দেশেই কম খরচে বিশ্বমানের চিকিৎসাসেবা দিতে দুই বছর আগে চালু হয় বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) ‘সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল’। তখন বলা হয়েছিল- এই হাসপাতাল চালু হলে রোগীদের আর বিদেশ যেতে হবে না। দেশেই মিলবে কম খরচে ভোগান্তিহীন চিকিৎসাসেবা। তবে উদ্বোধনের দুই বছর পেরিয়ে গেলেও নানা সংকটের কারণে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হাসপাতালটি পুরোপুরি চালু হয়নি। এতে যে উদ্দেশে হাসপাতালটি করা হয়েছিল সেই সুফল পাওয়া যাচ্ছে না।
হাসপাতালের পরিচালকের কার্যালয় সূত্র বলছে, বর্তমানে প্রয়োজনীয় জনবলের পাঁচ ভাগের এক ভাগ রয়েছে হাসপাতালটিতে। খালি রয়েছে চিকিৎসাসেবা সংশ্লিষ্ট প্রায় সব পদ। যে জনবল রয়েছে সেটাও বিএমইউ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের জনবল। এই জনবল দিয়ে কোনোমতে চালু রয়েছে হাসপাতালটি। জনবলের অভাবে পুরোদমে চালু করা যাচ্ছে না সবধরনের সেবা। কোরিয়া থেকে আনা উন্নতমানের যন্ত্রপাতি অকেজো পড়ে রয়েছে। ব্যবহার না করায় এসব যন্ত্রপাতি নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পুরোদমে চালু হলে হাসপাতালটি থেকে বিশেষায়িত পাঁচটি সেবা পাবে জনগণ। সেসব সেবা নিতে দেশের মানুষকে যেতে হয় বিদেশ। কিডনি সেন্টার, হৃদরোগের সেন্টার, লিভারের সেন্টার, এক্সিডেন্টের সেন্টার এবং মা ও শিশু রোগের সেন্টার- এই পাঁচটি সেন্টারে বিশেষায়িত সেবা মিলবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পুরোদমে চালু করা গেলে দেশের চিকিৎসায় ফিরবে আস্থা, কমে যাবে বিদেশমুখিতা। বাড়বে দেশের অর্থনীতির গতি।
বিজ্ঞাপন
অলস পড়ে আছে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি
জানা গেছে, সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে পুরোদমে উন্নতমানের সেবা চালু করতে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি আনা হয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে। হাসপাতালটি পুরোদমে চালু না হওয়ায় এসব যন্ত্রপাতি কোনো কাজে আসছে না। ব্যবহার না করায় সেগুলো অকেজো হয়ে যেতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সেসব সেন্টার অল্প পরিসরে চালু রয়েছে, সেখানে স্বল্প আকারে ব্যবহার হচ্ছে যন্ত্রপাতি। এরমধ্যে লিভার সেন্টারে কার্যক্রম চালু রয়েছে, কার্ডিয়াক রোগীদের ক্যাথল্যাব চালু রয়েছে, ব্রেইনের রোগীদের কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষা হচ্ছে, মা ও শিশু ওটি হচ্ছে নিয়মিত।
সংশ্লিষ্টরা জানান, মূল সেবাই পাওয়া যাচ্ছে না সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে। এরমধ্যে লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট, কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট ইত্যাদি বড় সেবা এখনো চালু হয়নি। সাথে পড়ে রয়েছে এসব রোগের অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি। ব্রেইন কেটে অস্ত্রোপচারের যন্ত্রপাতিও এখনো ব্যবহার করা হয়নি।
মূল সমস্যা জনবল সংকট
জানা গেছে, হাসপাতালটির সব সংকটের মূলে রয়েছে জনবল সংকট। জনবল না থাকায় ৭০ শতাংশ যন্ত্রপাতি একদিনও ব্যবহার হয়নি। এসব যন্ত্রের মেয়াদ রয়েছে তিন বছরের কম-বেশি। ফলে ব্যবহারের আগেই মেয়াদ শেষ হয়েছে অনেক যন্ত্রের।
এদিকে যন্ত্রাংশ ত্রুটির দায় সময়কাল শেষ হয়ে যাওয়ায় পরিবর্তনেরও সুযোগ নেই। প্রয়োজনীয় চিকিৎসক নিয়োগের ব্যবস্থা করলে আউটডোর ও ইনডোর সেবা পুরোপুরিভাবে চালু করা যাবে। তাতে সুফল ভোগ করবে দেশের মানুষ।
সূত্রে জানা যায়, ২০২২ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর হাসপাতালটি উদ্বোধন করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অবকাঠামো নির্মাণ ও যন্ত্রপাতি কেনা বাবদ এতে ব্যয় হয় দেড় হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে এক হাজার ৪৭ কোটি টাকা ছিল দক্ষিণ কোরিয়া সরকারের ঋণ, সরকারি সহায়তা ৩৩৮ কোটি ও জমির মূল্য হিসেবে ১৭৫ কোটি টাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব অর্থায়ন।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে স্বাস্থ্য খাতের পদে পদে দুর্নীতি ও অনিয়মের প্রমাণ মিলছে। ব্যতিক্রম নয় এই স্পেশালাইজড হাসপাতালটিও। ২০২৩ সালে ৩-২০ গ্রেডের বিভিন্ন পদে ৭৫৪ জনের নিয়োগেও আশ্রয় নেওয়া হয় নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত বছরের ১২ ডিসেম্বর বাতিল করে দিয়েছে সেই নিয়োগ। যদিও প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ নাকচ করেছেন নিয়োগপ্রত্যাশীরা।
কী বলছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ
সার্বিক বিষয় নিয়ে জানতে চাইলে সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী ঢাকা মেইলকে জনবল প্রসঙ্গে বলেন, ‘আগে একটি বিতর্কিত নিয়োগ প্রক্রিয়া ছিল, সেটাকে বাতিল করে আরেকটি নিয়োগে যেতে হয়। একটা প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই করা হয়, সেটাই করা হয়েছে।’
হাসপাতালটির কার্যক্রম পুরোদমে চালু করতে সমস্যা কোথায়- এমন প্রশ্নের জবাবে ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী বলেন, ‘সব সংকটের মূলে রয়েছে নিয়োগ। লোকবল নিয়োগ দেওয়া গেলে সংকট কেটে যাবে, দেশের মানুষ পুরোপুরি সুফল ভোগ করতে পারবেন। আশা করি, এ বছরের মধ্যে নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করা হবে।’
আরও পড়ুন
পরিচালক বলেন, ‘লোকবল না থাকলে যতই যন্ত্রপাতি থাকুক এই হাসপাতাল দাঁড়াবে না। এই হাসপাতালে সব জনবল এবং সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করতে পারলে দক্ষিণ এশিয়ার একটি বড় হাসপাতাল হিসেবে পরিচিতি লাভ করবে।’
তবে সার্বিক বিষয়ে জানতে বিশ্বমানের স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার জন্য গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠানটির মূল দায়িত্বে থাকা বিএমইউর ভিসি অধ্যাপক ডা. শাহিনুল আলমের এ সংক্রান্ত তথ্য দিতে কিছুটা অনীহা লক্ষ্য করা গেছে।
এ বিষয়ে কথা বলতে প্রথমে গত ১৯ মার্চ ডা. শাহিনুল আলমকে ফোন দেওয়া হলে তিনি রিসিভ করেননি। পরে ওইদিন দুপুরে প্রতিবেদক বিএমইউতে যান। বিএমইউর গেইটে থাকা আনসার সদসরা জানান, বিএমইউ ভিসি মিটিংয়ে আছেন, তার রুমে যাওয়া যাবে না।
এমন পরিস্থিতিতে ভিসির ব্যক্তিগত সহকারী ডা. রুহুল কুদ্দুস বিপ্লবের সঙ্গে ফোন দেওয়া হলে তিনি ব্যস্ততার কথা বলে পরে যোগাযোগ করতে বলেন। পরে আবারও ডা. বিপ্লবকে ফোন দেওয়া হলে তিনি জানান, ‘এই সংক্রান্ত বিষয়ে ভিসি স্যার সাক্ষাৎকার বা তথ্য দিতে পারবেন না।’
আরও পড়ুন
পরে আবার টানা দুদিন সরাসরি সাক্ষাতের চেষ্টা করা হয়। ব্যর্থ হয়ে ব্যক্তিগত ফোনে ক্ষুদেবার্তা পাঠানো হলেও সাড়া দেননি বিএমইউ ভিসি অধ্যাপক ডা. শাহিনুল আলম।
এসএইচ/জেবি