সোমবার, ২২ এপ্রিল, ২০২৪, ঢাকা

ড. আকবর আলী খান: এক কর্মবীরের জীবনাবসান

হারুন জামিল
প্রকাশিত: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৮:৩৮ এএম

শেয়ার করুন:

ড. আকবর আলী খান: এক কর্মবীরের জীবনাবসান

ড. আকবর আলী খান একজন আমলা হিসেবে কর্মজীবন শুরু করলেও ছিলেন একাধারে অর্থনীতির পণ্ডিত, সুবক্তা, বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষাবিদ। ১৯৪৪ সালে বৃহত্তর কুমিল্লার ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে জন্মগ্রহণ করেন। ৭৮ বছর বয়সে ৮ সেপ্টেম্বর ঢাকায় তিনি ইন্তেকাল করেন। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি তৎকালীন পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসে যোগ দেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় ছিলেন হবিগঞ্জের এসডিও। দায়িত্বশীল পদে থেকেও তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন এবং মুজিবনগর সরকারে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি আগরতলা হয়ে কলকাতা যান এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে প্রবাসীদের সংগঠিত করা, বিদেশে জনমত গঠন ও সমর্থন আদায়ে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখেন। দেশ স্বাধীনের পর তিনি পুনরায় সরকারি চাকরিতে ফিরে আসেন এবং ২০০১ সাল পর্যন্ত প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের একজন উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।


বিজ্ঞাপন


ড. আকবর আলী খান ছিলেন বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী। জ্ঞানে গুনে পাণ্ডিত্যে সমসাময়িক কালে তিনি অসামান্য বুৎপত্তি অর্জন করেন। তিনি অর্থনীতির ছাত্র না হয়েও এক্ষেত্রে সমান দক্ষতা অর্জন ও পাণ্ডিত্যপ্রদর্শন করেন। তিনি ছিলেন খুবই নির্মোহ মানুষ। প্রশ্নাতীত সৎ ও জাতীয় স্বার্থের ক্ষেত্রে আপোষহীন। তার অসাধারণ বিশ্লেষণ ক্ষমতা ছিল। যা বিশ্বাস করতেন অকপটে বলতেন। দ্বিধাহীনভাবে সত্য প্রকাশ ছিল তার চরিত্রের বৈশিষ্ট্য। এক-এগারোর আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে দেশে একটি অবাধ সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের জন্য তিনি যথেষ্ট প্রচেষ্টা চালান। সরকারি দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি একজন পণ্ডিত ব্যক্তি হিসেবে নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান। বহুক্ষেত্রে জাতির অভিভাবকের ভূমিকা পালন করেন। কথা বলার ক্ষেত্রে কখনোই তিনি সৌজন্যতার সীমা অতিক্রম করেননি। আবার সত্য প্রকাশে ছিলেন অকুণ্ঠ। তিনি ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা। অথচ এ বিষয়ে কখনোই তাকে আগ বাড়িয়ে কথা বলতে দেখা যায়নি। তার নিজস্ব নিরপেক্ষতার একটি নীতি ছিল। যা বর্তমান সময়ে বিরল। আমাদের বিভাজিত সমাজ ব্যবস্থায় ড. আকবর আলী খান ছিলেন একটি স্বতন্ত্র ইনস্টিটিউট।

সম্ভবত ২০১০ সালে একটি জাতীয় দৈনিকের গোলটেবিল আলোচনার  প্রধান অতিথি হিসেবে তাকে আনার দায়িত্ব ছিল আমার ওপর। আমি তাঁর গুলশানের বাসায় গিয়েছিলাম। আসার সময় তিনি আমাকে আক্ষেপ করে বলেছিলেন, এদেশে সবাই সুষ্ঠু নির্বাচন প্রত্যাশা করে। কিন্তু বিপক্ষে গেলে ফলাফল মানতে চায় না। বলেছিলেন, গণতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে বড় প্রয়োজন মানসিকতার। মানসিকতার সংকট  থাকলে গণতন্ত্র ফলপ্রসূ হয় না। আমি জানতে চেয়েছিলাম, স্যার আপনি তো জীবনে বহু বছর প্রশাসনে ছিলেন। সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করতে পারলেন না কেন? তিনি বলেছিলেন, আমাদের কথা যদি সবাই শুনতো তাহলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতো।

আমি তার মুক্তিযুদ্ধের সময়কালীন স্মৃতি নিয়ে জানতে চেয়েছিলাম। তিনি তার বেশ কয়েকজন সহকর্মীর নাম উল্লেখ করে বলেছিলেন, এরা মুক্তিযুদ্ধে গেলেও সক্রিয় ভূমিকায় ছিলেন না। কথা প্রসঙ্গে বলেছিলেন, একবার সরকার কক্সবাজারকে বিদেশি পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ার চিন্তা ভাবনা শুরু করে। তিনি এ সিদ্ধান্তের বিরোধী ছিলেন। কিন্তু সরকার ছিল অনেকটা অনঢ়। আকবর আলী খান স্বউদ্যোগে কক্সবাজার যান। স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ ও ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের সঙ্গে এ নিয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, এমনিতেই আমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম দেশ। জনসংখ্যাবহুল। কক্সবাজারের মতো একটি সমুদ্র তীরবর্তী এলাকায় ব্যাপকহারে বিদেশিদের অবাধ যাতায়াত হলে সামাজিকভাবে বিরূপ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তার কথায় কাজ হয়। স্থানীয়রা এর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ শুরু করলে সরকার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে।

স্যারের গুলশানের বাসায় আমি একাধিকবার গিয়েছি। আমি যে কদিন গিয়েছি- দেখেছি তিনি তার নিজের লাইব্রেরিতে পড়াশোনা করছেন। অপারেশন পরবর্তী জটিলতায় একবার তিনি ভাসানটেকে সিআরপি হাসপাতালে ভর্তি হন। আমি ফোন করে তাকে দেখতে গিয়েছিলাম। রমজান মাসে স্যার আমার জন্য স্পেশাল ইফতারির আয়োজন করেন।


বিজ্ঞাপন


আমাদের সমাজে নির্মোহভাবে সত্য কথা বলা কিংবা বিবেকের তাড়না অনুযায়ী চলার লোকের আজ বড্ড অভাব। সেই অভাবের মধ্যেই বিদায় নিলেন ড. আকবর আলী খান। একজন নীতিনিষ্ঠ মানুষ হিসেবে আমাদের মাঝে বহুকাল চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। মহান আল্লাহ তাকে জান্নাতবাসী করুন।

লেখক: হেড অব নিউজ, ঢাকা মেইল

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর