বৃহস্পতিবার, ৩ এপ্রিল, ২০২৫, ঢাকা

প্রতিবন্ধী হবে সেই ভয়ে নদীর ধারে ফেলে যাওয়া শিশুর পরিচয় মিলেছে

অনিকেত মাসুদ, বরিশাল
প্রকাশিত: ২৯ মার্চ ২০২৫, ০৩:০৭ পিএম

শেয়ার করুন:

loading/img

বড় হয়ে প্রতিবন্ধী হবে সেই ভয়ে ২ দিন বয়সী নবজাতককে বরিশাল নগরীর ঘেঁষা কীর্তনখোলার তীরে ফেলে গিয়েছিলেন বাবা ঘনশ্যাম হালদার। পিঁপড়ে এবং পোকায় খাওয়া শিশুটিকে উদ্ধার করে বরিশাল শের-ই-বাংলা চিকিৎসা (শেবাচিম) হাসপাতালে ভর্তি করেছিল নদীতীরের একদল মানুষ। তবে অসুস্থ সেই শিশুটির পরিপূর্ণ চিকিৎসা এখানে সম্ভব ছিল না। শেষ পর্যন্ত, পৃথিবীর আলো দেখার আগেই যখন সন্ধ্যা হয়ে আসছিল, তখন সেই নবজাতকের দায়িত্ব নিয়েছে হাসপাতালের সমাজসেবা বিভাগ। ওই বিভাগের সহকারী পরিচালক সাজ্জাদ পারভেজের তত্ত্বাবধানে ইতোমধ্যে উন্নত চিকিৎসার জন্য শিশুটিকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।

তবে এখানেও বিপত্তি দেখা দেয়। কাছের স্বজন না থাকায়, শিশুটিকে ঢাকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ভর্তি করতে অস্বীকার করেছিল। শেষ পর্যন্ত সেই সমস্যার সমাধান হয়। শুক্রবার (২২ মার্চ) খুঁজে পাওয়া যায় শিশুটির পরিবার। এরপর সমাজসেবা কার্যালয়ের উদ্যোগে নবজাতকের বাবাকে ঢাকায় পাঠানো হয়। ফেলে দেওয়া নয়, দত্তক হিসেবে কোনো একটি পরিবার শিশুটিকে দান করার দাবি জানিয়েছেন তিনি।


বিজ্ঞাপন


শিশুটির বাবা ঘনশ্যাম বাগেরহাট সদরের চায়ের দোকানদার।

শনিবার (২২ মার্চ) রাত সাড়ে ১১টার দিকে ত্রিশ গোডাউনের সিঙ্গারা পয়েন্টে অল্প আলোর মধ্যে কান্না করছিল কয়েক দিনের বয়সী ওই নবজাতক। কান্নার শব্দ শুনে স্থানীয় রুহুল আমিন এবং অন্যান্য বাসিন্দারা কান্নার উৎসের কাছে গিয়ে দেখতে পান একটি প্লাস্টিক ঝুড়ির মধ্যে, তোয়ালে দিয়ে পেঁচানো অবস্থায় অসুস্থ শিশুটি কান্না করছে। নদীর ধারে ফেলে যাওয়া শিশুর শরীরে তখন পিঁপড়ে কামড় বসিয়েছে এবং নানা ধরনের পোকামাকর ঘিরে ধরেছে। এ অবস্থা থেকে নবজাতককে উদ্ধার করে শেবাচিম হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। শিশুটির পিঠে ক্ষত থাকায়, স্থানীয়দের মধ্যে ধারণা ছিল যে, প্রতিবন্ধী হবে এমন আশঙ্কায় তাকে ফেলে দেওয়া হয়েছে।

এরপর শুরু হয় শিশুটিকে বাঁচানোর ঐক্যবদ্ধ লড়াই। শেবাচিম হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স এবং উদ্ধারকারী স্থানীয় ব্যক্তিরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে শিশুটিকে সুস্থ করার চেষ্টা করেন। তবে নবজাতকটি তার পিঠের নিচের অংশে মেনিনগোসিল রোগে আক্রান্ত ছিল। জন্ম থেকেই এই রোগে আক্রান্ত নবজাতককে চিকিৎসা দেওয়ার সক্ষমতা শেবাচিম হাসপাতালে নেই।

এ খবর বরিশাল জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক সাজ্জাদ পারভেজের নজরে আসে। এরপর শেবাচিম হাসপাতাল সমাজসেবা ইউনিটের উদ্যোগে শিশুটির দেখভাল করা হয়। এ সময় নবজাতককে ওষুধ, খাবারসহ প্রয়োজনীয় দ্রব্য প্রদান করে সমাজসেবা কার্যালয়। বৃহস্পতিবার শিশুটির শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে ঢাকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালে পাঠানো হয়। তখন নবজাতকের সঙ্গে বাবা-মা বা কোনো স্বজন না থাকায় ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস কর্তৃপক্ষ তাকে ভর্তি করেনি।


বিজ্ঞাপন


এর মধ্যে শুক্রবার দুপুরে বাবা ঘনশ্যামের সন্ধান পায় জেলা সমাজসেবা কার্যালয়। স্থানীয় ব্যক্তি সৌরভসহ জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উদ্যোগে নগদ অর্থ সহায়তা করা হয়। এরপর হাসপাতাল সমাজসেবা কার্যালয়ের ভাড়া করা অ্যাম্বুলেন্সে, দুইজন শিশু সুরক্ষা সমাজকর্মীর তত্ত্বাবধানে বাবা ঘনশ্যামকে ঢাকায় পাঠানো হয়। স্বজন না থাকায়, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস কর্তৃপক্ষ নবজাতককে ভর্তি করতে অস্বীকার করেছিল। এখন নবজাতকটি বাবার সঙ্গে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে।

এর আগে ১৯ মার্চ বরিশাল নগরীর সদর রোডের ডা. মোখলেচুর রহমান হাসপাতালে নবজাতকের মা অন্তরা ভর্তি হয়েছিলেন। ২১ মার্চ, মেনিনগোসিল রোগে আক্রান্ত অবস্থায় নবজাতকের জন্ম হয়।

নবজাতকের বাবা, বাগেরহাট সদরের চা দোকানদার ঘনশ্যাম বলেন, ‘আমার সন্তানের চিকিৎসায় প্রায় তিন লাখ টাকা ব্যয় হবে। টাকার অভাবে সুচিকিৎসা করাতে ব্যর্থ হচ্ছিলাম। তাই এক পরিবারকে আমার সন্তান দত্তক দিয়েছিলাম। তিনি আমার সন্তানকে রাতের অন্ধকারে সড়কের পাশে ফেলে গিয়েছেন। সন্তানের সুচিকিৎসার জন্য সমাজের বিত্তবানদের সহায়তা কামনা করি।’

বরিশাল শেবাচিম হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘ওই নবজাতক মেনিনগোসিল রোগে আক্রান্ত। এই রোগের চিকিৎসা এখানে নেই, তাই তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।’

বরিশাল জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক সাজ্জাদ পারভেজ বলেন, ‘নবজাতকের সর্বোচ্চ চিকিৎসা নিশ্চিত করতে সমাজসেবা অধিদফতর কাজ করছে। ইতোমধ্যে ওই নবজাতকের বাবা-মাকে খুঁজে বের করা হয়েছে এবং সমাজসেবা কার্যালয়ের তত্ত্বাবধানে তার উন্নত চিকিৎসা শুরু হয়েছে।’

প্রতিনিধি/একেবি

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন