বৃহস্পতিবার, ২৫ এপ্রিল, ২০২৪, ঢাকা

ঈদুল ফিতর: মুমিনের পুরস্কারের উৎসব

জহির উদ্দিন বাবর
প্রকাশিত: ০২ মে ২০২২, ০৭:২০ পিএম

শেয়ার করুন:

ঈদুল ফিতর: মুমিনের পুরস্কারের উৎসব
ছবি: ঢাকা মেইল

দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর মুসলমানের দুয়ারে হাজির পবিত্র ঈদুল ফিতর। ঈদ মানেই আনন্দ, খুশির উচ্ছ্বাস। সুস্থ ও শালীন ধারায় বিনোদন চর্চার অবারিত সুযোগ। রাসুল সা. যখন মক্কা থেকে মদিনায় এলেন হিজরত করে, দেখলেন সেখানকার ইহুদি ধর্মের লোকেরা ঈদ পালন করেন। ঈদকে কেন্দ্র করে তাদের মধ্যে আনন্দ ও খুশির বাঁধভাঙা জোয়ার বয়ে যায়। সে সময় রাসুল সা. ইসলামে দুটি ঈদের ঘোষণা দিলেন। তবে মুসলমানের ঈদ নিছকই ঈদ নয়, ইবাদতও বটে। মুসলমানের সামগ্রিক কাজই যে ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত এর উৎকৃষ্ট প্রমাণ এই ঈদ।

ইসলাম প্রবর্তিত সেই ঈদ মদিনার অলিতে-গলিতে নিয়ে আসত অনাবিল আনন্দের জোয়ার। সাহাবায়ে কেরাম প্রকৃত অর্থেই ঈদের আনন্দ ও বিনোদন ভাগ করে নিতেন নিজেদের মাঝে। স্বচ্ছ-নির্মল সেই আনন্দে কোনো আবিলতা ছিল না, ছিল মুক্তপ্রাণের উচ্ছ্বাস। সব বেদনা ও গ্লানি মুছে যাওয়ার জাদুকরী প্রলেপ। প্রতীক্ষার ঈদ প্রকৃত অর্থেই ঈদ হয়ে আসত মুসলমানদের ঘরে ঘরে।


বিজ্ঞাপন


ঈদসহ বিভিন্ন উৎসবে নির্মল আনন্দে মেতে ওঠার একটা ঐতিহ্য বাঙালি মুসলমানদের রয়েছে। জাতি হিসেবে আমরা বরাবরই আবেগপ্রবণ ও উৎসববিলাসী। উপলক্ষ যাই হোক-সৌহার্দ্যপূর্ণ পারিবারিক ব্যবস্থা এবং সামাজিকতার প্রগাঢ় বন্ধনের কারণে আনুষ্ঠানিকতার বিষয়টি আমাদের কাছে অধিক গুরুত্ব পায়। সুস্থ ও গতিশীল সমাজব্যবস্থার জন্য এর প্রয়োজন আছে। তবে অপ্রয়োজনীয় বাড়তি মাতামাতি ও বাহুল্য নিমগ্নতার কারণে যে কোনো উৎসবের প্রকৃত আবেদনটা যাতে ম্লান না হয়ে যায় সে দিকেও দৃষ্টি রাখা জরুরি। অন্যথায় উৎসবের বাহ্যিক অবয়ব টিকে থাকলেও এর কোনো প্রাণ থাকে না। আমেজ ও প্রতিফলনের কাঙ্ক্ষিত রূপটি খুঁজে পাওয়া যায় না। বাঙালি মুসলমানদের ধর্মীয় ও সামাজিক অনেক উৎসবই আজ নিষ্প্রাণ ও নিষ্প্রভ হয়ে পড়েছে এ কারণে। উৎসব আছে, এর কোনো প্রাণ নেই; মাতামাতি আছে, কিন্তু মূল আবেদন হারিয়ে গেছে।

এখনকার ঈদ প্রকৃত ঈদ হয়ে না আসার পেছনে কারণ অনেক। প্রধানত ঈদকেন্দ্রিক আমাদের যে আচরণ তা ঈদের সহজাত আনন্দধারার সহায়ক নয়। সময়ের পটপরিবর্তন, মানুষের চাহিদা ও যোগানের বাস্তবতা এবং নানা আবিলতা যুক্ত হয়ে যাওয়ায় ঈদের মূল আবেদন হারিয়ে গেছে অনেক আগেই। এখনকার মানুষের চাহিদার পরিধি অনেক বিস্তৃত। অথচ যোগানের সামর্থ্য সবার সমান নয়। চাহিদা ও যোগানের এই টানাপোড়েনের কারণে যেকোনো উৎসবের আনন্দটাই ফিকে হয়ে যায়। জীবনযাত্রার মান আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। মানুষের ক্রয়-ক্ষমতাও বেড়েছে-কিন্তু বর্তমান চড়া ও ঊর্ধ্বগতির বাজারমূল্যের তুলনায় তা অনেক পিছিয়ে। অক্ষমতার এই যে খেদ তার দংশনেই তো আজকের মানুষ কাতর, ঈদের নির্মল আনন্দটা উপভোগ করবে কীভাবে।

মদিনার অলিতে গলিতে ঈদআনন্দের স্বতঃস্ফূর্ত ও নির্মল যে ধারার কথা চিন্তা করি সেখানে এই টানাপোড়েন ও খেদ ছিল না। তাদের চাহিদা ছিল সীমিত, যা তাদের সাধ্যের আনুকূল্যে। অথচ আজ আমরা আমাদের সাধ্যের চেয়ে অধিক কিছু পেতে আকুল হয়ে থাকি। উচ্চবিলাস ও উচ্চাকাঙ্ক্ষার কারণেই আমাদের ঈদ আর প্রকৃত ঈদ হয়ে আসে না।

সংযমের মাস রমজান পালন শেষে যে ঈদ উদযাপন করি তাতেও সংযমতার ছাপ থাকাটা প্রত্যাশিত। কারণ রমজানের প্রকৃত শিক্ষাই হলো সংযম। এই সংযম শুধু এক মাসের নয়, সারা বছরের জন্য। ঈদের মূল প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয় এই সংযমের মাসে। অথচ ঈদপ্রস্তুতির ক্ষেত্রে আমাদের থেকে সংযমটা পুরোপুরি প্রকাশ পায় না। ঈদকে কেন্দ্র করে রমজানের প্রথম থেকেই যে মাতামাতি শুরু হয় তাতে ক্ষেত্রবিশেষে অসংযত ও উম্মাদনার পরিচয় দিই। ঈদ উপলক্ষে চাহিদার যে বিশাল ফিরিস্তি তৈরি করা হয় তা নির্বাহের জন্য অনেকেই সংযমের মাস রমজানে অবৈধ ও অসমর্থিত পন্থা অবলম্বন করে থাকেন। বাড়তি ইনকামের অন্যায় ও অবৈধ পথ খুঁজে বের করেন। যারা চাইলেও এসব পথের সন্ধান পায় না তারা অন্তর্জ্বালায় ক্ষত-বিক্ষত হন। এসব পথ পরিহার করে যারা স্বচ্ছ ও নিষ্কণ্টক থাকতে চান তারাও অন্যদের ঈদ আয়োজনের প্রতিযোগিতা এবং নিজের অক্ষমতা দেখে মনের কোণে কষ্টের আছড় অনুভব করেন। অসংলগ্ন ও খাপছাড়া সামাজিক এই উদ্ভূত কালচার আমাদের সমাজের ঈদের নির্মল আনন্দ ও স্বতঃস্ফূর্ত উচ্ছ্বাসের প্রধান অন্তরায়।


বিজ্ঞাপন


দুই.

