এ পর্যন্ত ৪৯৭টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এতে আশ্রিত আছেন প্রায় ২ লাখ ৩১ হাজার মানুষ ও ৩১ হাজার গবাদিপশু। আর সিলেট সিটি করপোরেশনের হিসাবে নগরে ৫৬টি আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় ছয় হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন।

সোমবার থেকে আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে ত্রাণ বিতরণ শুরু হবে জানিয়ে সিলেট সিটি করপোরেশনের বিদ্যুৎ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী (আশ্রয়কেন্দ্রের অতিরিক্ত দায়িত্ব) রুহুল আলম বলেন, ‘আমরা সরকারিভাবে বরাদ্দ দেওয়া ২০ টন চাল পেয়েছি। এ ছাড়া কিছু প্যাকেট করা খাবারও পেয়েছি। এগুলো আজ (সোমবার) থেকে বরাদ্দ হবে।’

সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত ত্রাণ বিতরণ শুরু না হলেও কাউন্সিলরা ব্যক্তি-উদ্যোগে বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে খাবার বিতরণ করছেন বলে জানান তিনি।

টিবি

টাইমলাইন