পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে রাজশাহীতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বিশেষভাবে র্যাবের পক্ষ থেকে সারারাত টহল ও চেকিংসহ নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। জনসাধারণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিএনপি ও জামায়াত নেতাকর্মীদের নির্দেশনা দিয়েছে। এছাড়া যেকোনো ধরণের নাশকতা ঠেকাতে রাতে মোড়ে মোড়ে খেলাধুলা করার ঘোষণা দিয়েছে ছাত্রদল।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ঈদের ছুটিতে রাজশাহীতে কিশোর গ্যাংয়ের বেশ কয়েকটি চক্র নগরীজুড়ে নাশকতা সৃষ্টি করতে পারে। সংগঠিত হয়ে কর্মসূচি পালনের প্রস্তুতি নিচ্ছে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ। ইতোমধ্যে দলটির কয়েকজন নেতা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক স্ট্যাটাসে প্রকাশ্যে আসার ঘোষণা দিয়েছেন। নগরীর কাজলা, তালাইমারি ও বিনোদপুর এলাকায় ছাত্রলীগ প্রকাশ্যে আসতে পারে বলে সূত্রটির দাবি।
বিজ্ঞাপন
শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, গত বছরের ৫ আগস্ট পর্যন্ত নগরীর মেস ও ছাত্রাবাসগুলো ‘মেস মালিক সমিতি’ নামে একটি সংগঠন নিয়ন্ত্রণ করতো। আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য খায়রুজ্জামান লিটনের মদদপুষ্ট ব্যবসায়ী এনায়েতুর রহমান আওয়ামী লীগ সমর্থিত ব্যবসায়ীদের নিয়ে এ সংগঠন খোলেন। তারা সবাই বর্তমানে পলাতক রয়েছেন। ঈদের ছুটিতে সংগঠনটি থেকে মেস ও ছাত্রাবাস কেন্দ্রিক অরাজকতা হতে পারে বলেও শিক্ষার্থীরা আশঙ্কা করছেন। সেজন্য প্রশাসনের কঠোর ভূমিকার দাবি জানিয়েছেন তারা।
রাজশাহী কলেজ ছাত্রদলের আহবায়ক মো. খালিদ বিন ওয়ালিদ আবির ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘রহস্যজনক কারণে মেস মালিক সমিতির সভাপতি এনায়েত এখনো গ্রেফতার হয়নি বা তার নামে কোনো মামলা হয়নি। ৫ আগস্ট পর্যন্ত রাজশাহীতে ছাত্র-জনতার আন্দোলন ঠেকাতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছে এনায়েত। ঈদে তাদের পক্ষ থেকে অরাজকতা সৃষ্টির খবর আমাদের কাছে আছে। ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা ঝটিকা মিছিল করবে বলে আমরা খবর পাচ্ছি। আমরা তাদেরকে মাথাচাড়া দিতে দেবো না। যদি দেখি তারা কেউ অরাজকতা করছে, মোড়ে মোড়ে, পাড়া-মহল্লায় আমাদের নেতাকর্মী ও রাজশাহীর সাধারণ শিক্ষার্থীরা অবস্থান করবে এবং আমাদের কর্মসূচি থাকবে।’
সরেজমিনে ঘুরে মোড়ে মোড়ে ‘হেল্প ডেস্ক’ লেখা সম্বলিত জামায়াতে ইসলামীর ফেস্টুন টাঙানো দেখা গেছে। ফেস্টুনগুলোতে কয়েকটি মোবাইলফোন নম্বর দিয়ে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসীমূলক কর্মকাণ্ডের খবর ওই নম্বরগুলোতে জানাতে অনুরোধ করা হয়েছে। এছাড়া কর্মীদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলেও জানিয়েছেন জামায়াত নেতারা।
আরও পড়ুন—
বিজ্ঞাপন
এ ব্যাপারে জামায়াতে ইসলামীর রাজশাহী মহানগরীর নায়েবে আমির এডভোকেট আবু মোহাম্মদ সেলিম ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘আমাদের রাজশাহী শান্তিপূর্ণ শহর। এখানে আইনশৃঙ্খলার ভালো অবস্থা আছে। আমরা তো একটি আদর্শিক সংগঠন। হাসিনার পতনের পর যখন প্রশাসনিকভাবে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছিল, তখন আমরা মোড়ে মোড়ে ফেস্টুন টাঙিয়েছিলাম, যাতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটে।’
তিনি বলেন, ‘শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে শতাধিক ফেস্টুন টাঙানো হয়। এতে জামায়াতের প্রতি জনগণের আস্থা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। ঈদকে সামনে রেখে আমাদের প্রস্তুতি রয়েছে। ফ্যাসিস্ট হাসিনার দলের কারো নাশকতা করার কোনো সুযোগ নেই। প্রশাসন রয়েছে, আমরাও সজাগ আছি। আইনশৃঙ্খলার ব্যাপারে আমরা প্রশাসনকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।’
এদিকে, আওয়ামী লীগের অরাজকতা প্রতিহত করার কথা জানিয়েছে বিএনপি। দলটির রাজশাহী মহানগর কমিটির আহবায়ক এডভোকেট এরশাদ আলী ঈশা ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো আছে। মানুষ সবাই সচেতন আছে। প্রশাসনও শক্তিশালী হয়েছে। প্রশাসনকে সহযোগিতা করার জন্য আমরা আমাদের দলীয় নেতাকর্মীদের নির্দেশনা দিয়েছি। নেতাকর্মীরা সার্বিকভাবে সহযোগিতা করবে। ঈদের ছুটিতে স্বৈরাচার হাসিনার আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটাতে পারে। সেজন্য আমাদের বিএনপি, ছাত্রদল, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলসহ অন্যান্য অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা প্রস্তুত রয়েছে। যেখানেই আওয়ামী লীগের নাশকতা হবে, সেখানেই তাদের প্রতিহত করা হবে। মোড়ে মোড়ে আমাদের লোকজন অবস্থান করছে।’
এছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে ও নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগ প্রতিহত করতে মোড়ে মোড়ে খেলাধুলার নির্দেশনা দিয়েছে ছাত্রদল। মহানগর ছাত্রদল সভাপতি আকবর আলী জ্যাকি ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘ঈদের সময় রাজশাহী শহরের সব মেস ফাঁকা হয়ে যায়, শুধু স্থানীয় লোকজন থাকেন। আমাদের ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে কমিটি হয়েছে। সম্প্রতি ধর্ষণ ও ডাকাতির ঘটনা বেড়ে যাওয়ার সময় আমরা মোড়ে মোড়ে খেলাধুলা করতে নির্দেশনা দিয়েছিলাম। আমাদের নেতাকর্মীরা সদর হাসপাতাল মোড়সহ বিভিন্ন পয়েন্টে রাতের বেলা খেলাধুলা করেছে, যাতে কিছু ঘটলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যায়।’
জ্যাকি বলেন, ‘একই নির্দেশনা ঈদেও থাকবে। যদিও এটা আমাদের আন-অফিসিয়াল পরিকল্পনা। এতে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের আমরা প্রতিহত করতে পারবো। তারা কেউ অরাজকতা করতে আসলে আমরা মোকাবিলা করবো। তারা অন্তত রাজশাহীতে এত বড় দুঃসাহস পাবে না। বড়জোর তারা প্রোপাগাণ্ডা চালাতে পারে। তবে আমরা প্রতিহত করবো। ছাত্র-জনতার ওপর হামলাকারী, হাসিনার আমলে জনগণের ওপর অন্যায়-অত্যাচার করা এরকম কাউকে পেলে আমরা আইনের আওতায় আনতে কাজ করবো।’
আরও পড়ুন—
অন্যদিকে, ঈদকে সামনে রেখে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ মার্কেটগুলোতে বসানো হয়েছে পুলিশ বক্স। শিফট ভাগ করে মার্কেট খোলা থাকাকালীন সবসময় পুলিশ ও আনসার সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। নগরীর সাহেব বাজার জিরো পয়েন্ট আরডিএ মার্কেটে পুলিশকে দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়। পুলিশ বক্সের দায়িত্বরত ইনচার্জ বোয়ালিয়া মডেল থানার এসআই মোছা. নীপা আক্তার ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘দুই শিফটে আমাদের ডিউটি চলছে। সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত একটা টিম, এরপর বিকাল ৫টা থেকে রাত ১২টা মার্কেট খোলা থাকা পর্যন্ত আরেকটি টিম দায়িত্ব পালন করছে। বড় কোনো কমপ্লেইন এখনো পাইনি। মানিব্যাগ বা মোবাইল হারানোর মতো কিছু অভিযোগ আসছে। আমরা পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দিচ্ছি।’
তবে এ ব্যাপারে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরএমপি) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। আরএমপি কমিশনার মোহাম্মদ আবু সুফিয়ানের মোবাইলফোন নম্বরে যোগাযোগ করা হয়। একজন ফোন রিসিভ করে নিজেকে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার পরিচয় দিয়ে পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। ‘এটিই পুলিশ কমিশনারের নম্বর’- এমনটা বলা হলে কোনো সদুত্তর না দিয়ে ফোন কেটে দেন তিনি।
পরবর্তীতে ওই নম্বরে পুনরায় যোগাযোগ করা হলে আর ফোন রিসিভ হয়নি। এ ব্যাপারে আরএমপির মুখপাত্র (এডিসি) সাবিনা ইয়াসমিনের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হয়। তিনিও ফোন রিসিভ করেননি। এছাড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ব্যাপারে জানতে ক্ষুদেবার্তা পাঠিয়েও কোনো সাড়া মেলেনি।
তবে জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) ফারজানা ইসলাম ঢাকা মেইলকে জানিয়েছেন, ‘তাদের নাইট ডিউটি ও পেট্রোল ডিউটি চলছে। পাশাপাশি হাইওয়েগুলোতে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে জেলা পুলিশ।’
এ ব্যাপারে র্যাব-৫ রাজশাহীর মোল্লাপাড়া ক্যাম্পের কোম্পানি কমান্ডার মেজর আসিফ আল-রাজেক ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘রমজানের শুরু থেকেই আমাদের টহল চলমান রয়েছে। বিশেষভাবে রাতের বেলা আমাদের টহল জোরদার রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টের পাশাপাশি রাজশাহীর প্রবেশপথগুলোতে আমাদের সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন।’
ঈদ উপলক্ষে কোনো ধরণের অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এখনো সেরকম কোনো অপরাধ হয়নি। হত্যা, ধর্ষণ ও মাদকের সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের আমরা আইনের আওতায় আনছি। ঈদকে সামনে রেখে কেউ আইনশৃঙ্খলা অবনতির চেষ্টা করলে তা কঠোরভাবে দমন করা হবে, কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।’
প্রতিনিধি/একেবি