পবিত্র মাহে রমজান মুমিন বান্দাদের জন্য একটি পরীক্ষা। যারা এ পরীক্ষায় সফলভাবে উত্তীর্ণ হবেন, তাদের জন্য মহান প্রভুর পক্ষ থেকে রয়েছে বিশেষ প্রতিদানের ঘোষণা। মূলত ঈদুল ফিতর হলো মুমিনের পুরস্কারের উৎসব। হাদিস শরিফে বর্ণিত আছে, ‘ঈদুল ফিতরের দিন সকালে আল্লাহ তায়ালা ফেরেশতাদের পাঠিয়ে দেন। তারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েন এবং গলিপথের মুখে দাঁড়িয়ে আওয়াজ করে ঘোষণা দিতে থাকেন, হে উম্মতে মোহাম্মদি! তোমরা তোমাদের দয়াময় রবের প্রতি মনোনিবেশন করো। অফুরন্ত ভাণ্ডার থেকে তিনি তোমাদের দান করবেন। বড় বড় গোনাহ মাফ করে দেবেন।’ এরপর লোকজন যখন নামাজের স্থানে পৌঁছে, আল্লাহ তায়ালা তখন ফেরেশতাদের সম্বোধন করে বলেন, ‘ওই মজদুরদের কী বিনিময় হতে পারে, যারা তাদের কাজ সম্পন্ন করেছেন?' ফেরেশতারা বলেন, তাদের বিনিময় হচ্ছে পূর্ণরূপে পাওনা তাকে দিয়ে দেওয়া। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমরা সাক্ষী থাকো, বিনিময়ে আমি তাদের আমার সন্তুষ্টি ও ক্ষমা দান করলাম এবং তাদের গোনাহগুলো নেকির দ্বারা পরিবর্তন করে দিলাম।’ (বায়হাকি)

ঈদুল ফিতর মুসলমানদের আনন্দের উৎসব। তবে মুসলমানদের আনন্দ-উৎসব নিছক আনন্দের জন্যই না, তা একটি ইবাদতও বটে। এজন্য মুসলমানদের তাদের ধর্মীয় উৎসবগুলো পালন করতে হয় ধর্মীয় আঙ্গিকে। লাগামহীন আনন্দ-ফুর্তিতে মেতে ইসলামের চেতনা ও আদর্শকে ভুলে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ঈদুল ফিতরের দিন করণীয় হলো, সকাল সকাল ঘুম থেকে ওঠা, ভালো করে গোসল করে সুগন্ধি লাগানো, ঈদগাহে যাওয়ার আগে রাসুলুল্লাহ সা.-এর সুন্নত অনুসরণে মিষ্টিমুখ করে ঈদগাহে যাওয়া, ঈদের জামাতে শামিল হওয়া এবং পুরো খুতবা শোনা।

হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী, ঈদের দিনের দোয়া আল্লাহ তায়ালার দরবারে কবুল হয়। এ দিনের ইবাদতেরও বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। সম্ভব হলে ঈদের জামাত পড়ে ঘরে ফিরে চার রাকাত নফল নামাজ আদায় করে নেবেন। আত্মীয়-স্বজনের কবর জিয়ারত এ দিনের বিশেষ আমল। ঈদপূর্ব রাতটি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ। আনন্দ-ফুর্তির তোড়ে ঈদের ভাবগাম্ভীর্য যেন নস্যাৎ না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। অনেকেই ঈদের দিন নানা ফালতু কাজে জড়িয়ে পড়েন। এটা ঈদের পুরস্কার প্রাপ্তির পথে বড় অন্তরায়। সংযমের যে শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সারা মাস রোজা রেখেছেন সে মাসের ছাপ থাকতে হবে ঈদ উদযাপনে।

লেখক: যুগ্ম বার্তা সম্পাদক, ঢাকা মেইল।

/আইএইচ

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর